Saturday, February 19, 2011

শেয়ারবাজার স্থিতিশীল করতে মিউচুয়াল ফান্ড গুলোর ওপর নির্ভর করতেই হবে

শেয়ারবাজারের সংকট যেন কাটছে না। শেয়ারবাজারের এই মহুর্তের সংকট হলো আস্থার সংকট। সেই সাথে অর্থের সংকট। আস্থার সংকট শুরু হয়েছে ডিএসই মূল্যসূচক যখন দুইদিনে ১২০০ পয়েন্ট পড়ে যায়। আবার পরে একদিনেই ১ হাজার পয়েন্ট উঠলেও তা দাড়াতে পারেনি। বাজার পড়তে থাকে এক নাগাড়ে। আর মূল্যসূচক সাড়ে পাঁচ হাজারে নেমে আসে। অর্থমন্ত্রীসহ সরকারের নীতি-নির্ধারকরা একের পর এক সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন আর পাল্টাচ্ছেন। কিন্তু সেভাবে ফল বয়ে আনছে না। আসলে শেয়ারবাজারে একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সে কারণে বাজারও ঠিক মতো আচরণ করছে না। যখন বাড়ছে তখন এক নাগাড়ে সব শেয়ারের দাম বাড়ছে। আবার যখন কমছে তখন এক নাগাড়ে সব শেয়ারের দাম কমছে।

গত শুক্রবার মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর সাথে বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী বিরক্তির সাথে বলেছেন, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে অনিচ্ছা সত্ত্বেও সরকারকে শেয়ার কিনতে হচ্ছে। কিন্তু সত্যিই কি তাই? সরকার নিজে তো কোন শেয়ার খরিদ করছে না। নতুন একটি মিউচুয়াল ফান্ড গঠন করে আর আইসিবিকে সরকার টাকা ধার দিয়েছে শেয়ার খরিদ করে বাজার স্থিতিশীল রাখার জন্য।

শেয়ারবাজারে মূল্য সংশোধনের পর এখন বেশির ভাগ শেয়ারের দাম মোটামুটি এমন পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে একটি বিনিয়োগ অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। অবশ্য এখনও অনেক শেয়ার যেমন অতিমূল্যায়িত রয়েছে তেমনি অনেক শেয়ারের দাম কমতে কমতে একেবারে সর্বনিম্ন অবস্থানে চলে এসেছে। এগুলো হচ্ছে কিছু বিনিয়োগকারীর শেয়ারবাজার সম্মন্ধে স্বচ্ছ ধারণার অভাবে। তারা বিভিন্ন মহলের আচরণে বিভ্রান্ত হয়ে যেনতেন প্রকারে এখান থেকে চলে যেতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। তার প্রতিফলন ঘটাচ্ছে শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে। একথা তারা বুঝছে না যে, তাদের বেচে দেয়া শেয়ার কেউ না কেউ কিনে নিচ্ছে। যারা কিনছে তারা নিশ্চয় একেবারে নির্বোধ নয়। যখন মূল্যসূচক নয় হাজার উঠেছিল তখনও শেয়ারবাজারে অনেক ভাল শেয়ারের দাম ৩ হাজার সূচকের দামের নিচে অবস্থান করছিল। এবারের শেয়ারবাজারে বাজার সিন্ডিকেট তথা গ্যাম্বলারদের প্রভাব এমন ছিল যে, ওই গ্যাম্বলাররা না চাইলে কোন শেয়ারের দাম এক বিন্দু বাড়েনি বরং কমেছে। কিছূ কিছূ শেয়ারের দাম তো নেট এসেট ভ্যালুর নিচে নেমে এসেছে। একটি সুস্থ শেয়ারবাজারের প্রাণ হলো মিউচুয়াল ফান্ডগুলো। অথচ এই সব বাজার খেলোয়াড়দের নেতিবাচক তৎপরতার কারণে বিনিয়োগকারীরা এগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছে। বাজার খেলোয়াড়দের এই কাজে ইন্ধন যুগিয়েছে এসইসি। কিন্তু বিশ্ব জুড়ে শেয়ারবাজারের বিপদের দিনে মিউচুয়াল ফান্ডগুলোই এগিয়ে আসে ত্রানকর্তা হিসেবে। পার্শ্ববর্তী ভারতের উদাহরণ আমাদের সামনে রয়েছে।

আমাদের শেয়ারবাজারের এই পরিস্থিতিতেও মিউচুয়াল ফান্ডগুলো যে ভূমিকা রাখতে পারবে সেই বোধ হয়েছে কর্তা ব্যক্তিদের। তারা সম্প্রতি কয়েকটি সরকারী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় ৫০০ কোটি টাকার একটি মিউচুয়াল ফান্ড গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু এই ৫০০ কোটি টাকা তো চাহিদার তুলনায় অতি নগণ্য। তারপর এর ব্যবস্থাপকরা যদি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ভূল করে অর্থাৎ বুঝেসুঝে শেয়ার খরিদ না করে তবে লোকসান গুনতে হবে; তাতে হিতে বিপরীত হবে। নতুন এই প্রতিষ্ঠানটির সফলতার ওপর অনেক কিছূ নির্ভর করছে। এটি সফল হলে সরকারী-বেসরকারী আরও নতুন নতুন মিউচুয়াল ফান্ড হবে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি বেসরকারী মিউচুয়াল ফান্ডের উদ্যোক্তাদের ইকুইটি অংশের টাকা দিয়ে শেয়ার কেনার অনুমতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু পাবলিক অংশের শেয়ার তো আইপিও ছেড়ে বাজারে বিক্রি করতে হবে। কিন্তু সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা  অনেক কমে গিয়েছে মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর ওপর থেকে। তার প্রতিফলন ঘটছে বাজারে থাকা মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর শেয়ার মূল্যে। বিনিয়োগকারীদের কে  নতুন সব মিউচুয়াল ফান্ডের প্রতি আকৃষ্ট করতে হলে বিদ্যমান মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর ওপর আস্থা ফেরাতে হবে সবার আগে। এর জন্য বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে নীতি-নির্ধারকদের। বিশেষ করে কোজ-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর জন্য সুস্পষ্ট ডিভিডেন্ড নীতি-মালা ঘোষণা করতে হবে। ডিভিডেন্ড নীতি-মালায় বর্তমানে যেসব ফাঁক-ফোকর আছে সেগুলো বন্ধ করতে হবে। কোজ-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডগুলো যাতে বার্ষিক নিট আয়ের কমপক্ষে ৮০ শতাংশ ডিভিডিন্ড প্রদান করে তার নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। সরকারের ঊর্ধŸতন মহলকেই বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

শেয়ারবাজারে বর্তমানে অর্থ সংকট প্রকট। ব্যাংক-আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে জোর করে শেয়ার খরিদে বাধ্য করা যাবে না যতক্ষন না তারা নিজেরা শেয়ার কিনতে আগ্রহী হয়। শেয়ারবাজারের নিয়মিত বিনিয়োগকারী ও মিউচুয়াল ফান্ডগুলোই বিচার বিবেচনা করে এখন শেয়ার খরিদ করছে। কিন্তু তাদের ক্রয় ক্ষমতাও সীমিত। শেয়ারবাজারে বাই প্রেসার-সেল প্রেসারের বিষয়টি সবার জানা আছে। কিন্তু ১১টা থেকে ৩টা অর্থাৎ ৪ ঘন্টার সেল প্রেসার থাকলেও সেই অনুপাতে এত দীর্ঘ সময় Ÿাই প্রেসার ধরে রাখা এদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। সে কারণে দিনের শুরুতে কেনাবেচা স্বাভাবিক থাকলেও শেষ দিকে এসে মূল্য পতন ঘটছে।  এই অবস্থার উত্তরণ ঘটাতে ট্রেডিং আওয়ার ৩ ঘন্টা অর্থাৎ বেলা ১১টা থেকে ২টা পর্যন্ত করা দরকার। অবস্থার উন্নতি হলে এটি আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যাবে। বিষয়টি কর্তৃপক্ষ ভেবে দেখতে পারেন।

No comments:

Post a Comment