Showing posts with label আর্টিকেল. Show all posts
Showing posts with label আর্টিকেল. Show all posts

Tuesday, June 30, 2020

ব্রোকার হাউজ লাপাত্তা? তাতে কি? নিজের বিও অ্যাকাউন্ট নিজেই নিরাপদ রাখতে পারেন, কোনো অর্থ ছাড়াই

স্টাফ রিপোর্টার: জুন মাসের শুরুতেই দেশের পুঁজিবাজারে ঘটে গেছে বড় একটি দূর্ঘটনা। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সদস্য প্রতিষ্ঠান ক্রেস্ট সিকিউরিটিজ লিমিটেডের মালিকরা সব অফিস বন্ধ করে দিয়ে আত্মগোপন করেছেন। এতে ব্রোকারহাউজের ২১ হাজার গ্রাহকের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিষ্ঠানটির মালিকরা গোপনে তাদের শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছে কি-না, তাদের টাকা আছে কি-না, ওই শেয়ার ও টাকা ফেরত পাবেন কি-না তা নিয়ে তাদের মনে সন্দেহের জাল দানা বেধেছে। 

শুধু ক্রেস্ট সিকিউরিটিজের গ্রাহক নয়, ওই ঘটনায় অন্যান্য ব্রোকারহাউজের গ্রাহকদের মনেও দেখা দিয়েছে কিছুটা দ্বিধা ও সন্দেহ। অথচ চাইলে একজন বিনিয়োকারী নিজেই অনিশ্চয়তার অবসান ঘটাতে পারেন। সব সময় আপডেট থাকতে পারেন তার বিও অ্যাকাউন্টে থাকা শেয়ারের অবস্থা সম্পর্কে। 

Tuesday, June 23, 2020

অবশেষে আইপিও অনুমোদন পেল ওয়ালটন

স্টাফ রিপোর্টার: অবশেষে দেশের ইলেকট্রনিক্স জায়ান্ট ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজের প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) অনুমোদন দিয়েছে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। কমিশনের ৭২৯তম নিয়মিত সভায় ওয়ালটন শেয়ারের কাট-অব প্রাইস ৩১৫ টাকায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার (২৩ জুন) বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সাইফুর রহমান স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানা গেছে। এদিকে দেশের শেয়ারবাজারের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ইপিএস নিয়ে তালিকাভুক্ত হতে যাচ্ছে ওয়ালটন।

প্রসপেক্টাসে উল্লিখিত আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ওয়ালটনের শেয়ার প্রতি মুনাফা বা ইপিএস ৪৫.৮৭ টাকা।  নিট সম্পদ মূল্য বা এনএভি ২৪৩.১৬ টাকা এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর সর্বশেষ প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ অর্থবছরের ইপিএসের বিবেচনায় ওয়ালটন ৮ম স্থানে রয়েছে। এমনকি বহুজাতিক বার্জার পেইন্টস ও গ্রামীণফোনের চেয়েও ওয়ালটনের ইপিএস বেশি।

Friday, December 9, 2011

জার্মানিতে ইসলামিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা

জার্মানির মানহাইম শহরে ইসলাম ধর্মের রীতিনীতি মেনে মুসলমানদের জন্য প্রথম সুদমুক্ত ব্যাংক চালু হয়েছে৷ এরকম ইসলামি ব্যাংক ব্যবস্থা বহু মুসলিম দেশেই রয়েছে৷ যার মূল কথা - সুদ নেয়া বা দেয়া যাবে না৷

বিশ্বব্যাপী আর্থিক ও অর্থনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে পশ্চিমের ভাবধারায় পুষ্ট বিভিন্ন দেশও এনিয়ে ভাবনাচিন্তা করছে যে, ধর্মীয় নৈতিকতার কড়া ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে একটি ব্যাংকিং ব্যবস্থা ঠিক কিভাবে কাজ করে৷ প্যারিস এবং লন্ডন শহরে ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার কাঠামোগত শর্তগুলো ইতিমধ্যেই সৃষ্টি করা হয়েছে৷ মানহাইম শহরে স্থাপিত ‘কুভেত তুর্ক ব্যাংক’ জার্মানিতে এধরণের প্রথম ব্যাংক৷ তবে তার কাজ কিছুটা সীমিত থাকবে৷

প্রচলিত ব্যাংকের সঙ্গে মুসলমানদের জন্য স্থাপিত এই ইসলামি ব্যাংকের পার্থক্য হলো ইসলাম ধর্মের নিয়মনীতি মেনেই তাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থা৷ যার মূল কথা - সুদ নেয়া এবং দেয়া হারাম৷ ফাটকাবাজি নিষিদ্ধ৷ সুদের কারণে লেনদেনের ঝুঁকিটা একপেশে হয়ে যায় বলে মনে করা হয়৷

আর্থিক ঝুঁকি থাকতে হবে দু’পক্ষের ওপরেই
ধরা যাক তুর্কি মুসলমান আলি ডোনার কাবাবের দোকান খোলার জন্য কোনো প্রচলিত ব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ নিলেন৷ এই ঋণের ঝুঁকিটা কিন্তু তার একার৷ খুব বেশি কাস্টমার যদি দোকানে না আসে, যদি তাকে প্রচণ্ড লোকসান দিতে হয় তাহলে ঋণের একটা অংশ নিয়মিত শোধ করার সঙ্গে তাকে সুদটাও দিয়ে যেতে হবে৷ আলির ব্যবসা না চললেও ব্যাংক কিন্তু ওই সুদ থেকে লাভ করবে৷ ইসলাম ধর্ম এটা চায় না৷ ইসলাম ধর্মের নিয়মনীতি অনুযায়ী আর্থিক ঝুঁকিটা থাকতে হবে দু’পক্ষের ওপরেই৷

মানহাইমের ‘কুভেত তুর্ক’ ব্যাংক সুদের কারবার করছে না৷ লেনদেনটা হচ্ছে কোন কোম্পানিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে৷ কোম্পানি লাভ বা লোকসান যাই করুক, ব্যাংকের তাতে অংশ থাকবে৷ ব্যাংকের প্রধান উগুরলু সয়লু জানান,‘‘এই বিশেষ মডেলের ব্যাংক এমন কোনো ব্যবসার সঙ্গে নিজেকে জড়াবে না যা কিনা মদ, শুকরের মাংস, পর্নোগ্রাফি বা অস্ত্রশিল্পের সঙ্গে যুক্ত৷ তাছাড়া সমাজের ক্ষতি করবে এমন সব ব্যবসা থেকেই দূরে থাকবে এই ব্যাংক৷”

ইসলামি ব্যাংকের লাইসেন্স এখনও সীমিত রাখা হয়েছে৷ তবে ব্যাংক-প্রধান সয়লু আশাবাদী৷ পূর্ণাঙ্গ লাইসেন্সের আবেদন করবেন তারা এবার৷

ব্যাংক থেকে যারা ঋণ নিতে চায়, তাদের জন্য দুটি উপায় খোলা৷ এক, কোনো সুনির্দিষ্ট প্রকল্প - যেমন ধরা যাক একটা সুপার মার্কেট-এর অর্থায়নের সঙ্গে যুক্ত হওয়া৷ যার অর্থ কাস্টমারের অংশ থাকবে ওই ব্যবসায়৷ লাভ এবং ক্ষতি দুটোরই দায়ভাগ নিতে হবে তাকে৷ অথবা ধরা যাক কেউ বাড়ি কিনতে চায়৷ ব্যাংক নিজে কিনবে সেই পছন্দের বাড়ি৷ এবং তারপর বিক্রি করবে সেই বাড়ি কাস্টমারের কাছে৷ কেনার টাকা শোধ করা হবে কিস্তিতে৷ কিন্তু এধরণের অর্থায়নে সমস্যা আছে৷ বাড়ি কেনাবেচার প্রক্রিয়ায় দু’বার প্রফিট ট্যাক্স দিতে হবে৷ এবং তাতে অর্থায়নটা হয়ে উঠবে অনেক ব্যয়বহুল৷

ফ্রান্স এবং ব্রিটেনে ইসলামি ব্যাংক প্রবর্তনের কাঠামোগত শর্তগুলো তৈরি আছে৷ জার্মানিতে তা নেই৷ তবুও জার্মানির অর্থপ্রতিষ্ঠানের তদারকি দপ্তর বাফিন এরকম ব্যাংকিং ব্যবস্থার বিরোধী নয়৷ জার্মানিতে ব্যাংক ব্যবসার বিভিন্ন দিক দেখাশোনা করে বাফিন৷ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা, ব্যাংকের কাজকর্ম ওপর নজরদারির দায়িত্ব বাফিনের৷ বাফিনের আন্তর্জাতিক বিভাগের কর্মকর্তা ইয়োহানেস এঙ্গেল্সের ভাষ্য,‘‘ইসলামিক ব্যাংক ব্যবস্থার ইস্যুটি নিয়ে বাফিন বেশ ব্যস্ত আছে৷ আমরা আগামী বছরের মে মাসে ফ্রাঙ্কফুর্টে এ বিষয়ে একটি সম্মেলনের আয়োজন করছি৷ বিষয়টি আমাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ৷ অর্থনৈতিক মন্দার অনেক অজানা উত্তর হয়তো তার মধ্যে থাকতে পারে৷” সূত্র: ডয়চে ভেলে।

Monday, November 28, 2011

রিজার্ভ সংকটে : বাড়ছে সরকারের ঋণ


বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমতে শুরু করেছে। জ্বালানি তেল, সার ও ভোগ্যপণ্য আমদানি দায় মেটাতে রিজার্ভ থেকে অধিক হারে অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এসব ব্যয় খুব বেশি বাড়ার ফলে দ্রুতই কমছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। যেভাবে রিজার্ভ ভাঙা হচ্ছে তা অব্যাহত থাকলে বড় ধররের সংকটে পড়বে দেশের অর্থনীতি। এদিকে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণগ্রহণ আশঙ্কাজনহারে বাড়ছে। ইতিমধ্যে এ ঋণের পরিমাণ ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এরমধ্যে বেশিরভাগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সাধারণত তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর জন্য বৈদেশিক মুদ্রা সংরণের প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশে প্রতি মাসে প্রায় সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলার আমদানি ব্যয় হয়। সে হিসাবে তিন মাসের আমদানি ব্যয় প্রায় দশ বিলিয়ন ডলার।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সামনে রিজার্ভ নিয়ে আরও ভয়াবহ সংকট আসছে। কারণ, আমদানি দায় যে হারে বাড়ছে, সে হারে রফতানি আয় ও রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ছে না। এর বাইরে বিদেশি ঋণ ও অনুদানও ছাড় হচ্ছে না। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের আমদানি দায় মেটাতে সরকারি ব্যাংকগুলোর কোনো অর্থসংস্থান নেই। চলতি অর্থবছরের চার মাসে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে প্রায় ৮০ কোটি ডলার সহায়তা করা হয়েছে। এর মধ্যে রিজার্ভ থেকে সরাসরি বিক্রি করা হয়েছে ৩৬ কোটি ৯০ লাখ ডলার। রিজার্ভের ওপর দিন দিন নির্ভরশীলতা আরও বেড়ে যাচ্ছে।

রিজার্ভ কোনো দেশের বিদেশি দেনা মেটানোর মানদ  হিসেবেও বিবেচিত হয়। ঋণ পরিশোধের সমতা বিবেচনা করে এক ব্যক্তি যেমন অন্য ব্যক্তিকে ঋণ দিয়ে থাকে, তেমনি দাতারাও বিভিন্ন দেশকে ঋণ দিয়ে থাকে রিজার্ভ বিবেচনায়। এখন বিদেশ থেকে ঋণ নিলে তা পরিশোধ করতে হয় বৈদেশিক মুদ্রায়। এ কারণে দাতা সংস্থাগুলো বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের ওপর নজর রাখে। যেমন- আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আইএমএফ বাংলাদেশকে ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রাখার পরামর্শ দিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিনির্ধারকদের মতে, বাংলাদেশের প্রোপটে রিজার্ভ ৯০০ কোটি ডলার মজুদ রাখতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রতি মাসে গড়ে ৩০০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করতে হয়। অথচ, বছরখানেক আগেও মাসে ২০০ কোটি ডলারের আমদানি দায় পরিশোধ করতে হতো।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সামনে এ দায় আরও বাড়বে। সেই হারে রেমিট্যান্স প্রবাহ ও রফতানি আয় বাড়বে না। কাঙ্তি হারে বৈদেশিক ঋণও আসবে না। আবার নভেম্বর ও ডিসেম্বরে এশিয়া কিয়ারিং ইউনিয়নের আমদানি দায় পরিশোধ করতে হবে কমপে ৮০ কোটি ডলার। সব মিলে রিজার্ভ তিন মাসের ব্যয় মেটানোর অবস্থানে ধরে রাখা সম্ভব হবে না।

বিশ্লেষকদের মতে, রিজার্ভ সন্তোষজনক অবস্থায় ধরে রাখতে হলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানোর পদপে নিতে হবে; দাতাদের কাছ থেকে প্রতিশ্রুত ঋণ ও অনুদান ছাড় করার উদ্যোগ নিতে হবে। সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে এবং রফতানি আয় বাড়ানোর জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। নইলে অর্থনীতির অনাকাঙ্তি পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে।

ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে
চলতি ২০১১-১২ অর্থবছরে বাজেটে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১৮ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকার ঋণ ল্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। সে হিসাবে সরকারের নেওয়া ঋণের পরিমাণ এরই মধ্যে ল্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। প্রতিদিনই ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। গত ২১ নভেম্বর পর্যন্ত সরকারের ব্যাংক ঋণ ছিল ১৯ হাজার ১৭১ কোটি টাকা। ২২ নভেম্বর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ২০৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এক দিনের ব্যবধানে ব্যাংক ঋণ বেড়েছে এক হাজার ৩৩ কোটি টাকা। প্রতিদিন গড়ে ব্যাংক থেকে ঋণগ্রহণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৪২ কোটি টাকা প্রায়। গত বছরের একই সময়ে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার ২ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল। অর্থবছর শেষে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছিল ২০ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। যদিও ২০১০-১১ অর্থবছরের বাজেটে ১৫ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা ঋণ ল্যমাত্রার নির্ধারণ করা হলেও পরবর্তী সময়ে ওই ল্যমাত্রা বাড়িয়ে ১৮ হাজার ৩৭৯ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়।

সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে যে ঋণ নিচ্ছে এর সিংহভাগ জোগান দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২২ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জোগান দেওয়া হয়েছে ১২ হাজার ২২১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে উপায়-উপকরণের আগাম হিসেবে নেওয়া হয়েছে এক হাজার কোটি টাকা। এ খাত থেকে সর্বোচ্চ দুই হাজার কোটি টাকা নিতে পারে সরকার। বিগত অর্থবছরগুলোতে বাকি এক হাজার টাকা নেওয়া হয়ে গেছে। তাই এ খাত থেকে আর ঋণ পাচ্ছে না সরকার। বাকি টাকার জোগান দেওয়া হচ্ছে ওভারড্রাফট এর মাধ্যমে। এখন পর্যন্ত ওভারড্রাফটের মাধ্যমে সরকারের ঋণের জোগান দেওয়া হয়েছে ১০ হাজার ২৮৮ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারের এ ঋণের টাকার জোগান দিয়েছে নতুন নোট ছেড়ে।

অর্থবছরের শুরুতেই সরকারের খরচ বাড়লেও আয় সেভাবে বাড়েনি। বিশেষ করে রাজস্ব আয় কমে যাওয়া, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স প্রবাহে শ্লথগতি, বৈদেশিক সাহায্য ও বিনিয়োগ কমাসহ নানা কারণে সরকারকে বাজেট ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। যে কারণে বছরের শুরু থেকেই ব্যাংক ঋণনির্ভর হয়ে পড়েছে সরকার। বাজেট ঘাটতি মেটাতে প্রতি বাজেটেই সরকার ঋণ ল্যমাত্রা নির্ধারণ করে থাকে। এ েেত্র অভ্যন্তরীণ উত্স থেকে ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত খাত থেকে ঋণ নেওয়ার ল্যমাত্রা দেওয়া হয়। তবে চলতি অর্থবছর অন্যান্য উত্স থেকে তুলনামূলক কম ঋণ পাওয়ায় অর্থবছরের শুরু থেকেই ব্যাংকিং খাতের ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে।

সার্বভৌম ঋণ খুঁজছে সরকার
ব্যাংক থেকে আর ঋণ না নিয়ে বিদেশ থেকে বেশি সুদে বাণিজ্যিক ঋণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বিকল্প ঋণ হিসাবে বন্ড ছেড়ে বিদেশ থেকে টাকা সংগ্রহের কথা ভাবা হচ্ছে। একটি দেশের ঋণমানের ওপর নির্ভর করে বন্ড ছেড়ে এ ধরনের ঋণ নেওয়া হলে তাকে সার্বভৌম (সভরেন) ঋণ বলা হয়। বাংলাদেশে এর আগে এ ধরনের সার্বভৌম ঋণ নেওয়া হয়নি।

সম্প্রতি অর্থ মন্¿ণালয়ে মুদ্রা ও মুদ্রা বিনিময় হার সংক্রান্ত অর্থনৈতিক কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলের বৈঠকে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে এ ধরনের ঋণের প্রভাব সম্পর্কে একটি প্রতিবেদন তৈরির জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নরকে পরামর্শ দেন অর্থমন্¿ী।

জানা গেছে, সরকারের এখন একদিকে উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন ব্যয় সামলাতে নগদ টাকা দরকার, অন্যদিকে ব্যালান্স অফ পেমেন্টের দায় মেটাতে দরকার বৈদেশিক মুদ্রা। অভ্যন্তরীণ ঘাটতি ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা সামাল দিতে গিয়ে রিজার্ভ কমে যাচ্ছে। সরকার পদ্মা সেতু বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন প্রকল্পে যে ধরনের বৈদেশিক সহায়তা প্রত্যাশা করেছিল সে পরিমাণ সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে না। পদ্মা সেতু নিয়ে অনিশ্চয়তা সংকট আরও গভীর করেছে। এ অবস্থায় আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংকসহ দাতা সংস্থাগুলোর কাছে বাজেট সহায়তা পাওয়ার জন্য জোর চেষ্টা চলছে।

সূত্র জানায়, সভরেইন ঋণ পাওয়ার েেত্র সুদের হারের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বৈঠকে। মূলত এ ধরনের ঋণের সুদের হার নির্ণয় হয় দেশটির ঋণমানের ওপর। গত দু’বছর ধরে বাংলাদেশের ঋণমান নির্ণয় করে আসছে আন্তর্জাতিক দুটি প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুওর ও মোদি। এ ঋণমান অনুসারে সভরেন ঋণ নিলে সুদের হার কত হতে পারে এবং তাতে বাজেটে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে সে বিষয়ে প্রন্দ্রীয় ব্যাংককে একটি প্রতিবেদন তৈরি করতে বলা হয়েছে। সূত্র জানায়, সমপ্রতি শ্রীলংকা ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ সুদে ১০ বছর মেয়াদে বন্ড ছেড়ে এ ধরনের ঋণ গ্রহণ করেছে। শ্রীলংকা ও বাংলাদেশের ঋণমান সমপর্যায়ের হওয়ায় সুদের হার কাছাকাছি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অর্থ মন্¿ণালয় জানায়, সরকারের ব্যাংক ঋণের ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সতর্ক করা হয়েছে। যে হারে সরকারের ব্যাংক ঋণ বাড়ছে, সেটি অব্যাহত থাকলে মুদ্রাপ্রবাহ আরও বেড়ে যাবে। এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে সেটি বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে। এর বাইরে ব্যাংকিং খাতে সরকারের ঋণ বাড়লে একদিকে যেমন বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হবে অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির রাশ টেনে ধরা অসম্ভব হবে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ সবকিছু বিবেচনা করেই সরকার শেষ পর্যন্ত বিদেশ থেকে বাণিজ্যিক ঋণ গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে।

আইএমএফের ১ বিলিয়ন ডলার ঋণের প্রতিশ্রুতি
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আইএমএফ বৈদেশিক লেনদেনে ভারসাম্য রায় (বিওপি) বর্ধিত ঋণ সহায়তা (ইসিএফ) হিসেবে ১ বিলিয়ন ডলার ঋণ দেবে বাংলাদেশকে। ৪ কিস্তিতে সংস্থাটি এ ঋণ দেবে। ঋণের প্রথম কিস্তিতে ২ হাজার ২৫০ কোটি টাকা (৩০ কোটি মার্কিন ডলার) সহায়তা পাওয়া যাবে।

ঋণ দেওয়ার আগে তারা বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি পর্যালোচনা করবে। বাংলাদেশে সফররত আইএমএফ প্রতিনিধি দলটি ফিরে গিয়ে প্রতিবেদন দেওয়ার পরই আইএমএফ ঋণের প্রথম কিস্তি ছাড় করবে। এর মধ্যে বিদ্যুত্, জ্বালানির মূল্য সমন্বয় করা ও ভ্যাট আইন সংস্কারের শর্ত রয়েছে।

ঋণ প্রদানে আইএমএফের শর্তগুলো হচ্ছে— ১. মূল্যস্ফীতি নিয়ন্¿ণে মুদ্রা সংকোচন নীতি গ্রহণ করা, ২. সরাসরি ট্যাক্স, বিশেষ করে ভ্যাটের আওতা সমপ্রসারণ আইন এবং ৩. বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন ও বাংলাদেশ বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ডের ওপর মনিটরিং বাড়ানো, যাতে বিদ্যুত্, সার ও পেট্রোলে ভর্তুকির হার কমানো যায়। সূত্রগুলো জানায়, এরই মধ্যে সরকার আইএমএফের শর্ত বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু করেছে।

চলতি মাসের প্রথম দিকে ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বোর্ড সভায় ইসিএফ ঋণের ব্যাপারে জোর তদবির চালানো হয় বাংলাদেশের প থেকে। ওই সভায় অর্থমন্¿ী আবুল মাল আবদুল মুহিত, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান ও অর্থ সচিব মোহাম্মদ তারেক অংশগ্রহণ করেন। সেখানে আইএমএফের সঙ্গে বৈঠকে লেনদেন ভারসাম্য রায় একশ’ কোটি ডলারের একটি ইসিএফ (বর্ধিত ঋণ সুবিধা) নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয় বলে দেশে ফিরে অর্থমন্¿ী সাংবাদিকদের জানান। এর আগে গত সেপ্টেম্বরে আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক শেষে অর্থমন্¿ী আবুল মাল আবদুল মুহিত ঋণের শর্তগুলোর কথা প্রকাশ করেন।

অর্থনীতি ও সরকার পরিচালনায় বিভিন্ন ধরনের নীতিনির্ধারণী শর্ত চাপিয়ে দেওয়ায় পৃথিবীর অনেক দেশ আইএমএফ থেকে বের হয়ে আসছে (ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া)। এমনকি বাংলাদেশও ২০০৭ থেকে ২০১০ পর্যন্ত আইএমএফ থেকে কোরনা ঋণ নেয়নি। সমপ্রতি বাংলাদেশ সরকার ১ বিলিয়ন ডলার (৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা প্রায়) ঋণ নেওয়ার জন্য জোর তদবির শুরু করে। জানা গেছে, ২০০৬-০৭ সালের শেষের দিকে পিআরএস প্রক্রিয়ার শেষ কিস্তির প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে মতদ্বৈততার কারণে আইএমএফ আর ছাড় করেনি। এর আগের চার বছরে (২০০৬ থেকে ২০১০) বাংলাদেশ আইএমএফ থেকে কোনো ঋণ গ্রহণ, এমনকি ঋণের জন্য কোনো আবেদনও করেনি। এর পেছনে বিদ্যমান অনেক কারণের মধ্যে একটি কারণ ছিল, বাংলাদেশের সন্তোষজনক রেমিট্যান্স আয়, যা প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ফলে আমদানি ব্যয় পরিশোধের েেত্র লেনদেনের ভারসাম্যহীনতার কোনো ব্যাপার ছিল না। তবে বিশ্ব অর্থনীতির নেতিবাচক পরিস্থিতি, প্রবাসীদের ফিরে আসা ও জনশক্তি রফতানি আশানুরূপ না হওয়ায় রেমিট্যান্স আয়ে ভাটা, আমদানিপণ্যের দাম বৃদ্ধি, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যশস্যের দামের ওঠানামা ও রফতানি আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কায় সরকার আইএমএফের কাছ থেকে ১ বিলিয়ন ডলার ঋণের জন্য আবেদন করে। গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে ঋণের আবেদন করলেও আইএমএফের ভর্তুকি বাড়ানোসহ বিভিন্ন শর্ত পালনের ব্যাপারে সরকারের নীতিনির্ধারকদের সায় পাওয়া যায়নি। ভাড়া করা বিদ্যুত্ প্লান্টের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে সমপ্রতি ভর্তুকি দ্বিগুণ হারে বেড়ে গেছে। পাশাপাশি আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় চাপের মুখে পড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ ও বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবে চলতি হিসাবের ভারসাম্য ঋণাত্মক (-) ৩০ কোটি ডলারে চলে গেছে বলে জানা গেছে। অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে চলতি হিসাবের ভারসাম্য ইতিবাচক ছিল। চলতি অর্থবছরে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর— এ তিন মাসে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৮১ কোটি ডলার। এর আগের মাসে অর্থাত্ জুলাই-আগস্ট প্রান্তিকে বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৪০ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল প্রায় ১৪৬ কোটি ডলার।

সরকার সঞ্চয়পত্রের সুদ হার বাড়াচ্ছে
ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ল্যমাত্রার বেশি ঋণ নেওয়ার পর এবার সঞ্চয়পত্র বিক্রির মাধ্যমে ঋণ পেতে বিভিন্ন ধরনের বন্ডের সুদের হার বাড়ানোর কথা ভাবছে। অর্থ মন্¿ণালয় সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র কেনার পরিমাণ ব্যাপক হারে কমেছে। প্রাক্কলন অনুযায়ী সরকার সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে অর্থবছরে ৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেবে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে মাত্র ৪৯৮ কোটি টাকার। সরকারের অভ্যন্তরীণ অর্থায়নের অন্যতম উত্স সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের ভাটা কাটছে না। গত অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যেখানে ছিল এক হাজার ৪৩৩ কোটি টাকা, সেখানে চলতি অর্থবছরের একই সময়ে বিক্রি হয়েছে মাত্র ৪৯৮ কোটি টাকা। গত তিন মাসে ব্যাংক, ডাকঘর ও সঞ্চয় ব্যুরোর মাধ্যমে মোট ৪ হাজার ৪৩১ কোটি ২১ লাখ টাকা বিনিয়োগের বিপরীতে গ্রাহকরা উত্তোলন করেছেন ৩ হাজার ৯৩২ কোটি ৭২ লাখ টাকা। অর্থাত্ তিন মাসে সঞ্চয়পত্র থেকে নিট বিনিয়োগ এসেছে ৪৯৮ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। এর কারণ হিসেবে উল্লেখ কর 

Sunday, July 3, 2011

বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকট : ইসলামী ব্যাংকিং-এর শক্তি



বিশ্ব অর্থনৈতিক সঙ্কটের একটি অন্যতম কারণ হলো ঝুঁকি ভাগাভাগির অনুপস্থিতি যা বাজার শৃঙ্খলাকে ভঙ্গুর করে দেয় এবং অতিমাত্রায় ধার-দেনা, উচ্চ লিভারেজ সুবিধা, ফটকাবাজি ও অস্থিতিশীল বাজার মূল্যের দিকে ধাবিত করে। প্রকৃত পণ্য ক্রয়ের জন্য পর্যাপ্ত আস্থা এবং ঝুঁকি ভাগাভাগি বাজার ব্যবস্থাপনায় বড় ধরণের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে  আনতে পারে এবং আর্থিক অস্থিতিশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে পারে ; ইসলামী অর্থায়ন এটিই প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ইসলামী অর্থনীতির স্বাভাবিক কার্যপদ্ধতি রয়েছে যা বিশ্ব অর্থব্যবস্থাকে স্বাভাবিক গতিতে পরিচালনায় সম করে তোলে এবং পদ্ধতিগত ধ্বস থেকে রা করে। আন্তর্জাতিক অর্থবাজারে ইসলামী আর্থিক নীতিমালা মানা হলে বর্তমান বিশ্ব অর্থনৈতিক সঙ্কট সৃষ্টি হতোনা। সর্বোচ্চ উতপাদন নিশ্চিত করার জন্য সম্পদ বন্টনে ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থার নিজস্ব প্রণোদনা রয়েছে। আধুনিক সমাজের জটিল আর্থিক সমস্যা সমাধানের জন্য ইসলামী অর্থনীতি ও সামাজিক নীতিমালার গবেষণা ও উন্নয়ন প্রয়োজন। স্বল্পকালীন তারল্য ব্যবস্থাপনা পণ্যের স্বল্পতার কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এখনো ইসলামিক ব্যাংকিং ও ফিন্যান্স অদম্য চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। দণি পূর্ব এশিয়ার ওআইসির সদস্য দেশসমূহের মধ্যে যোগাযোগ ও আলোচনা আরো অধিক হারে বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। ইসলামী ব্যাংকিং-এর মুদারাবা ও মুশারাকা পদ্ধতির সাহায্যে উদ্যোক্তা উন্নয়নের একটি আদর্শ পরিবেশ সৃষ্টি করা যেতে পারে। ইসলামী ব্যাংকগুলো দ্বি-স্তর বিশিষ্ট মুদারাবা পদ্ধতি ও সম্পদ বন্টনের মাধ্যমে গ্রাহক বঞ্চনার সমস্যাটি সমাধান করতে পারে। আশা করা যায়, ২০২৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং মূলধারার ব্যাংকিং-এ পরিণত হবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার, ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক এবং মুসলিম দুনিয়ার প্রচেষ্টা প্রশংসনীয়। 

“বিশ্ব অর্থনৈতিক সঙ্কট এবং ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থার শক্তি” শীর্ষক দুইদিন ব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এ পর্যবেণ করা হয়। ইসলামিক ব্যাংকস কনসালটেটিভ ফোরাম (আইবিসিএফ) সম্প্রতি ঢাকায় এ সেমিনারের আয়োজন করে। আইডিবি প্রেসিডেন্ট ড. আহমাদ মোহাম্মদ আলী এ সেমিনার উদ্বোধন করেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। 

সেমিনারের দ্বিতীয় দিনে পাঁচটি কর্ম অধিবেশনে সভাপতিত্ব  করেন- তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এ বি মীর্জ্জা মোঃ আজিজুল ইসলাম, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশ-এর সভাপতি মাহবুবুর রহমান, সাবেক উপদেষ্টা আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী, ওআইসি’র সাবেক এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারী জেনারেল মোহাম্মদ মহসিন এবং সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলী খান। সেমিনারে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অর্থনীতিবিদ ড. এম উমর চাপড়ার ‘বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকট : ইসলামী ফাইন্যান্সের আলোকে বৈশ্বিক আর্থিক স্থাপত্যগত সংস্কারের জন্য কতিপয় পরামর্শ’, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ অরলিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. কবীর হাসানের ‘বৈশ্বিক অর্থনেতিক সংকট ও ইসলামী আর্থিক সমাধান’, সংযুক্ত আরব আমিরাতের এইচএসবিসি, আমানাহ কমার্শিয়াল ব্যাংকের গ্লোবাল হেড ইয়াকুব বৌবাতের ‘বৈশ্বিক আর্থিক সংকট এবং জরুরী ইসলামী আর্থিক প্রবণতা’, বাংলাদেশের বিশিষ্ট ইসলামী ব্যাংকিং কনসালটেন্ট এম আযীযুল হকের ‘বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং-এর অবস্থান এবং একুশ শতকের এজেন্ডা’ এবং মালয়েশিয়ার ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর এডুকেশন এন্ড ফাইন্যান্স-এর প্রফেসর ড. যুবায়ের হাসানের ‘আত্ম স্বার্থের ঘাটতি এবং ইসলামী দৃষ্টিকোন থেকে এর বৃদ্ধি’ শীর্ষক পাঁচটি প্রবন্ধ উপস্থাপিত হয়। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষক ও অর্থনীতিবিদগণ এসব প্রবন্ধের উপর আলোচনা করেন। এসব আলোচনা উপস্থাপনা, পরামর্শ ও পর্যবেণের ভিত্তিতে সেমিনারে কতিপয় সুপারিশ গ্রহণ করা হয়। 
সেমিনারে সুপারিশ গ্রহণ করা হয়, প্রচলিত অর্থব্যবস্থার মোকাবেলায় সর্বজনগ্রাহ্য ইসলামী অর্থব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে  সমন্বিত অধ্যয়ন ও গবেষণা করতে হবে। ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে টেকসই করে গড়ে তোলার জন্য পরিচালনার অভিন্ন নীতিমালা ও বিধান প্রণয়ন করতে হবে। সৃজনশীল ও শরী‘আহ অনুমোদিত নতুন নতুন প্রোডাক্ট উদ্ভাবনের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকিং ইন্ডাস্ট্রির আরো উন্নতি ও প্রসার করতে হবে। অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, বৃহত্তর সমন্বয় এবং ক্রস বর্ডার আর্থিক  প্রবাহ সুবিধার জন্য সকল ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যোগাগোগ বৃদ্ধি 

করতে হবে এবং ইসলামী ব্যাংকিং বিষয়ক তদারকির জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি আলাদা ডিভিশন গঠন করতে হবে। 

ইসলামী ব্যাংকিং-এর শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত করার জন্য বিশ্বব্যাপী ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে নিয়মিত প্রযুক্তি, ধারণা  ও অভিজ্ঞতার বিনিময় করতে হবে।  বিভিন্ন নীতিমালা, পণ্য, নিয়মকানুন ও সুপারিশ প্রণয়ন ও বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে তা বাস্তবায়নের জন্য একটি ফোকাস গ্রুপ গড়ে তুলতে হবে। পাশ্চাত্য বিশ্বে ইসলামী ব্যাংকিং-এর ধারণা বাস্তবায়ন করতে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শক্তিশালী জোট গড়ে তুলতে হবে।  

সেমিনারে আরো সুপারিশ করা হয়, শরী‘আহ ভিত্তিক ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের তারল্য সংকট বা অতিরিক্ত তারল্য যথাযথ ব্যবস্থাপনার জন্য ইসলামী মানি মার্কেট গড়ে তুলতে হবে। ইসলামী  ক্যাপিটাল মার্কেটের অবকাঠামো গড়ে তোলার জন্য সরকার ও রেগুলেটররা ইসলামী ব্যক্তিত্বদের সহযোগিতা গ্রহণ করতে পারেন। ইসলামী ব্যাংকগুলো, রেগুলেটর ও সরকারের যৌথ উদ্যোগে ইসলামী ব্যাংকারদের সমন্বয়ে  একটি রিসোর্স পুল গড়ে তুলতে হবে। সম্পদ ভিত্তিক অর্থায়ন বৃদ্ধি করতে যেসব প্রচলিত ব্যাংক  ইসলামী ব্যাংকিং-এ রূপান্তরিত হতে চায় তাদেরকে সাহস ও সুবিধা প্রদান করতে হবে। নীতি নির্ধারনী মহলে ইসলামী ব্যাংকিং বিষয়ক ধারণার স্বল্পতা দূর করতে রেগুলেটরদের সাথে বৈঠক করার জন্য আইবিসিএফ-এর উচিত দ্রুত উদ্যোগ গ্রহণ করা। ইসলামী অর্থায়ন শিল্প আরো বিকাশে সম্পদ ভিত্তিক ও ঝুঁকি বন্টনমুলক পণ্য চালু করা প্রয়োজন।  ওয়াক্ফ ফান্ডের অর্থ সুদমুক্ত বিনিয়োগ  প্রদানে ব্যবহার করতে হবে এবং ক্যাশ ওয়াক্ফ  পদ্ধতিকে জনপ্রিয় করে তুলতে হবে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ কোম্পানীসমূহে যাকাতকে কর অনুমোদনযোগ্য ব্যয় ধরতে হবে। স্বল্প সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষের কাছে সম্পদ পৌঁছানোর মাধ্যমে বন্টনমূলক সুবিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইসলামী ব্যাংকগুলোকে ক্ষুদ্র অর্থায়নে আরো সম্পদ বন্টন করতে হবে। ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে তাদের লাভ-লোকশান অংশীদারিত্বমূলক পণ্য আরো বৃদ্ধি করতে হবে।  মুনাফা বৃদ্ধি প্রাধান্য না দিয়ে সামাজিক মূল্যবোধকে প্রাধান্য দান করে ব্যাংকিং করতে হবে। ঋণের প্রয়োজনকে বাস্তব ভিত্তিক খাতের ভিত্তিতে প্রাধান্য দিতে হবে যাতে ঋণের সম্প্রসারণ বাস্তব অর্থনীতির সম্প্রসারণের পদপে হয় এবং ফটকাবাজি ও জুয়া প্রতিষ্ঠায় সহায়ক না হয়। ডেরিভেটিভ মার্কেটকে যথাযথ মনিটরিং করতে হবে যাতে তা শুধুমাত্র রাকবচ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে এবং জুয়ার উপাদান উতপাটনে সহায়ক হয়। 

সেমিনার মুসলিম বিশ্বের রাষ্ট্র প্রধানদেরকে  অর্থনীতির সকল ক্ষেত্রে প্রচলিত ব্যাংকিং-এর তুলনায় শ্রেষ্ঠ ব্যবস্থা হিসেবে ইসলামী অর্থনীতির নিয়ম-কানুন প্রতিষ্ঠা করার জন্য সুপারিশ করছে। সকল লেনদেনে শুধুমাত্র মুনাফা বৃদ্ধির চেয়ে সামাজিক কল্যাণকে প্রাধান্য দিতে হবে। ইসলামী অর্থনীতিকে প্রচলিত অর্থনীতির মোকাবেলায় শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করতে হবে এবং এর সার্বিক ধারনাকে বাস্তবায়ন করার জন্য মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধানদের প্রতি সুপারিশ করা হয় এবং ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থাকে একটি বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য ইসলামী ব্যাংকসমূহকে গবেষণায় বেশি বেশি অর্থ ব্যয় করার আহ্বান জানানো হয়। 
ইসলামী ক্যাপিটাল মার্কেট গড়ে তুলতে ইসলামী দেশগুলোর সরকারকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। ইসলামী ব্যাংকগুলোকে নতুন নতুন পণ্য আবিষ্কারের মাধ্যমে গ্রাহকের চাহিদা পূরণ করতে হবে। মুসলিম স্কলারদেরকে বিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা ও অর্থনীতিতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের প্রতি মনোযোগ দিতে হবে। ইসলামীক আর্থিক ব্যবস্থার শক্তি বৃদ্ধির জন্য জনগণের অর্থনৈতিক ধারণা বৃদ্ধি করতে হবে। অর্থায়নের জটিল সমস্যা সমাধানে ও ইসলামী অর্থায়নের আলোকে সমাধান প্রদান করতে মেধাবীদের উন্নয়নকে প্রাধান্য দিতে হবে। সেমিনার বিশ্বাস করে যে নিয়মিত ও ধারাবাহিক ইসলমী ফিন্যান্স-এর উপর নেতৃত্ব সৃষ্টির প্রশিণ-এর আয়োজন, বাস্তবায়ন ও উন্নয়ন অতি জরুরী। 

Saturday, March 5, 2011

শেয়ারবাজার স্বাভাবিক রাখতে সরকার অনুদান নয়, ঋণ দিচ্ছে

সাম্প্রতিককালে শেয়ারবাজার পরিস্থিতি উত্তরণে সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। বিশেষ করে সাধারণ-ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। পতনের কারণগুলো চিহ্নিত করে কারসাজির সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি প্রদানের লক্ষ্যে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করার ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কিছুটা আশ্বস্ত হয়েছে।
শেয়ারবাজারে ধস নামার পরে এ সাধারণ-ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সবচেয়ে বেশি। আর্থিক ক্ষতি ছাড়াও পারিবারিক ও সামাজিকভাবে তারা বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষ ধর্মভীরু। একটি ধর্মীয় মূল্যবোধ তারা ঐতিহ্যগতভাবে সংরক্ষণ করে থাকে। শেয়ারবাজারের সাম্প্রতিক ঘটনার পর অনেক বিদগ্ধ ব্যক্তি বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে নানা রকম মন গড়া তথ্য দিয়ে যাচ্ছেন। একজন নাম করা অর্থনীতিবিদ তো দেশের শেয়ারবাজারকে ক্যাসিনোর সঙ্গে তুলনা করেছেন। ক্যাসিনো মানে জুয়াখানা। স্বাভাবিকভাবেই এসব ধর্মভীরু পরিবার থেকে প্রশ্ন উঠেছে, তাদের সন্তানেরা কি তবে শেয়ারব্যবসার নামে জুয়া খেলছে। এর উত্তর  কিন্তু ওনারা দিচ্ছে না। হয় তারা বলুক, প্রকৃত শেয়ারবাজার কখনও জুয়াখানা হতে পারে না। অন্যথায় বলুক,  এ কথা যদি সত্য হয় তবে এ জুয়ার আড্ডা বন্ধ করে দেয়া হোক। আসলে তারা জানেন, প্রকৃত শেয়ারবাজার কখনও ক্যাসিনো হতে পারে না, এটা সত্যিকারের একটা বিনিয়োগ মাধ্যম। এখানে বিনিয়োগের জন্য পড়াশুনা করে জ্ঞান অর্জন করা লাগে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বিনিয়োগ পদ্ধতি শেখানোর জন্য অনেক বিষয় পড়ানো হয়। বিভিন্ন কারণে আমাদের দেশের শেয়ারবাজার জুয়ার চরিত্র পেয়েছে। এর পেছনে যেমন শেয়ার ম্যানিপুলেটর রয়েছে তেমনি সরকারের অবদানও নেহায়েত কম নয়। শিল্প স্থাপন বা পরিচালনার জন্য ব্যাংকগুলো সাধারণত দীর্ঘমেয়াদে ঋণ দেয় না। প্রাথমিকভাবে দিলেও পরবর্তীতে আইপিও বিক্রি করে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ঋণের টাকা উঠিয়ে নেয়ার বিধান রয়েছে। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ নিঃসন্দেহে ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু তা ক্যাসিনোর মতো নয়। কোম্পানির আর্থিক অবস্থা বিশ্লেষণ করে, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা যাচাই করে এবং নানা রূপ বাছবিচার করে এখানে বিনিয়োগ করতে হয়। ঝুঁকি নিরূপণও তা এড়ানোর বিভিন্ন কৌশল বিদ্যমান রয়েছে এখানে। দেশের শেয়ারবাজার আজকের জায়গায় নিয়ে আসার জন্য কথিত জ্ঞানী অনেক অর্থনীতিবিদের অবদানও কম নয়। তারা বিভিন্ন লেখার মাধ্যমে ও টেলিভিশন টকশোতে অনবরত নছিহত করে গেছেন যে, আপনারা ভালো শেয়ার খরিদ করুন। এমনকি বাজার যখন অত্যন্ত উত্তপ্ত হয়ে গেছে, তখনও তারা কথিত ভালো শেয়ার কেনার কথা বলে এসব অতিমূল্যায়িত শেয়ার কেনার জন্য অকাতরে উপদেশ দিয়ে গেছেন। শেয়ারবাজার ম্যানিপুলেটররা এর সুযোগ নিয়েছে। তারা সাধারণ-ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের মনস্তাত্বিকভাবে প্ররোচিত করে ওইসব শেয়ার গছিয়ে দিয়েছে। এক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকাও কম নয়। শেয়ারবাজারের অস্বাভাবিক উত্থানের পর সরকার প্রথমে বাহবা নিয়েছে। বলেছে, শেয়ারবাজার স্বাভাবিকভাবে চলছে, এখানে ভয়ের কোন কারণ নেই, তাছাড়া ১৯৯৬ সালের মতো কোন ঘটনা ঘটার সম্ভবনা নেই। এমনকি এ বলেও বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্থ করা হয়েছে যে, ৩৩ লাখ বিনিয়োগকারীর এ বাজার ধ্বংস করার ক্ষমতা কারও নেই। অর্থমন্ত্রী নিজেও তার বিভিন্ন ভূলের কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন।

গত ডিসেম্বর মাসে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে লাভ করে শেয়ারবাজার থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও তাতে আপত্তি করেনি। এমনকি এ সময় তারা বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বিক্রি না করে ধরে রেখেছে। কারণ বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বাজারে অবদান ৬০%-এর বেশি। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ভেবেছে এসব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যদি শেয়ার বিক্রি করে লাভ করে তাতেও কোন ক্ষতি নেই। কারণ, ওদের লাভের অংশবিশেষ ডিভিডেন্ডের মাধ্যমে তারা ফেরত পাবেন। এমনকি বেশি লাভ করলে ওইসব শেয়ারের ক্যাপিটাল গেইনের মাধ্যমে তারা আরও লাভ করতে পারবে। সরকার এখানে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে এক প্রকার প্রতারণা করেছে। একদিকে সরকার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের নিয়মিতভাবে আশ্বস্ত করেছে, অন্যদিকে ওইসব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শেয়ারবাজারে নতুন করে বিনিয়োগ করতে মানা করছে। এমনকি শেয়ারবাজার থেকে প্রাপ্ত আয়ের ওপর ডিভিডেন্ড দিতেও তারা নিষেধ করেছে। তাহলে এখন এসব ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা যাবে কোথায়?
শেয়ারবাজারে ধারাবাহিক মূল্য পতনের কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা যথেষ্ট আস্থা হারিয়েছে। সে সঙ্গে বাজারে তারল্য সঙ্কট বিরাজ করছে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে ও তারল্য সঙ্কট দূর করতে সরকারের নির্দেশে আইসিবি এবং সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে একটি বড় আকারের তহবিল গঠন করে ভালো শেয়ার খরিদের মাধ্যমে শেয়ারবাজার স্থিতিশীল করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এটি একটি স্বাভাবিক উদ্যোগ। অথচ অনেক জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তি এর সমালোচনা করে বলছেন, সরকার এখানে কেন অর্থ ঢালছেন।

অনিবার্য এমনকি স্বাভাবিক ক্র্যাশের পরও বিভিন্ন দেশের সরকার শেয়ারবাজার পরিস্থিতি উত্তরণে আর্থিক সহযোগিতা  দিয়ে থাকে। আর আমাদের শেয়ারবাজার ধসের জন্য সরকারও যেখানে অনেকাংশে দায়ী, সেখানে শেয়ারবাজারের পরিস্থিতি উত্তরণে বিভিন্নভাবে সাপোর্ট দেয়া সরকারের নৈতিক কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। ধরা যাক, ধসের কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জায়গায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বেরিয়ে আসতে পারল না। তাহলে কি হতো? এসব প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস হয়ে যেত। আর জনসাধারণের আমানত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে একই সঙ্গে দেশের অর্থনীতিও ধ্বংস হয়ে যেত। বলা যায়, লাখ লাখ সাধারণ-ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের বলি দিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাঁচানো হয়েছে। সে সঙ্গে জাতীয় অর্থনীতিও বেঁচে গেছে।

মনে রাখা দরকার, সরকার এখানে কোনরূপ অনুদান দিচ্ছে না। ঋণ দিচ্ছে মাত্র। শেয়ারবাজারে এখনও যেমন কিছু অতিমূল্যায়িত শেয়ার বিদ্যমান রয়েছে তেমনি ধসের কারণে অনেক ভালো শেয়ারেরও অস্বাভাবিক মূল্য পতন ঘটেছে। এসব শেয়ারে বিনিয়োগ যথেষ্ট লাভজনক হবে। বিশেষ করে সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম স্মরণকালের সর্বনিম্ন স্তরে নেমে এসেছে। এখানে বিনিয়োগ করলে বিনিয়োগকৃত পুঁজি দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা বিদ্যমান। তবে সরকারকেও স্পষ্ট করে বলতে হবে যে, এ বছরে অন্তত সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর শেয়ার অফলোড করা হবে না। এখানে উল্লেখ্য, বিগত কয়েক বছর ধরে নিয়মিতভাবে ভারত সরকার সরকারি কোম্পানিগুলোর শেয়ারে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে চলেছে (ইউনিয়ন বাজেট ২০১১-১২ দ্রষ্টব্য)। অথচ আমাদের দেশে কিছুসংখ্যক অর্থনীতিবিদের চাপে সরকার এসব কোম্পানিগুলো থেকে সরকারি পুঁজি প্রত্যাহার করতে চাইছে।

তহবিল গঠনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো মনে রাখতে হবে, টাকাটা সরকার দিচ্ছে ঋণ হিসেবে। ব্যাংক হারে হলেও এর সুদ গুণতে হবে। সরকার মানে গৌরী সেন নয়। যথেচ্ছা ব্যবহারের মাধ্যমে যাতে এ টাকা নয়-ছয় না হয় তার জন্য সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। এ অর্থ বিনিয়োগের সময় দুই স্টক এক্সচেঞ্জের প্রেসিডেন্টদের পরামর্শ ও সহযোগিতা গ্রহণ একান্ত জরুরি। অন্যথায় বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ক্ষতির কারণ হতে পারে। আর এ বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হলে আর্থিকভাবে তো বটেই, শেয়ারবাজার পরিস্থিতি উত্তরণের সার্বিক লক্ষ্য অর্জনও সম্ভব হবে না। তাতে শেয়ারবাজারের আস্থার সঙ্কট আরও বৃদ্ধি পাবে।

Tuesday, March 1, 2011

মূল্য পতন ও প্রতারণা ঠেকাতে টেক ওভার পলিসি নিতে হবে

গত সোমবার আইসিবি’র তত্তাবধানে পুঁজিবাজারে তারল্য সরবরাহ বাড়িয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে একটি বিশেষ তহবিল গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সরকারী মালিকানাধীন ৪ ব্যাংক-সোনালী, রূপালী, অগ্রণী ও জনতাসহ আইসিবি, বিডিবিএল ও সাধারণ বীমা করপোরেশন যৌথভাবে এ তহবিল গঠন করবে। এই বৈঠক শেষে জানানো হয় যে, শেয়ারবাজারে স্থিতিশীলতা রক্ষায় আইসিবি ও ৪ রাষ্ট্রয়াত্ত ব্যাংক ইতোমধ্যেই বিনিয়োগ শুরু করেছে। আর যতদ্রুত সম্ভব এই তহবিলের কার্যক্রম শুরু হবে। আরও বলা হয়েছে, ভালো মৌলভিত্তির শেয়ারের দাম যাতে স্থিতিশীল থাকে সেজন্য একটি তালিকা তৈরি করে সাত প্রতিষ্ঠানকে ভাগ করে দেয়া হয়েছে। ওই তালিকা অনুযায়ী সাত প্রতিষ্ঠান নিজ নিজ উদ্যোগে বিনিয়োগ করবে।
এই ঘোষণার পর গতকালের শেয়ার ট্রেডিংয়ে ইতিবাচক ফলাফল লক্ষ্য করা গেছে। প্রায় সব শেয়ারের মূল্য বৃদ্ধি ঘটেছে। অথচ বলা হয়েছিল, ভালো মৌল ভিত্তির শেয়ারের দাম স্থিতিশীল করতেই এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কিন্তু শেয়ারবাজারে তার প্রতিফলন ঘটেনি। মূল্যসূচক একদিনেই বেড়ে গিয়েছে ৩৯৮ পয়েন্ট। এই মূল্য বৃদ্ধিকে কোন মতেই স্বাভাবিক ধরে নিয়ে বাজার স্থিতিশীলতার লক্ষণ বলে মেনে নেয়া যায় না। আজকেও যদি এই মূল্য বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকে তবে গত সপ্তাহের মতো আবার পর পর কয়েক দিন মূল্য পতন অবশ্যম্ভাবী হবে একথা বলার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। তাই আজকের দিনটা নীতি-নির্ধারকদের জন্য একটি অগ্নি পরীক্ষার সামিল। শেয়ারবাজার স্থিতিশীল করার জন্য আজ খুবই দক্ষতার সঙ্গে তহবিলের উদ্যোক্তাদের শেয়ার কেনা-বেচা করতে হবে। শেয়ার মূল্যসূচক যাতে না পড়ে, আবার কোন মতেই যাতে ১০০ পয়েন্টের বেশি না বাড়ে সেদিকে এসইসি, আইসিবি ও স্টক এক্সচেঞ্জগুলোর নীতি-নির্ধারকদের যথাযথ ভূমিকা পালন করতে হবে।

বলা হয়েছে, মৌল ভিত্তি সম্পন্ন শেয়ার খরিদ করা হবে। কিন্তু এই মৌল ভিত্তি নির্ধারণের মাপকাঠি কি হবে? দেখা গেছে বিগত দুই বছরে শেয়ারবাজারের মৌলভিত্তি নির্ধারণের জন্য ‘পিই’কেই একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এখনও কি তাই হবে?

এবারে কৃত্রিমভাবে শেয়ারের মূল্য বৃদ্ধির জন্য একটি চক্র কাজ করেছে। স্টক এ্ক্সচেঞ্জের সদস্য, এসইসি’র কিছু কর্মকর্তা, বাজার খেলোয়াড় ও কোম্পানির মালিক-পরিচালকরা মিলে এই চক্র তৈরি করেছে। সব চেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করেছে কোম্পানির মালিক-পরিচালকরা। প্রথমে তারা কিছূ অসাধু চাটার্ড একাউন্টিং ফার্মের সহায়তায় ফুলিয়ে-ফাপিয়ে কোম্পানির আর্থিক বিবরণী তৈরি করে বড় আকারের স্টক ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছে। এর মাধ্যমে কথিত ’পিই’ একটা ভালো জায়গায় দৃশ্যমান হয়েছে। অথচ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ওই কোম্পানির আগের বছরগুলোর ‘পিই’ কিন্তু অনেক বেশি ছিল। এরপর বাজার খেলোয়াড়রা বিভিন্ন রকম গুজব ছড়িয়ে ওই কোম্পানির শেয়ারের দাম আকাশ চুম্বি করেছে। এরপর ঘোষণা দিয়ে বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসইসিতে কোনরূপ ঘোষণা না দিয়েই ওই সব কোম্পানির মালিক-পরিচালকরা তাদের হাতে থাকা শেয়ারের সিংহ ভাগে বিক্রি করে দিয়েছে। সিডিবিএল ছাড়াও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ প্রকাশিত রিভিউ দেখলে অতি সহজেই এর প্রমান মিলবে।

এবারের শেয়ারবাজারে মূল্য পতনের সূত্রপাত হয়েছে যখন ওই সব কোম্পানির মালিক-পরিচালকরা শেয়ারবাজারের স্ক্রিনে ঘোষণা দিয়ে বিপুল সংখ্যক শেয়ার বিক্রি শুরু করেছে। ব্যাংক, ইন্সুরেন্স, আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ অনেক নামি-দামি কোম্পানির স্পন্সর-পরিচালকরা এই কাজ করেছে। এরপরে ধারাবাহিকভাবে মূল্য পতন ঘটতে থাকে। বলা হচ্ছে, শেয়ারবাজারে আস্থার সংকট সৃষ্টি হয়েছে। আস্থার সংকট সৃষ্টি হলে তা হয়েছে এদেরই জন্য। কারণ এরাই চাইছে শেয়ারবাজার আরও ফেলে দিয়ে ওইসব শেয়ারের বিক্রিত দামের থেকে অনেক কম দামে শেয়ারগুলো ফেরত পেতে।

এদের এই হীন উদ্দেশ্য যদি সফল হয় তবে কোনো প্রচেষ্টাই কাজে আসবে না। এরা শেয়ার মূল্যের পতন ঘটাতে ঘটাতে একেবারে শেষ করে দেবে। এখনও আস্থা যতটুকু আছে তাও আর অবশিষ্ট থাকবে না। তখন বাজার পরিস্থিতি আর স্বাভাবিক করা সম্ভব হবে না। তাই যা করার এখনি করতে হবে। আর করতে হবে একটা সুনিদ্দিষ্ট উদ্দেশ্য সামনে রেখে। উদ্দেশ্য হবে, প্রয়োজনে কোম্পানি টেক ওভার করা।

কোম্পানির শেয়ার হোল্ডিং বিবরণী দেখলেই জানা যাবে স্পন্সরদের কাছে কি পরিমাণ শেয়ার রয়েছে। এর মধ্যে যেসব কোম্পানির আর্থিক অবস্থা খুবই ভালো এবং মৌল ভিত্তি সম্পন্ন, আর সেই কোম্পানির স্পন্সর পরিচালকদের কাছে ২০% এর কম শেয়ার রয়েছে অথচ শেয়ারের দাম অনেক নিচে অবস্থান করছে এরূপ ১০-১৫টি কোম্পানি চিন্হিত করে ওইসব কোম্পানির শেয়ার কেনা শুরু করতে হবে। এর ফল হবে ম্যাজিকের মতো। এমন কি যদি এই দামে কোম্পানির মেজরিটি শেয়ারও কিনে নেয়া যায় তাতে কোনো ক্ষতি নেই। কারণ এগুলো খুবই লাভজনক কোম্পানি এবং শেয়ারও কেনা হবে খুবই কম দামে। এইসব কোম্পানির শেয়ারের দাম কমতে কমতে এখন ২০০৬/০৭ সালের অবস্থানে চলে এসেছে। সে কারণে এইসব শেয়ার খরিদ করা আর্থিক বিবেচনায় খুবই লাভজনক হবে। এরফলে ওই তহবিলের সংগঠকরা একদিকে যেমন এইসব শেয়ার কিনে লাভবান হতে পারবে তেমনি শেয়ারবাজারের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে এনে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট দুর করতে সহায়ক ভুমিকা পালন করবে।

মনে রাখা দরকার, তহবিলের অর্থের যোগান দিচ্ছে সরকার। সরকার মানে গৌরি সেন নয়। যথাযথ বিনিয়োগের মাধ্যমে লাভ করে এই টাকার সদ ব্যবহার করতে হবে। তাই এর জবাবদিহীতা অবশ্যই থাকতে হবে। ফান্ড ম্যানেজারদের বিষয়টি সর্বদাই মাথায় রাখা দরকার। 

Saturday, February 26, 2011

শেয়ারবাজার স্থিতিশীল হচ্ছে না কেন?

দিন কয়েক আগে অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, আগামী সপ্তাহে শেয়ারবাজার স্থিতিশীল হবে। সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও বাজার স্থিতিশীল হয়নি। এর কারণ অর্থমন্ত্রী এবং সরকারের উচ্চমহল শেয়ারবাজারের স্থিতিশীলতা চাইলেও বাজার খেলোয়াড়রা এটি চাইছে না। আর এ খেলোয়াড় বা কথিত সিন্ডিকেট চক্র আজও শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। এদের ক্ষমতা অনেক বেশি, যার কাছে সরকারের ইচ্ছা-অনিচ্ছা কোনরূপ মূল্যবহন করে না।
বলা হচ্ছে, শেয়ারবাজারে তারল্য সংকট রয়েছে। আরও বলা হচ্ছে, বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট বিরাজ করছে। মোটা দাগে দেখলে এটিই প্রতীয়মান হবে। কিন্তু গভীরভাবে যারা বাজার পর্যবেক্ষণ করেন তারা নিশ্চয়ই এর সঙ্গে একমত হবেন না। যারা তারল্য সংকটের কথা বলছেন, তারা আঙ্গুল তুলছেন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী এবং মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর দিকে। যারা শেয়ারবাজার সম্বন্ধে অভিজ্ঞ তারা জানেন, বাজারে একবার ধস নামলে এসব প্রতিষ্ঠান প্রথমেই হাত গুটিয়ে ফেলে। এর আগে উচ্চবাজার পরিস্থিতির সুযোগে তারা নিজেদের কাছে থাকা শেয়ার বিক্রি করে লাভ তুলে নিয়েছে। এখন দেখছে বাজার কতদুর পড়ে। কেবল দেখছে তাই নয়, তারা নিজেরাও সচেষ্ট রয়েছে বাজার যাতে আরও অস্থিতিশীল হয় তার জন্য। কারণ এরা জানেÑ পানি যত ঘোলা হবে, মাছ শিকারের সুবিধাটুকু তারাই পাবে।

এবার শেয়ারবাজারের এ চক্রের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ব্যাংক, ইনস্যুরেন্স ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন  কোম্পানির মালিক-পরিচালকরা। শেয়ারের উচ্চবাজার মূল্যের সুযোগে এরা নিয়মবহির্ভূত নিজেদের শেয়ারের সিংহভাগ অনেক বেশি দামে বিক্রি করে দিয়েছে। বড় বড় কোম্পানির স্পন্সর পরিচালকদের কাছে থাকা শেয়ারের বিবরণী পর্যালোচনা করলে তা সহজেই বোঝা যাবে। মূলত এরাই চাইছে শেয়ারের দাম আরও কমাতে। সরকারের উচ্চ মহলের সঙ্গে এরা সম্পর্কিত। তাই শেয়ারবাজারের এ উথাল-পাথাল অবস্থার পরেও এদের গায়ে আগুনের এতটুকু উত্তাপ লাগছে না।

শেয়ারবাজার স্থিতিশীল করতে সরকার যথাসাধ্য পদক্ষেপ নিয়েছে। আইসিবিসহ সরকারি ব্যাংকগুলো টাকা দিয়েছে বাজার পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটাতে। তাছাড়া প্রস্তাবিত অনেক মিউচুয়াল ফান্ডের ইক্যুইটি অংশের টাকা দিয়ে শেয়ার কেনার অনুমতিও দেয়া হয়েছে। কিন্তু তাতে বিশেষ ফল দিচ্ছে না। বলা হচ্ছে, চাহিদার তুলনায় এ অর্থের পরিমাণ খুবই নগণ্য। সত্যিই কি তাই? সরকার তো এজন্য তার ভা-ার উন্মুক্ত করে দিতে পারে না। এসব প্রতিষ্ঠানের ফান্ড ম্যানেজারদের দায়িত্ব হলো, সীমিত সম্পদ দিয়ে বাজার পরিস্থিতি সামাল দেয়া। কিন্তু তারা পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চাইতে বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করছে বেশি। এ পরিস্থিতিতে এদের কাজ হওয়া উচিত ঠেকা দিয়ে বাজার স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করা। অথচ এরাও আচরণ করছে একজন সাধারণ বিনিয়োগকারীর মতো। গত সপ্তাহে শেয়ার মূল্যসূচক ৫ হাজার ৫০০-এর কাছাকাছি চলে যাওয়ার পর সরকার জরুরিভিত্তিতে অর্থের জোগান দিয়ে আরও মূল্য পতন ঠেকাতে চেয়েছিল। বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রচার পাওয়ায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও কিছুটা আশ্বস্ত হয়ে পুনরায় বাজারমুখী হয়। এর ফলে একদিনে বাজারের মূল্য সূচক সাড়ে চারশ’র অধিক বেড়েছিল। পরদিন ট্রেডিংয়ের শুরুতে আবার যখন মূল্যবৃদ্ধির একই প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছিল, তখন বাজার আরও বাড়তে দেয়া কোন মতেই উচিত হয়নি। শেয়ার কেনার মতো যথেষ্ট অর্থ এখনো সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে। তারা তো চাইবেই-বাজারে চাহিদা সৃষ্টির মাধ্যমে দাম কিছুটা বাড়াতে। কিন্তু সরকারের এসব প্রতিষ্ঠানের তো সেই পথে চলা উচিত নয়। এ মুহূর্তে তাদের কাজ হওয়া উচিত, বাজারকে আরও বাড়তে না দিয়ে একটা জায়াগায় নিয়ে স্থিতিশীল করা। কারণ বাজার স্থিতিশীল হলেই কেবল সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে আসবে। অযথা বাজার বাড়লে স্বাভাবিক নিয়মেই বাজার আবার পড়ে যাবে এটি তো বোঝা যাচ্ছিল। হয়েছেও তাই। পরপর দু’দিন বাজার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক পরিণতিতে টানা কয়েক দিন বাজার পড়েছে। আর সে চক্র বাজারে সহজেই এই বলে গুজব ছড়াতে পারছে যে, বাজার আরও পড়বে।
 
আসলে এসব সরকারি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের একটা দুশ্চিন্তা সর্বদাই কাজ করছে। যেসব ফান্ড ম্যানেজার এগুলোর দায়িত্বে আছে তারা জেনে বুঝে আগেই অনেক উচ্চমূল্যে ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ার কিনে রেখেছে। এসব ভারি শেয়ারগুলো দিয়ে তাদের পোর্টফলিও সাজানো রয়েছে। অথচ তাদের উচিত ছিল, বাজারের উল্লম্ফন পরিস্থিতিতেও মাথা ঠা-া রেখে ভালো শেয়ারের মজুত বাড়ানো। ভালো শেয়ার মানে কেবলই কথিত ‘পিই’ সম্পন্ন ভালো কোম্পানির শেয়ার নয়। এগুলোর বাজার দামের দিকেও লক্ষ্য রাখা উচিত ছিল। একটি শেয়ার তখনই ভালো হয়, যখন কোম্পানির পারফরমেন্সের পাশাপাশি এর বাজার দামও স্বাভাবিক থাকে। এই কথিত অনেক ভালো শেয়ারের দাম যেমন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়েছিল তেমনি নাম করা অনেক প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির শেয়ারের বাজারমূল্য ৩০০ হাজার সূচকের দামের পর্যায়ে ছিল। কিন্তু এসব শেয়ারের দাম একটুও বাড়েনি বরং অনেক কমেছে এ কারণে যে, এগুলোর পেছনে গ্যাম্বলার ছিল না। কিন্তু এসেট ম্যানেজারদের তো সেদিকে দৃষ্টি দেয়ার কথা নয়।

বাজার স্থিতিশীল করতে হলে এসব বিষয়গুলো বিবেচনায় আনতে হবে। কারণ স্থিতিশীলতার অর্থ হলো, শেয়ারবাজারকে একটি ভারসাম্যের জায়গায় দাঁড় করানো। শেয়ারবাজারে ধস নামার পর ক্রমাগত মূল্য পতনের কারণে কথিত ভালো শেয়ারের পাশাপাশি অনেক প্রকৃত ভালো শেয়ারেরও অস্বাভাবিক মূল্য পতন ঘটছে। অনেক প্রকৃত ভালো শেয়ারের দাম এমনভাবে পড়ে গেছে যে, চোখ বুজে ওইসব শেয়ারে বিনিয়োগ করা যায়। সরকারি শেয়ারগুলোর দাম তো বিগত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থান করছে। অর্থমন্ত্রী এসব শেয়ারগুলো নিয়ে যেন তামাশা করছেন। একবার বলছেন অবিলম্বে এসব সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারবাজার ছাড়তে হবে। বাজার পরিস্থিতির কারণে তিনি আবার বললেন, আপাতত এগুলো বাজারে ছাড়া হবে না। আবার তার রেশ কাটতে না কাটতেই বলে বসলেন, মার্চেই এ শেয়ারগুলো বাজারে নিয়ে আসা হবে। সরকারের নীতিনির্ধারক মহলকে এ বিষয়ের ওপর প্রকৃত তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের এসব শেয়ার মধ্য মেয়াদের জন্য কিনতে উৎসাহ দেয়ার পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি এসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি এবং মিউচুয়াল ফান্ডগুলো যাতে এসব শেয়ার কেনে তার জন্য দিকনির্দেশনা দিতে হবে। এর ফলে যেসব শেয়ারের দাম অতিমূল্যায়িত রয়েছে সেগুলোর দাম আরও কিছুটা পড়ে এবং এসব অবমূল্যায়িত শেয়ারের দাম কিছুটা বেড়ে বাজারে একটা ভারসাম্য সৃষ্টি করবে। এর ফলে কমবেশি ৬ হাজার মূল্যসূচকের একটি স্থিতিশীল অবস্থা সৃষ্টির মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। বাজারে তারল্য সংকটের কারণে ট্রেডিং আওয়ার এক ঘণ্টা কমানো যেতে পারে। শেয়ারবাজারে বিপর্যয়ের পর অনেক দেশে এরূপ পদক্ষেপের ভালো ফল দেখা গেছে।
 
একবার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে তাদের বাজারমুখী করতে পারলে স্বাভাবিক নিয়মেই কথিত প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা শেয়ারবাজারে নিয়মিত কার্যক্রম শুরু করবে। কারণ, তারা লাভ চায়। চাপ দিয়ে তাদের শেয়ারবাজারে আনা যাবে না। লাভের সম্ভাবনা দেখা দিলে নিজের গরজেই তারা বাজারে ফিরে আসবে।

Wednesday, February 23, 2011

মার্চেন্ট ব্যাংক, ফোর্স সেল ও নৈতিকতা

সাম্প্রতিককালে শেয়ারবাজারে ব্যাপক মূল্য পতনের পর যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে তাতে মার্চেন্ট ব্যাংকের ভূমিকা নিয়ে জোরেসোরে আলোচনা চলছে। মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর কার্যক্রমে সরকারের নীতিনির্ধারক মহল বেশ সমস্যায় পড়েছে। বিশেষ করে অর্থমন্ত্রী এদের কার্যক্রমে নৈতিকতার প্রশ্ন তুলে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নতুন আইন করার কথা বলেছেন। তিনি প্রথম দিকে বলেছিলেন, মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর অনৈতিক কার্যক্রম কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। পরে গত শুক্রবার এসইসি অফিসে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর সঙ্গে কথা বলার পর তার সুর বেশ নরম হয়ে গেছে। তিনি বলেছেন, এসইসি ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো একত্রে বসে এর ব্যাংকিং কার্যক্রম কিভাবে হবে তা নির্ধারণ করবে।

আসলে করার তেমন কিছু নেই। বিশ্বব্যাপী মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো একটা নীতিমালার আওতায় পরিচালিত হয়। পুঁজিবাজারে এদের বিনিয়োগ হয় সিংহভাগ। ৭০% থেকে শুরু করে ক্ষেত্রবিশেষে প্রদানযোগ্য ঋণের ৯০% পর্যন্ত এরা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে। বিভিন্ন সূত্র থেকে তহবিল সংগ্রহ করে নিজেরাই যেমন পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে, তেমনি তাদের কায়েন্টদেরও শেয়ার খরিদের জন্য ঋণ সুবিধা প্রদান করে। মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো মূলত মার্জিন রুলস এর আওতায় এই ঋণ সুবিধা প্রদান করে থাকে। বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত একটি বিষয় হওয়ার কারণে এটি ফাইন্যান্সের ছাত্রছাত্রীদের পাঠ্য বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত। ব্যাংকগুলো সাধারণত ঝুঁকিমুক্ত থাকতে ১:১ অনুপাতে ঋণ সুবিধা প্রদানের পক্ষপাতি। এতে করে কায়েন্টদের স্বার্থ যেমন বজায় থাকে তেমনি ব্যাংকগুলোর নিজস্ব আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। কিন্তু সরকারের ইচ্ছা যদি অন্যরকম হয় অর্থাৎ সরকার যদি চায় শেয়ারবাজার চাঙ্গা হোক, তবে নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই ঋণ সুবিধা ১:১.৫ বা ক্ষেত্র বিশেষে ১:২ অনুপাতে ঋণ দেয়ার সিলিং নির্ধারণ করে দেয়। ঊর্ধ্বমুখী বাজারে এই ব্যবস্থা ব্যাংক এবং কায়েন্ট উভয়ের জন্য উপযোগী হলেও বাজার যখন নিম্নমুখী হয় তখন তা পরস্পরের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে শেয়ারবাজারে যদি কখনো ধস নামে তবে অধিক ঋণ নিয়ে খরিদ করা শেয়ারের লোকসানের কারণে একজন বিনিয়োগকারীর সর্বস্বান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যেমনটি বর্তমান সময়ে পরিলক্ষিত হচ্ছে।

সাধারণত ক্ষুদ্র-সাধারণ বিনিয়োগকারীরাই শেয়ার কেনার জন্য মার্চেন্ট ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করে। এই ঋণ গ্রহণের সময় তাদের ঋণের চার্জ পেপারে সই দিতে হয়। এখন অর্থমন্ত্রী যেমনটি বলেছেন, ‘নৈতিকভাবে তারা ফোর্স সেলের মাধ্যমে কায়েন্টদের শেয়ার বিক্রি করতে পারে না’ কথাটি কিছুটা হলেও সত্য। কারণ, এসব ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা অনভিজ্ঞতা ও প্রকৃত শেয়ার মূল্য সম্মন্ধে স্বচ্ছ ধারণার অভাবে  শেয়ার কেনার সময় মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর মুখাপেক্ষী ছিল। যথাযথ বিনিয়োগ পরামর্শ প্রদান মার্চেন্ট ব্যাংকের অনেকগুলো কাজের একটি। এখন মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো নির্ধারিত ফি নিয়েও যদি তাদের কায়েন্টদের অতি উচ্চ মূল্যে ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ার কেনার পরামর্শ দিয়ে থাকে এবং এরপর ধসের কারণে যদি ওই কায়েন্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয় তবে তার দায় সংশ্লিষ্ট মার্চেন্ট ব্যাংকের ওপর কিছুটা হলেও বর্তায়। সেক্ষেত্রে বাজার স্বাভাবিক হওয়া পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর অপেক্ষা করা উচিত। কারণ একবার শেয়ারগুলো ফোর্সড সেল হয়ে গেলে সর্বস্বান্ত হওয়া ছাড়া ওই বিনিয়োগকারীর আর কোন গত্যন্তর থাকে না। অতীতে দেখা গেছে, এরূপ পরিস্থিতিতে আইসিবিসহ অন্য অনেক মার্চেন্ট ব্যাংক তাদের বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে ফোর্স সেল থেকে বিরত ছিল।

অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে ওইদিনের আলোচনার পর এবারও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো সরকারের প্রস্তাবিত ১:২ হারে শর্তসাপেক্ষে ঋণ সুবিধা প্রদান করতে সম্মত হয়েছে। তবে শর্ত না বলে যথাযথভাবে মার্জিন রুলস অনুসরণ করে বললে ভাল হয়। তারা বলেছে, শেয়ারের মার্জিনের পরিমাণ ৫০% কমে গেলে একবার এবং ৭০% কমে গেলে আর একবার তারা মার্জিন কল করবে। মার্জিন পূরণ করতে ব্যর্থ হলে তারা ফোর্স সেল করতে পারবে, এরূপ অনুমতি দিতে হবে।

বিষয়টি বাণিজ্যিক বিবেচনায় যথার্থ। কিন্তু এসইসি এবং সরকারি মহল কে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে কিরূপ ব্যবস্থা  নেবে। এসইসি তো প্রত্যেক বিনিয়োগকারীদের বিও একাউন্ট খোলা ও নবায়নের সময় ৫০ টাকা গ্রহণ করে। এই অর্থের কিয়দংশ ব্যবহার করে তারা একটি বিনিয়োগ সহায়তা সেল গঠন করতে পারে, যেখান থেকে সাধারণ-ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা সঠিক বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন শেয়ারবাজার চাঙ্গা হবে তেমনি ওইসব বিনিয়োগকারীরাও ঝুঁকিমুক্ত থাকবে।

Sunday, February 20, 2011

শেয়ারবাজারের বিদ্যমান পরিস্থিতি উত্তরণে মিউচুয়াল ফান্ডগুলিই উপযুক্ত ভুমিকা পালন করতে পারে

শেয়ারবাজারের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে অনেকে বলছেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট কাটাতে না পারলে অবস্থার উন্নতি হবে না। একেবারে নতুন বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি প্রযোজ্য হলেও শেয়ারবাজারের নিয়মিত বিনিয়োগকারীদের জন্য কথাটি যথার্থ নয়। একথা সত্য যে, দেশের শেয়ারবাজার অনেক উত্তপ্ত হয়ে পড়েছিল এবং এর ফলে অনেক শেয়ারের দাম অতিমূল্যায়িত হয়ে যায়। কিন্তু যারা শেয়ারবাজারের সাথে নিয়মিত ভাবে সংশ্লিষ্ট এবং মোটামুটিভাবে যারা শেয়ারবাজার বোঝেন তারা নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন যে, বাজার ইতোমধ্যে যথেষ্ট সংশোধন হয়েছে। অনেক শেয়ারের দাম এখন এমন অবস্থায় পৌছেছে যে, এই দামে শেয়ার কিনলে বিনিয়োগকারীদের লোকসান হবে না বরং ভালো লাভ করতে পারবে। এসইসির একজন সাবেক চেয়ারম্যান সম্প্রতি বলেছেন, এই মহুর্তে অন্তত একশ শেয়ার আছে যেগুলি অনায়াসে খরিদ করা যায়। বাস্তব অবস্থাও তাই বলে। অথচ শেয়ারবাজারে সংকট কাটছে না। বিনিয়োগকারীরা সেভাবে শেয়ার কিনতে এগিয়ে আসছে না। কিন্তু বাস্তবতা হলো শেয়ার কিনছে না, না বলে বরং বলা উচিত কিনতে পারছে না। কারণটা আস্থার সংকট নয়, অর্থের সংকট। ইতোমধ্যে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সিকিউরিটিজ কোম্পানিগুলো তাদের হাতে থাকা অধিকাংশ শেয়ার বিক্রি করে লাভ ঘরে তুলে নিয়েছে। কারণ এরা অনেক বেশি অভিজ্ঞ এবং শেয়ার বাজার ভালো বোঝে। এদের মধ্যে অনেকে আবার উত্তপ্ত বাজারেও মিডিয়াতে আলোচনাকালে নির্র্বিকারে বলে গিয়েছেন যে, শেয়ার বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে এবং সাধারণ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের আশংকার কোন কারণ নেই। নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা এসইসি এবং সেই সাথে অর্থ মন্ত্রীও একই কথা বলে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করেছে। এখন এইসব ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা অতিমূল্যে শেয়ার খরিদ করায় এবং শেয়ারবাজার সম্মন্ধে সুম্পষ্ট ধারণা না থাকায় হাতের শেয়ারগুলিও বিক্রি করে নতুন বিনিয়োগযোগ্য অর্থ সংগ্রহ করতে পারছে না। এর মধ্যে মাননীয় প্রধান মন্ত্রীও শেয়ার ধরে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু বাজার পড়ে যাচ্ছে প্রতিদিন, আর তাতে করে ওইসব বিনিয়োগকারীরা দিশেহারা হয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছে রাস্তায় নেমে।

এই অবস্থা উত্তরণের উপায় কি? উপায় অর্থের সংস্থান করা। মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো একান্তই পেশাদার। তারা এই অবস্থায় নিজেরা যেমন নতুন করে বিনিয়োগে এগিয়ে আসছে না তেমনি তাদের কায়েন্টদেরকেও বিশেষ ঋণ সুবিধা দিচ্ছে না। অবশ্য এই অবস্থায় ঋণ করে শেয়ার না কেনাই ভালো। এর বিপরীতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মধ্য থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে মিউচুয়াল ফান্ডগুলো যার মধ্যে আইসিবিও রয়েছে। সাধারণত ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের বেশির ভাগ যেখানে বিনিয়োগ পারদর্শী নয়, সেখানে এইসব মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ যথেষ্ট দক্ষ এবং বাজার সম্মন্ধে সচেতন। কিন্তু এইসব মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর প্রতি ইচ্ছাকৃতভাবে অবহেলা করা হয়েছে। বাজার খেলোয়াড়রা সুচতুরভাবে এদের সম্মন্ধে নেতিবাচক প্রচারনা চালিয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। এসইসিও কারণে-অকারণে বিনিয়োগকারীদেরকে নিরুৎসাহিত করেছে এইসব মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করতে। ফলে মিউচুয়াল ফান্ডগুলো শেয়ারবাজারে অবমূল্যায়িত থেকেছে। এক-আধটি মিউচুয়াল ফান্ডের পরিচালকদের মধ্যে কিছুটা জুয়াড়ি মনোভাব ও ব্যক্তিগত অনিয়ম থাকলেও অপরাপর মিউচুয়াল ফান্ডগুলো তাদের শেয়ারহোল্ডারদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করেছে। সারা পৃথিবীজুড়ে শেয়ারবাজারে এইসব মিউচুয়াল ফান্ডগুলোই বিপদের সময় ত্রানকর্তার ভুমিকা পালন করেছে। কিছুদিন পূর্বে পার্শবর্তী ভারতের শেয়ারবাজারে যখন ব্যাপক ধ্বস নামে আর এরমধ্যে একদিনেই বিএসই সেনসেক্স ১ হাজার ২৮ পয়েন্ট পড়ে যায় তখন সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক এবং পরে আস্থার সঙ্কট দেখা দেয়। এই অবস্থায় ওই দেশের প্রায় ৭শ’ মিউচুয়াল ফান্ড অবস্থার উন্নতিতে ব্যাপক অবদান রাখে। অবশ্য ভারত সরকার এই সময় তাদেরকে বিভিন্ন সাহায্য-সহযোগিতা প্রদান করে, যার মধ্যে আর্থিক নীতি-মালা তৈরি করে নতুন পুঁজির যোগান ছিল অন্যতম। আমাদেরকেও একই পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর পুঁজির সংকট থাকলে তা কাটিয়ে ওঠার প্রযোজনীয় ব্যবস্থা সরকারকে নিতে হবে। এর জন্য আইনিসহ অন্যান্য সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে মিউচুয়াল ফান্ডগুলোতে ক্ষুদ্র-সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের জন্য উৎসাহিত করতে হবে। বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় কোজ-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর লভ্যাংশ প্রদানের নীতি-মালা সুস্পষ্ট করা দরকার। কোজ-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর বার্ষিক নিট আয়ের ৮০ শতাংশ লভ্যাংশ নিশ্চিত করতে হবে। প্রতি সপ্তাহে প্রকাশিত বিবরণ অনুযায়ী এই মহুর্তে মিউচুয়াল ফান্ড গুলোর আর্থিক অবস্থা যথেষ্ট ভালো। বিশেষ করে এগুলোর বাজার মূল্য অনেক ক্ষেত্রে তাদের নেট এসেট ভ্যালুর নিচে অবস্থান করছে বিধায় সেখানে বিনিয়োগ সম্পূর্ণ ঝুঁকিহীন, একথা নি:সন্দেহে বলা চলে। শেয়ারবাজারের নীতি-নির্ধারকসহ সরকারকে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।

Saturday, February 19, 2011

শেয়ারবাজার স্থিতিশীল করতে মিউচুয়াল ফান্ড গুলোর ওপর নির্ভর করতেই হবে

শেয়ারবাজারের সংকট যেন কাটছে না। শেয়ারবাজারের এই মহুর্তের সংকট হলো আস্থার সংকট। সেই সাথে অর্থের সংকট। আস্থার সংকট শুরু হয়েছে ডিএসই মূল্যসূচক যখন দুইদিনে ১২০০ পয়েন্ট পড়ে যায়। আবার পরে একদিনেই ১ হাজার পয়েন্ট উঠলেও তা দাড়াতে পারেনি। বাজার পড়তে থাকে এক নাগাড়ে। আর মূল্যসূচক সাড়ে পাঁচ হাজারে নেমে আসে। অর্থমন্ত্রীসহ সরকারের নীতি-নির্ধারকরা একের পর এক সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন আর পাল্টাচ্ছেন। কিন্তু সেভাবে ফল বয়ে আনছে না। আসলে শেয়ারবাজারে একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সে কারণে বাজারও ঠিক মতো আচরণ করছে না। যখন বাড়ছে তখন এক নাগাড়ে সব শেয়ারের দাম বাড়ছে। আবার যখন কমছে তখন এক নাগাড়ে সব শেয়ারের দাম কমছে।

গত শুক্রবার মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর সাথে বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী বিরক্তির সাথে বলেছেন, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে অনিচ্ছা সত্ত্বেও সরকারকে শেয়ার কিনতে হচ্ছে। কিন্তু সত্যিই কি তাই? সরকার নিজে তো কোন শেয়ার খরিদ করছে না। নতুন একটি মিউচুয়াল ফান্ড গঠন করে আর আইসিবিকে সরকার টাকা ধার দিয়েছে শেয়ার খরিদ করে বাজার স্থিতিশীল রাখার জন্য।

শেয়ারবাজারে মূল্য সংশোধনের পর এখন বেশির ভাগ শেয়ারের দাম মোটামুটি এমন পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে একটি বিনিয়োগ অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। অবশ্য এখনও অনেক শেয়ার যেমন অতিমূল্যায়িত রয়েছে তেমনি অনেক শেয়ারের দাম কমতে কমতে একেবারে সর্বনিম্ন অবস্থানে চলে এসেছে। এগুলো হচ্ছে কিছু বিনিয়োগকারীর শেয়ারবাজার সম্মন্ধে স্বচ্ছ ধারণার অভাবে। তারা বিভিন্ন মহলের আচরণে বিভ্রান্ত হয়ে যেনতেন প্রকারে এখান থেকে চলে যেতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। তার প্রতিফলন ঘটাচ্ছে শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে। একথা তারা বুঝছে না যে, তাদের বেচে দেয়া শেয়ার কেউ না কেউ কিনে নিচ্ছে। যারা কিনছে তারা নিশ্চয় একেবারে নির্বোধ নয়। যখন মূল্যসূচক নয় হাজার উঠেছিল তখনও শেয়ারবাজারে অনেক ভাল শেয়ারের দাম ৩ হাজার সূচকের দামের নিচে অবস্থান করছিল। এবারের শেয়ারবাজারে বাজার সিন্ডিকেট তথা গ্যাম্বলারদের প্রভাব এমন ছিল যে, ওই গ্যাম্বলাররা না চাইলে কোন শেয়ারের দাম এক বিন্দু বাড়েনি বরং কমেছে। কিছূ কিছূ শেয়ারের দাম তো নেট এসেট ভ্যালুর নিচে নেমে এসেছে। একটি সুস্থ শেয়ারবাজারের প্রাণ হলো মিউচুয়াল ফান্ডগুলো। অথচ এই সব বাজার খেলোয়াড়দের নেতিবাচক তৎপরতার কারণে বিনিয়োগকারীরা এগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছে। বাজার খেলোয়াড়দের এই কাজে ইন্ধন যুগিয়েছে এসইসি। কিন্তু বিশ্ব জুড়ে শেয়ারবাজারের বিপদের দিনে মিউচুয়াল ফান্ডগুলোই এগিয়ে আসে ত্রানকর্তা হিসেবে। পার্শ্ববর্তী ভারতের উদাহরণ আমাদের সামনে রয়েছে।

আমাদের শেয়ারবাজারের এই পরিস্থিতিতেও মিউচুয়াল ফান্ডগুলো যে ভূমিকা রাখতে পারবে সেই বোধ হয়েছে কর্তা ব্যক্তিদের। তারা সম্প্রতি কয়েকটি সরকারী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় ৫০০ কোটি টাকার একটি মিউচুয়াল ফান্ড গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু এই ৫০০ কোটি টাকা তো চাহিদার তুলনায় অতি নগণ্য। তারপর এর ব্যবস্থাপকরা যদি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ভূল করে অর্থাৎ বুঝেসুঝে শেয়ার খরিদ না করে তবে লোকসান গুনতে হবে; তাতে হিতে বিপরীত হবে। নতুন এই প্রতিষ্ঠানটির সফলতার ওপর অনেক কিছূ নির্ভর করছে। এটি সফল হলে সরকারী-বেসরকারী আরও নতুন নতুন মিউচুয়াল ফান্ড হবে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি বেসরকারী মিউচুয়াল ফান্ডের উদ্যোক্তাদের ইকুইটি অংশের টাকা দিয়ে শেয়ার কেনার অনুমতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু পাবলিক অংশের শেয়ার তো আইপিও ছেড়ে বাজারে বিক্রি করতে হবে। কিন্তু সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা  অনেক কমে গিয়েছে মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর ওপর থেকে। তার প্রতিফলন ঘটছে বাজারে থাকা মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর শেয়ার মূল্যে। বিনিয়োগকারীদের কে  নতুন সব মিউচুয়াল ফান্ডের প্রতি আকৃষ্ট করতে হলে বিদ্যমান মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর ওপর আস্থা ফেরাতে হবে সবার আগে। এর জন্য বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে নীতি-নির্ধারকদের। বিশেষ করে কোজ-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর জন্য সুস্পষ্ট ডিভিডেন্ড নীতি-মালা ঘোষণা করতে হবে। ডিভিডেন্ড নীতি-মালায় বর্তমানে যেসব ফাঁক-ফোকর আছে সেগুলো বন্ধ করতে হবে। কোজ-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডগুলো যাতে বার্ষিক নিট আয়ের কমপক্ষে ৮০ শতাংশ ডিভিডিন্ড প্রদান করে তার নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। সরকারের ঊর্ধŸতন মহলকেই বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

শেয়ারবাজারে বর্তমানে অর্থ সংকট প্রকট। ব্যাংক-আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে জোর করে শেয়ার খরিদে বাধ্য করা যাবে না যতক্ষন না তারা নিজেরা শেয়ার কিনতে আগ্রহী হয়। শেয়ারবাজারের নিয়মিত বিনিয়োগকারী ও মিউচুয়াল ফান্ডগুলোই বিচার বিবেচনা করে এখন শেয়ার খরিদ করছে। কিন্তু তাদের ক্রয় ক্ষমতাও সীমিত। শেয়ারবাজারে বাই প্রেসার-সেল প্রেসারের বিষয়টি সবার জানা আছে। কিন্তু ১১টা থেকে ৩টা অর্থাৎ ৪ ঘন্টার সেল প্রেসার থাকলেও সেই অনুপাতে এত দীর্ঘ সময় Ÿাই প্রেসার ধরে রাখা এদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। সে কারণে দিনের শুরুতে কেনাবেচা স্বাভাবিক থাকলেও শেষ দিকে এসে মূল্য পতন ঘটছে।  এই অবস্থার উত্তরণ ঘটাতে ট্রেডিং আওয়ার ৩ ঘন্টা অর্থাৎ বেলা ১১টা থেকে ২টা পর্যন্ত করা দরকার। অবস্থার উন্নতি হলে এটি আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যাবে। বিষয়টি কর্তৃপক্ষ ভেবে দেখতে পারেন।

Thursday, February 17, 2011

এবারে শেয়ারবাজার ম্যানুপুলেশনের হাতিয়ার ছিল ‘পিই’

পিই অর্থাৎ প্রাইস আর্নিং রেশিও। সহজ বাংলা ভাষায় কোম্পানির আয় ও চলতি বাজার মূল্যের অনুপাত। উচ্চতর হিসাব বিজ্ঞান কিংবা ফাইন্যান্স পড়ার সময় ছাত্র-ছাত্রীরা রেশিও এনালাইসিস করে। ১৪-১৫ রকমের রেশিও বিদ্যমান রয়েছে এই বিষয়ের ওপর। যার প্রত্যেকটিই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে একজন বিনিয়োগকারী যখন পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেয় তখন আরও অনেক বিষয়ের সাথে এই রেশিওগুলোর এনালাইসিস করতে হয়। বিনিয়োগ বাজারে অনেকগুলো ফ্যাক্টর বা উপাদান কাজ করে। বিশেষ করে মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে। কিন্তু আমাদের শেয়ারবাজারের কর্তা ব্যক্তিরা যেন এই একটি বিষয়কেই ধন্বন্তরী ওষুধ বলে মনে করে থাকেন। 
স্টক এক্সচেঞ্জের নেতা, এসইসির কর্মকর্তা বা অনেক নামকরা সিকিউরিটিজ হাউজের পরিচালকরা মিডিয়ায় আলোচনাকালে এই ‘পিই‘কেই প্রাধান্য দিয়ে আসছে। শেয়ারবাজারে ‘বুলিশ’ অবস্থা সৃষ্টির জন্য এরা ’পিই‘কে তারা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। কোম্পানির ‘পিই’ থেকে শুরু করে শেয়ারবাজারের সামগ্রিক ’পিই’কেও তারা বার বার এর মধ্যে টেনে এনেছে। এমনকি মার্চেন্ট ব্যাংকের ঋণ সুবিধা প্রদানের ভিত্তি হিসেবে ’পিই’কে ফ্যাক্টর বিবেচনার নির্দেশ দিয়েছে। বিষয়টি যে যথার্থ নয়, আজকের শেয়ার বাজার তার জ্বলন্ত প্রমান। কিন্তু কেন?

ধরে নেয়া যাক X কোম্পানির শেয়ারের বাজার মূল্য ৫০০ টাকা। ওই কোম্পানির আর্নিং পার শেয়ার অর্থাৎ ইপিএস ২৫ টাকা। তাহলে কোম্পানির পিই দাঁড়াচ্ছে ২০, যাকে মোটামুটি ভাল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। আবার Y কোম্পানির শেয়ারের বাজার মূল্য ২০০ টাকা। কোম্পানিটি বন্ধ থাকায় বা প্রতিকূল অবস্থার কারণে লাভ করতে না পারলে পিই হবে ২০০ বা ক্ষেত্র বিশেষে নেগেটিভ। একটি ধারণা প্রচলিত আছে যে, X কোম্পানিতে বিনিয়োগ করলে ২০ বছরে এবং Y কোম্পানিতে বিনিয়োগ করলে পুঁজি ফেরত আসতে ২০০ বছর সময় লাগবে। এটি স্রেফ একটি থাম্ব রুল মাত্র। কিছু কিছু জাতীয় দৈনিকের সাংবাদিক নির্বিকার ভাবে একথা লিখে দেয়। কিন্তু ধরুন, X কোম্পানি পরবর্তি বছর প্রতিকূল অবস্থার কারণে কোন আয় করতে পারল না, সেকারণে শেয়ারহোল্ডারদের ডিভিডেন্ড দিল না, এর পিই হয়ে গেল নেগেটিভ। আবার Y কোম্পানি প্রতিকূল অবস্থা কাটিয়ে ভাল ব্যবসা করে ইপিএস ১০ টাকায় উন্নীত করল। এক্ষেত্রে ওই কোম্পানির পিই হলো ২০। অর্থাৎ প্রথম কোম্পানিটি রাতারাতি খারাপ হয়ে গেল আর দ্বিতীয় কোম্পানিটি খুব ভাল হয়ে গেল? 

মোডিগিলানি এন্ড মিলার এর তত্ত্ব কিন্তু সে কথা বলে না। অথচ আমাদের শেয়ারবাজারের কর্তা ব্যক্তিরা কিন্তু ওই একটি বিষয়কেই নিয়ামক হিসেবে ধরে নিয়ে প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছে। সাধারণ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরাও বিষয়টি মেনে নিয়ে তাদের বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এক্ষেত্রে তাদের দোষ কোথায়? সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) অবশ্য গা বাঁচাতে কোথাও কোথাও ‘পিই‘র সঙ্গে অন্য বিষয় বিবেচনার কথা বললেও তার আওয়াজ ছিল ক্ষীণ, যা সাধারণ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের কান পর্যন্ত পৌছায়নি। মূল বিবেচ্য বিষয় হওয়া উচিত ছিল ওই শেয়ারের Intrinsic value বা অন্তর্নিহিত মূল্য কত তার হিসেব করা। এক্ষেত্রে কোম্পানির নেট এসেট ভ্যালু কত সেই বিষয়টি বিনিয়োগ সিদ্ধান্তের সময় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা উচিত, যা অন্তর্নিহিত মূল্য নির্দ্ধারণে প্রধান সহায়ক।
 
উল্লেখ্য, নেট এসেট ভ্যালু হলো একটি কোম্পানির শেয়ারের প্রকৃত মূল্য অর্থাৎ ওই কোম্পানির সম্পদ ও দায় এর পার্থক্য। এই সম্পদ মূল্য শেয়ারের অভিহিত মূল্যের অনুপাতে দেখানো হয়। সম্পদের থেকে দায় বেশি হলে নেট এসেট ভ্যালু নেগেটিভ অঙ্কের হবে। আবার সম্পদের থেকে দায় কম হলে ওই শেয়ারের নেট এসেট ভ্যালু পজিটিভ হবে। 
 
সাধারণত: বিশেষজ্ঞদের মতামত হলো, অন্তর্নিহিত মূল্য বিবেচনায় নিয়ে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেয়া দরকার। অন্তর্নিহিত মূল্যের চেয়ে বাজার দাম কম হলে ক্রয় সিদ্ধান্ত এবং এর বেশি হয়ে গেলে বিক্রয় সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। শেয়ারের বাজার মূল্য কোম্পানির নেট এসেট ভ্যালূর তিনগুণ অতিক্রম করলে তা সাধারণত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়। অবশ্য এর ব্যতিক্রমও রয়েছে। তবে সেক্ষেত্রে ওই কোম্পানির ইতিবৃত্ত যেমন, কোম্পানিটি কি ধরণের পণ্য উৎপাদন বা সেবা প্রদান করে, কতদিন যাবৎ ব্যবসা করছে, সুনাম কতখানি এবং
Sustainable growth possibility কেমন সেই বিবেচনায় অন্তর্নিহিত মূল্য আরও কিছুটা বাড়তে পারে। কিন্তু তা কখনই লাগাম ছাড়া হবে না। কিন্তু আমাদের শেয়ার বাজারে বিপরীত ঘটনা ঘটেছে যার ফলে অনেক শেয়ার অতিমূল্যায়িত হয়েছে। পিই’কে একমাত্র বিবেচ্য বিষয় হিসেবে মেনে নেয়া যায়, যদি কিনা বিগত পাঁচ বছরের গড় পিই’কে বিবেচনায় নেয়া হয়। কিন্তু তা হয়নি। এই সুযোগ নিয়েছে বাজার সিন্ডিকেট। এরা অনেক ক্ষেত্রে অলাভজনক কোম্পানির মালিকদের সহায়তায় প্রকৃত হিসাব বিবরণী ওলোট-পালট করে লাভ দেখিয়েছে। আবার এই সিন্ডিকেটই লভ্যাংশের অর্থ যোগান দিয়ে কৃত্রিমভাবে বাজার মূল্যও বাড়িয়েছে, এমন খবরও পত্র-প্রত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এসইসি বিষয়টি দেখেও না দেখার ভান করেছে। শেয়ারবাজারকে সুষ্ঠ ও স্বাভাবিকভাবে চলতে দেয়ার নিয়ত ছিল না অনেকেরই। তাই শেয়ারবাজারের আজকের পরিণতি অনিচ্ছা সত্তেও আমাদের মেনে নিতে হচ্ছে। এর অবসান করতে হবে, তা যেকরেই হোকনা কেন।

Saturday, February 12, 2011

শেয়ার বিনিয়োগকারীরা কার কথা শুনবেন মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর না লোটাস কামালের

শেয়ারবাজার বিশ্লেষণ
বিগত বছরের শেষদিকে দেশের শেয়ারবাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটলে অস্থিরতা শুরু হয়। মূলত এই অস্থিরতা শুরু হয় ২০১০ সালের ৯ ডিসেম্বর থেকে। ওইদিন শেয়ার মূল্যসূচক পাঁচশর অধিক পড়ে গেলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। বাজার ধসের এই প্রবণতা বেশ কয়েকদিন অব্যাহত থাকে। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে শেয়ারবাজার আবার কিছুটা ওঠতে থাকে। কিন্তু এই ওঠা স্বাভাবিক ছিল না। ছিল কারসাজিমূলক। এ সময় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা অধিক মূল্যে শেয়ার ক্রয় করে। পক্ষান্তরে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ বড় বড় বাজার খেলোয়াড়রা এই সুযোগে তাদের হাতে থাকা সমুদয় শেয়ারের সিংহভাগ বিক্রি করে লাভ তুলে নেয়। এরপর নতুন বছরের প্রথম সপ্তাহ থেকেই শেয়ারবাজারে শুরু হয় বড় ধরনের ধস। তারপর মহা কারসাজির খেলা। এ সময় একদিনে মূল্যসূচক ৫ মিনিটে যেমন ৬০০ পয়েন্ট নেমে আসে আবার একদিনেই মূল্যসূচক ১ হাজারের অধিক বৃদ্ধির রেকর্ড সৃষ্টি হয়।

এ সময় বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) ও সরকার মিলে শেয়ারের মূল্যে সার্কিট ব্রেকার কমানোসহ কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিলে বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হয়। এভাবে ওঠা-নামার মধ্যে বাজারে লেনদেন চলছিল। তাছাড়া অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের বক্তব্যে কিছুটা আশ্বস্ত হয়েছিল সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। এতে করে দরপতনের ধারার বিপরীতে বাজার ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

কিন্তু দেখা গেল, সাধারণ শেয়ার বিনিয়োগকারীরা সরকারি মহলের কথায় আশ্বস্ত হয়ে শেয়ার খরিদ করলেও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা তাদের হাতে থাকা শেয়ারসহ কায়েন্টদের শেয়ার বিক্রি করা শুরু করলে পুনরায় দরপতন ঘটতে থাকে। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা এ অবস্থায় রাস্তায় নেমে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে।
বাজারের এই অবস্থায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে বলেন, শেয়ারবাজারে ওঠা-নামা একটি স্বাভাবিক ঘটনা। তবে কেউ যদি কারসাজি করে শেয়ারবাজারের মূল্য ওঠা-নামা ঘটায় তার জন্য তাদের শাস্তি পেতে হবে। তিনি এ অবস্থায় শেয়ার বিনিয়োগকারীদের ধৈর্য ধরার পরামর্শ দেন এবং  আরও বলেন, ভালো শেয়ার ধরে রাখলে তাদের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে না। অর্থমন্ত্রীও এই সময় সংসদে প্রায় একই ধরনের কথা বলেন। বিনিয়োগকারীরা আশায় বুক বাঁধতে থাকে। কিন্তু মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে অর্থ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান আহম মুস্তাফা কামালের দেয়া বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় পরদিন দুই স্টক এক্সচেঞ্জেই মূল্যসূচক কমে যায়। এরপর থেকে পতনের ধারা অব্যাহত আছে। তিনি বলেছিলেন, ডিএসইর মূল্যসূচক ৩৫০০-৪০০০ হওয়া উচিত। কিন্তু সত্যিই কি তাই?

২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের মূল্যসূচক ছিল ৩ হাজার পয়েন্টের কাছাকাছি। গ্রামীণফোনের শেয়ার ছাড়ার পর মূল্যসূচকে যুক্ত হয় ৭০০-এর অধিক পয়েন্ট। এর সঙ্গে প্রায় ৫০টি নতুন ইস্যু, ২৬টি মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ক্যাপিটাল, কোম্পানিগুলোর দেয়া বোনাস ও রাইটশেয়ার বিগত দুই বছরে বাজার মূলধনে যুক্ত হয়েছে। এই বিবেচনায় ডিএসইর সাধারণ মূল্যসূচক স্বাভাবিকভাবে সাড়ে ৫ হাজারের কম হওয়ার কথা নয়। এছাড়া শেয়ারবাজারের পরিধি বিগত দুই বছরে ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছে। অবকাঠামো তৈরি হয়েছে লক্ষণীয়ভাবে। বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ৩৩ লাখ ছাড়িয়ে গেছে, যার মধ্যে প্রায় অর্ধেক সেকেন্ডারি মার্কেটে বিনিয়োগ করছে। আর একটি বিষয় এখানে দাবি রাখে, ১৯৯৬ সালে শেয়ারবাজারে সমুদয় শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছিল। এবার তা হয়নি। দেখা গেছে, অনেক ভালো শেয়ারের দাম ২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসের তুলনায় বাড়েনি বরং কিছুটা কমেছে। বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে এই শেয়ারগুলোর দাম যথেষ্ট বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই বিবেচনায় ডিএসইর মূল্যসূচক ৬০০০-৬৫০০ অস্বাভাবিক নয়।

কিন্তু লোটাস কামাল সাহেব এ কথা বললেন কেন?
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সিএমসি কামাল টেক্সটাইলের স্পন্সর পরিচালকদের কাছে বর্তমানে কোম্পানির স্বল্পসংখ্যক শেয়ার বিদ্যমান রয়েছে। আজ থেকে বছরখানেক আগে এই কোম্পানির শেয়ারের দাম ৬০-৭০ টাকা ছিল। বুল কার্টেলের মাধ্যমে ওই শেয়ারের দাম প্রায় ৩ হাজার টাকা উঠিয়ে তাদের পরিবারের হাতে থাকা প্রায় সব শেয়ার তারা বিক্রি করে দিয়েছে। এখন শেয়ারগুলো ফেরত আনা দরকার। কিন্তু বিক্রিত দামে নিশ্চয় নয়, এ দাম কমাতে হবে। এজন্য বাজারকে প্রভাবিত করতে হবে আতঙ্ক সৃষ্টির মাধ্যমে। এই আতঙ্ক সৃষ্টির জন্যই তিনি মূল্যসূচক সাড়ে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার হওয়ার কথা বলেছেন। তাছাড়া সাপ্রতিক সময়ে শেয়ার কারসাজির সঙ্গে তার জড়িত থাকার কথা মিডিয়ায় আলোচিত হয়েছে। এছাড়া তিনি কোম্পানির রাইটশেয়ার ইস্যুর পারমিশন বা অনুমোদন নিয়েছেন এসইসি থেকে। সাধারণত কোম্পানিগুলোর বিএমআরই করার জন্যই রাইট ইস্যুর অনুমোদন দেয়া হয়। সেখানে কোম্পানির আর্থিক অবস্থা বিবেচনা ও পর্যালোচনা করা হয়। অথচ দেখা যায়, ওই সিএমসি কামাল টেক্সটাইলের প্রতিটি শেয়ারের নেট এসেট ভ্যাল্যু ৯ দশমিক ৫৯ টাকা আর ইপিএস দশমিক ৯১ টাকা মাত্র। এই অবস্থায় সাড়ে ৭ শতাংশ প্রিমিয়ামে অর্থাৎ সাড়ে ১৭ টাকা মূল্যে ১:২ রাইট ছাড়ার অনুমোদন পেয়েছেন তিনি। তিনি এটা কীভাবে পেলেন বা এসইসিও কীভাবে তার অনুমোদন দিল তা তদন্তের দাবি রাখে।

উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালের শেয়ারবাজার পরিস্থিতির সুযোগে অনেক কোম্পানি এরূপ রাইটশেয়ার ছেড়ে বিপুল অঙ্কের অর্থবাজার থেকে সংগ্রহ করে। কিন্তু এগুলোর কী পরিণতি হয়েছিল তা প্রায় সবাই অবগত আছেন। এসময় তৃপ্তি ইন্ডাট্রিজ লিমিটেড অস্বাভাবিকভাবে শেয়ার মূল্য বাড়িয়ে একশ’ টাকা ফেস ভ্যালুর শেয়ার ১৩০ টাকা প্রিমিয়াম নিয়ে ২৩০ টাকায় শেয়ারহোল্ডারদের কাছে বিক্রি করে। পরবর্তিতে ওই শেয়ারের দাম ২৫-৩০ টাকায় নেমে আসলে শেয়ারহোল্ডাররা সর্বস্বান্ত হয়।

এমতাবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, শেয়ার বিনিয়োগকারীরা কার কথা শুনবে? মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর না লোটাস কামালের। বাস্তবতার নিরিখে বলা যায়, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কথাই যথার্থ। তবে ভবিষ্যতে এরূপ নেতিবাচক বক্তব্য জনসমক্ষে যাতে তিনি না দেন তার ব্যবস্থা গ্রহণ আবশ্যক।

Sunday, October 10, 2010

আস্থার ব্যাংকিং : ইসলামী অর্থায়ন যেভাবে হয়

মওরা ফগার্টি


এশিয়ায় ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থা। বিভিন্ন ব্যাংক একের পর এক তাদের গ্রাহকদের জন্য ইসলামিক ব্যাংকিং সেবা চালু করছে। মালয়েশিয়ায় গত মে মাস পর্যন্ত পূর্ববর্তী ১২ মাসে ইসলামী ব্যাংকিং পদ্ধতিতে গাড়ি বিনিয়োগ প্রদান ২০ শতাংশ বেড়েছে। ইন্দোনেশিয়ায় গত ৫ বছরে  ইসলামী ব্যাংকিং শাখা বেড়েছে তিনগুণ। ইসলামী ব্যাংকিংয়ের এই ব্যাপক প্রসার শুধুমাত্র এশিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। মুডি’র তথ্য অনুযায়ী চলতি বছর বিশ্বে ইসলামী ব্যাংক গুলোর বিনিয়োগ চাহিদা এক লক্ষ কোটি ডলার (এক ট্রিলিয়ন ডলার) ছাড়িয়ে যাবে। বর্তমানে উপসাগরীয় অঞ্চলের আরব দেশগুলোতে ইসলামী ব্যাংকিং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আধিপত্য বিস্তার করে আছে।  তবে এশিয়াও দ্রুত এগিয়ে আসছে।

ব্লুমবার্গ’র তথ্য মতে, এ বছর বিশ্বে ৮০০ কোটি ডলার ইসলামিক বন্ড বিক্রি হয়েছে এবং এর মধ্যে ৬৮ ভাগ হলো এশিয়ায়। এশিয়ায় ইসলামী অর্থ ব্যবস্থার কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে মালয়েশিয়া। ইসলামিক বন্ড ইস্যুর ক্ষেত্রে তারা এখন বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। মালয়েশিয়ায় বর্তমানে যে পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ হচ্ছে তার ২০ ভাগ ইসলামী ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণে। উপসাগরীয় অঞ্চলে এ অংশ ৩৫ ভাগ।

ইসলামী ব্যাংকিং কি?
ইসলামী ব্যাংকিং এর দু’টি দিক রয়েছে। এ ব্যাংক মূলত ঐসব মুসলমানের জন্য যাদের ব্যাংকিং সেবা দরকার এবং সাথে সাথে যারা চান তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের জায়গাটা যেন ঠিক থাকে। ব্যাংকিং ব্যবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট থাকার কারণে ধর্মের সাথে যেন কোন আপোষ করতে না হয়।

পশ্চিমা দেশে যেমন নৈতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা (এথিক্যাল ব্যাংকিং) রয়েছে, এ ব্যবস্থা কিছুটা সে রকম। পশ্চিমা দেশে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান মাঝে মধ্যে গ্রাহকদের জন্য নৈতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা অফার করে থাকে। এসব ব্যাংক অস্ত্র এবং প্রতিরক্ষা বিষয়ক পণ্য উৎপাদনে কোন ধরণের বিনিয়োগ করে না। ইসলামী ব্যাংকেও একই নীতি মেনে চলা হয়।

প্রথাগত ব্যাংকের সাথে ইসলামী ব্যাংকের পার্থক্য হলো এটা শরীয়াহ আইন দ্বারা পরিচালিত। শরীয়াহ আইনের একটি প্রধান দিক হল ‘সুদ নিষিদ্ধ করা’। এশিয়ার অন্যতম প্রধান ইসলামী ব্যাংক ‘সিআইএমবি ইসলামিক ব্যাংক বারহাদ’-এর নির্বাহী পরিচালক এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বাদলিশা আব্দুল গনি বলেন, প্রথাগত ব্যাংকের সাথে ইসলামী ব্যাংকের পার্থক্যের মূলে রয়েছে সুদ ব্যবস্থা। প্রথাগত ব্যাংকে বিনিয়োগগ্রহীতা এবং দাতার মধ্যে পারস্পরিক চুক্তির মাধ্যমে সুদ নির্ধারিত হয়। ইসলামী  ব্যাংক তা করে না। কেউ টাকা  পরিশোধে দেরি করলে  ইসলামী ব্যাংক তার মাধ্যমে লাভবান হয় না। বিলম্বে বিনিয়োগ পরিশোধের জন্য চার্জ আরোপ করা হলে এবং এ বাবদ যে আয় হয় তা সমাজ কল্যাণে ব্যয় করা হয়।

সমস্ত ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠানে শরীয়াহ বোর্ড রয়েছে। বোর্ডের সদস্যরা সাধারণত শরীয়াহ আইন-কানুন এবং ইসলামিক অর্থ ব্যবস্থা সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ হয়ে থাকেন। মুসলমানরা ইসলামের মূলনীতি মেনে অর্থ সঞ্চয়, বিনিয়োগ এবং বিনিয়োগ গ্রহণে আগ্রহী। তবে, এ ব্যাংক ব্যবস্থা সকলের জন্যই উন্মুক্ত।

ইসলামী ব্যাংকিং সেবাসমূহ
ইসলামী ব্যাংকিংয়ের অধীনে বেশ কিছু সেবা রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল সঞ্চয়, ক্রেডিট কার্ড. বিনিয়োগ ও বীমা।  জনপ্রিয় ক’টি সেবা এখানে তুলে  ধরা হল।

মর্টগেজ এবং গাড়ি বিনিয়োগ: এ ক্ষেত্রে  ব্যাংক ‘মুরাবাহা’ অথবা  ‘ইজারাহ’ পদ্ধতি  অনুযায়ী গ্রাহকের সাথে অর্থায়ন চুক্তি করে। মুরাবাহা চুক্তি অনুসারে ব্যাংক নিজে  বাজার থেকে  গাড়ি বা অন্য কোন পণ্য কিনবে। তারপর বাজারের চেয়ে একটু বেশি দাম ধরে গাড়িটি গ্রাহকের কাছে হস্তান্তর করা হবে। গাড়ির দাম গ্রাহক কিস্তিতে পরিশোধ করতে পারে। ইজারা পদ্ধতিতেও ব্যাংক নিজে বাজার থেকে কোন পণ্য কিনবে। তারপর গ্রাহককে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পণ্যটি লিজ দেয়া হবে। লিজের ভাড়া কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ থাকে এবং একপর্যায়ে পণ্যটির মালিক হয়ে যায় গ্রাহক।

বিনিয়োগ তহবিল: যেসব প্রতিষ্ঠান নৈতিক আর্থিক কর্মকান্ডের সাথে জড়িত তাদের ক্ষেত্রে  সাধারণত ইসলামী ব্যাংক বিনিয়োগ করে। এটা অনেকটা সোস্যালি রেসপনসিবল ফান্ড (এসআরএফ) বা সামাজিক দায়বদ্ধ তহবিল’র মত। যেসব প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানী এ্যালকোহল, তামাক, জুয়া ও পর্ণোগ্রাফির  মত  পণ্য  উৎপাদন ও তৈরির সাথে জড়িত তাদের ক্ষেত্রে ইসলামী ব্যাংক বিনিয়োগ করে না। এছাড়া শূকরের ব্যবসা করে  এবং যেসব প্রতিষ্ঠান সাধারণ ব্যাংক ও বীমার মত সুদ নেয় ও দেয় তাদের শেয়ার কেনার ক্ষেত্রেও বিনিয়োগ তহবিলের অর্থ খাটানো হয় না।

‘সোসাইটি অব ফাইন্যান্সিয়াল  সার্ভিস প্রফেশনালস’-এর সাবেক প্রেসিডেন্ট লিয়ং এসজি হিয়ান পরামর্শ দিয়ে বলেন, ইসলামী  তহবিল ঝুঁকিমুক্ত নয়।  ইসলামী  মানে কম ঝুঁকিপূর্ণ, সেটি মনে করবেন না। আপনি যদি  ইসলামীক ফান্ডের মূল বিষয়টা বুঝতে না পারেন তা হলে এটি আপনার জন্য অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তিনি বলেন, আপনার পুরো বিনিয়োগ ইসলামী তহবিলকে ভিত্তি করে আবর্তিত হলে তাতে পর্যাপ্ত বৈচিত্র্য থাকবে না। 

ব্যাংক আমানত: ইসলামী ব্যাংকিং  ব্যবস্থায়  জনসাধারণের কাছ থেকে অনেকভাবে আমানত গ্রহণ করা হয়। ‘মুদারাবা’ একাউন্টের মাধ্যমে যে আমানত গ্রহণ করে তা  ব্যাংক যৌথ উদ্যোগে বিনিয়োগ করে এবং  লাভ ভাগাভাগি করে নেয়। এছাড়া ‘ওয়াদিয়াহ’ আমানত ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যাংক গ্রাহককে সুদের বদলে হিবা বা পুরস্কার দিতে পারে।

তাকাফুল (ইসলামী বীমা): এ বীমা ব্যবস্থার মাধ্যমে এক দল লোক নিজেদের মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে অপরের দুঃখ বা বিপদ ভাগ করে নেয়। এ জন্য তাকাফুল পরিচালনা পরিষদের মাধ্যমে তারা একটি সাধারণ তহবিল তৈরি করে এবং ওই তহবিলের মাধ্যমে কোন সদস্যের বিপদে পাশে দাঁড়ানো হয়। এর মাধ্যমে তারা সম্মিলিতভাবে কোন ঝুঁকি মোকাবেলা করে থাকে। প্রথাগত অন্যান্য ব্যাংকের তুলনায় ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ঝুঁকি ভাগাভাগি করে নেয়ার একটি মধ্যস্থতা কাঠামো আছে। আর এখানে স্বচ্ছতার জন্য কিছু কিছু আর্থিক লেনদেনের মূল বিষয়ের প্রতি নজর রাখা হয়।
বাদলিশাহ জানান, ইসলামী ব্যাংকিংয়ে কোন লুকানো খরচ নেই। ফলে আপনি যা দেখবেন বাস্তবে তাই পাবেন। তিনি আরো বলেন, প্রথাগত অন্যান্য ব্যাংক  আপনাকে যেসব নিরাপত্তা ও সুরক্ষা দেবে ইসলামী ব্যাংকও ঠিক একই  নিরাপত্তা ও সুরক্ষা দেয়। যেটি গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা দরকার তা হলো অন্যান্য সাধারণ ব্যাংক এবং ইসলামী ব্যাংক দেশের একই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিধিমালার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত হয়। ফলে উভয় ব্যাংকের গ্রাহকের অধিকার সমানভাবে সুরক্ষার ব্যবস্থা  আছে।

এশীয় অঞ্চলের ইসলামী ব্যাংকিং বিকাশের ক্ষেত্রে দেশী বিদেশী বিনিয়োগকারীরা জড়িত রয়েছেন। মালয়েশিয়া এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে  প্রতিযোগিতাপূর্ণ স্থানে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় সিআইএমবি ইসলামিক ব্যাংক বিশ্বব্যাপী পরিচিত আর্থিক প্রতিষ্ঠান এইচএসবিসি’র ইসলামী শাখা ‘আমানাহ’ এবং স্ট্যান্ডার্ড চাটার্ড ব্যাংকের ইসলামিক শাখা ‘সাদিক’ এর সাথে প্রতিযোগিতা করছে। এশিয়ায় মালয়েশিয়া যেমন ইসলামী ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উন্নতি লাভ করেছে তেমনি তাদের দেখাদেখি প্রতিবেশী ইন্দোনেশিয়া এবং সিঙ্গাপুরও এর বিকাশকে  উৎসাহিত করছে।

ইন্দোনেশিয়ার ইসলামী ব্যাংকগুলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে  অধিক বিনিয়োগের সিদ্বান্ত নিয়েছে। ইন্দোনেশিয়ায় সবচেয়ে বেশি মুসলমানের বসবাস। কিন্তু সে তুলনায় তারা ইসলামী ব্যাংকিংয়ের অনেক দেরীতে অগ্রসর হয়েছে। এখানকার কর্তৃপক্ষ ইসলামী ব্যাংকিং এর অনুমোদন দিয়েছে আর এজন্য একটি নিয়ন্ত্রণ ও আইনী কাঠামো উন্নয়নের কাজ করছেন। ইন্দোনেশিয়ার কর্তৃপক্ষ দেশটির সর্বত্র প্রথাগত ও ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা সমন্বয়ে একটি দ্বৈত ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য কাজ করছে যাতে এটি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বা আর্থিক খাতে  কোন সঙ্কট সৃষ্টি হলে তখন সহায়তা করতে পারে।