Saturday, February 12, 2011

শেয়ার বিনিয়োগকারীরা কার কথা শুনবেন মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর না লোটাস কামালের

শেয়ারবাজার বিশ্লেষণ
বিগত বছরের শেষদিকে দেশের শেয়ারবাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটলে অস্থিরতা শুরু হয়। মূলত এই অস্থিরতা শুরু হয় ২০১০ সালের ৯ ডিসেম্বর থেকে। ওইদিন শেয়ার মূল্যসূচক পাঁচশর অধিক পড়ে গেলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। বাজার ধসের এই প্রবণতা বেশ কয়েকদিন অব্যাহত থাকে। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে শেয়ারবাজার আবার কিছুটা ওঠতে থাকে। কিন্তু এই ওঠা স্বাভাবিক ছিল না। ছিল কারসাজিমূলক। এ সময় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা অধিক মূল্যে শেয়ার ক্রয় করে। পক্ষান্তরে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ বড় বড় বাজার খেলোয়াড়রা এই সুযোগে তাদের হাতে থাকা সমুদয় শেয়ারের সিংহভাগ বিক্রি করে লাভ তুলে নেয়। এরপর নতুন বছরের প্রথম সপ্তাহ থেকেই শেয়ারবাজারে শুরু হয় বড় ধরনের ধস। তারপর মহা কারসাজির খেলা। এ সময় একদিনে মূল্যসূচক ৫ মিনিটে যেমন ৬০০ পয়েন্ট নেমে আসে আবার একদিনেই মূল্যসূচক ১ হাজারের অধিক বৃদ্ধির রেকর্ড সৃষ্টি হয়।

এ সময় বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) ও সরকার মিলে শেয়ারের মূল্যে সার্কিট ব্রেকার কমানোসহ কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিলে বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হয়। এভাবে ওঠা-নামার মধ্যে বাজারে লেনদেন চলছিল। তাছাড়া অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের বক্তব্যে কিছুটা আশ্বস্ত হয়েছিল সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। এতে করে দরপতনের ধারার বিপরীতে বাজার ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

কিন্তু দেখা গেল, সাধারণ শেয়ার বিনিয়োগকারীরা সরকারি মহলের কথায় আশ্বস্ত হয়ে শেয়ার খরিদ করলেও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা তাদের হাতে থাকা শেয়ারসহ কায়েন্টদের শেয়ার বিক্রি করা শুরু করলে পুনরায় দরপতন ঘটতে থাকে। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা এ অবস্থায় রাস্তায় নেমে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে।
বাজারের এই অবস্থায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে বলেন, শেয়ারবাজারে ওঠা-নামা একটি স্বাভাবিক ঘটনা। তবে কেউ যদি কারসাজি করে শেয়ারবাজারের মূল্য ওঠা-নামা ঘটায় তার জন্য তাদের শাস্তি পেতে হবে। তিনি এ অবস্থায় শেয়ার বিনিয়োগকারীদের ধৈর্য ধরার পরামর্শ দেন এবং  আরও বলেন, ভালো শেয়ার ধরে রাখলে তাদের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে না। অর্থমন্ত্রীও এই সময় সংসদে প্রায় একই ধরনের কথা বলেন। বিনিয়োগকারীরা আশায় বুক বাঁধতে থাকে। কিন্তু মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে অর্থ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান আহম মুস্তাফা কামালের দেয়া বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় পরদিন দুই স্টক এক্সচেঞ্জেই মূল্যসূচক কমে যায়। এরপর থেকে পতনের ধারা অব্যাহত আছে। তিনি বলেছিলেন, ডিএসইর মূল্যসূচক ৩৫০০-৪০০০ হওয়া উচিত। কিন্তু সত্যিই কি তাই?

২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের মূল্যসূচক ছিল ৩ হাজার পয়েন্টের কাছাকাছি। গ্রামীণফোনের শেয়ার ছাড়ার পর মূল্যসূচকে যুক্ত হয় ৭০০-এর অধিক পয়েন্ট। এর সঙ্গে প্রায় ৫০টি নতুন ইস্যু, ২৬টি মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ক্যাপিটাল, কোম্পানিগুলোর দেয়া বোনাস ও রাইটশেয়ার বিগত দুই বছরে বাজার মূলধনে যুক্ত হয়েছে। এই বিবেচনায় ডিএসইর সাধারণ মূল্যসূচক স্বাভাবিকভাবে সাড়ে ৫ হাজারের কম হওয়ার কথা নয়। এছাড়া শেয়ারবাজারের পরিধি বিগত দুই বছরে ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছে। অবকাঠামো তৈরি হয়েছে লক্ষণীয়ভাবে। বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ৩৩ লাখ ছাড়িয়ে গেছে, যার মধ্যে প্রায় অর্ধেক সেকেন্ডারি মার্কেটে বিনিয়োগ করছে। আর একটি বিষয় এখানে দাবি রাখে, ১৯৯৬ সালে শেয়ারবাজারে সমুদয় শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছিল। এবার তা হয়নি। দেখা গেছে, অনেক ভালো শেয়ারের দাম ২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসের তুলনায় বাড়েনি বরং কিছুটা কমেছে। বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে এই শেয়ারগুলোর দাম যথেষ্ট বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই বিবেচনায় ডিএসইর মূল্যসূচক ৬০০০-৬৫০০ অস্বাভাবিক নয়।

কিন্তু লোটাস কামাল সাহেব এ কথা বললেন কেন?
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সিএমসি কামাল টেক্সটাইলের স্পন্সর পরিচালকদের কাছে বর্তমানে কোম্পানির স্বল্পসংখ্যক শেয়ার বিদ্যমান রয়েছে। আজ থেকে বছরখানেক আগে এই কোম্পানির শেয়ারের দাম ৬০-৭০ টাকা ছিল। বুল কার্টেলের মাধ্যমে ওই শেয়ারের দাম প্রায় ৩ হাজার টাকা উঠিয়ে তাদের পরিবারের হাতে থাকা প্রায় সব শেয়ার তারা বিক্রি করে দিয়েছে। এখন শেয়ারগুলো ফেরত আনা দরকার। কিন্তু বিক্রিত দামে নিশ্চয় নয়, এ দাম কমাতে হবে। এজন্য বাজারকে প্রভাবিত করতে হবে আতঙ্ক সৃষ্টির মাধ্যমে। এই আতঙ্ক সৃষ্টির জন্যই তিনি মূল্যসূচক সাড়ে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার হওয়ার কথা বলেছেন। তাছাড়া সাপ্রতিক সময়ে শেয়ার কারসাজির সঙ্গে তার জড়িত থাকার কথা মিডিয়ায় আলোচিত হয়েছে। এছাড়া তিনি কোম্পানির রাইটশেয়ার ইস্যুর পারমিশন বা অনুমোদন নিয়েছেন এসইসি থেকে। সাধারণত কোম্পানিগুলোর বিএমআরই করার জন্যই রাইট ইস্যুর অনুমোদন দেয়া হয়। সেখানে কোম্পানির আর্থিক অবস্থা বিবেচনা ও পর্যালোচনা করা হয়। অথচ দেখা যায়, ওই সিএমসি কামাল টেক্সটাইলের প্রতিটি শেয়ারের নেট এসেট ভ্যাল্যু ৯ দশমিক ৫৯ টাকা আর ইপিএস দশমিক ৯১ টাকা মাত্র। এই অবস্থায় সাড়ে ৭ শতাংশ প্রিমিয়ামে অর্থাৎ সাড়ে ১৭ টাকা মূল্যে ১:২ রাইট ছাড়ার অনুমোদন পেয়েছেন তিনি। তিনি এটা কীভাবে পেলেন বা এসইসিও কীভাবে তার অনুমোদন দিল তা তদন্তের দাবি রাখে।

উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালের শেয়ারবাজার পরিস্থিতির সুযোগে অনেক কোম্পানি এরূপ রাইটশেয়ার ছেড়ে বিপুল অঙ্কের অর্থবাজার থেকে সংগ্রহ করে। কিন্তু এগুলোর কী পরিণতি হয়েছিল তা প্রায় সবাই অবগত আছেন। এসময় তৃপ্তি ইন্ডাট্রিজ লিমিটেড অস্বাভাবিকভাবে শেয়ার মূল্য বাড়িয়ে একশ’ টাকা ফেস ভ্যালুর শেয়ার ১৩০ টাকা প্রিমিয়াম নিয়ে ২৩০ টাকায় শেয়ারহোল্ডারদের কাছে বিক্রি করে। পরবর্তিতে ওই শেয়ারের দাম ২৫-৩০ টাকায় নেমে আসলে শেয়ারহোল্ডাররা সর্বস্বান্ত হয়।

এমতাবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, শেয়ার বিনিয়োগকারীরা কার কথা শুনবে? মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর না লোটাস কামালের। বাস্তবতার নিরিখে বলা যায়, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কথাই যথার্থ। তবে ভবিষ্যতে এরূপ নেতিবাচক বক্তব্য জনসমক্ষে যাতে তিনি না দেন তার ব্যবস্থা গ্রহণ আবশ্যক।

No comments:

Post a Comment