পুঁজিবাজারে স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনতে দফায় দফায় বৈঠক করেন নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো। এতে অংশ নেন বাংলাদেশ ব্যাংক, এসইসি, মার্চেন্ট ব্যাংকারস অ্যাসোসিয়েশন, সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি, পুঁজিবাজার সমন্বয় কমিটি ও ডিএসই’র ৩০ ব্রোকার হাউজের কর্মকর্তারা। বৈঠকগুলোতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু সুপারিশ প্রস্তাব আকারে পেশ করেন। এর মধ্যে কমপক্ষে ৬টির অধিক সিদ্ধান্ত নেন এবং তা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেন।
সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে তারল্য সংকট উত্তরণে মিউচুয়াল ফান্ডের নীতিমালার পরিবর্তন, সিঙ্গেল পার্টি এক্সপোজারের ঋণসীমা বৃদ্ধি, একক গ্রাহক ঋণসীমা সমন্বয়ের সময়সীমা বৃদ্ধি, বাংলাদেশ ফান্ডের তহবিল সংগ্রহের ঘোষণা, শেয়ার বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা, মিউচুয়াল ফান্ডের বিনিয়োগ সীমা স্থগিত, আইসিবি ৮ মিউচুয়াল ফান্ডের মেয়াদ বৃদ্ধি, আইপিডিসি’র মূলধন বৃদ্ধি ও বিনিয়োগকারীদের ১৫দফা দাবিসহ আরও বেশকিছু সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এতে কয়েক দিন বাজার ঊর্ধ্বমুখী হলেও আবারও পতনের দিকে ধাবিত হতে থাকে পুঁজিাবাজার। ফলে বাজারের প্রতি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা দিন দিন প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণও কমে যাচ্ছে।
এখনই এ সঙ্কট দূর করতে না পারলে অন্ধকার ঘনীভূত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, বর্তমান পুঁজিবাজারের অবস্থা এমন পর্যায়ে চলে এসেছে, যা সারাদেশে এটি এখন প্রধান আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। এর ফলে সামাজিক অস্থিরতা বাড়তে পারে বলে শংকা প্রকাশ করছেন তারা। ইতিমধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোও এটিকে ইস্যু হিসাবে ব্যবহার করতে শুরু করেছে।
দীর্ঘ দশ মাস ধরে পুঁজিবাজারের দর পতনকে কেন্দ্র করে বিষটি এখন রাজধানী কিংবা বিভাগীয় শহরগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। প্রত্যন্ত অঞ্চলেও বিষয়টি ছড়িয়ে পড়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যারা শেয়ার মার্কেট বোঝেন না কিংবা মার্কেটে তাদের কোন ধরনের বিনিয়োগ নেই তারাদেরও বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছে। আর এ কারণেই বিষয়টি সামাজিক অস্থিরতার দিকে যাচ্ছে। ইতিমধ্যেই পুঁজি হারিয়ে আত্মহত্যা করেছেন একাধিক বিনিয়োগকারী। খুলনায় দেড় কোটি টাকার পুঁজি হারিয়ে স্টক করে মারা গেছে হাফিজুর রহমান নামের এক বিনিয়োগকারী। বগুড়াতে গোলাম মোস্তফা নামে আর এক বিনিয়োগকারী স্টক করে মারা যায়। অন্যদিকে ইতিমধ্যে পুঁজি হারিয়ে রাস্তায় বসার উপক্রম হয়েছে লাখ লাখ বিনিয়োগকারী। পুঁজি হারিয়ে নিস্ব হয়ে অথবা নিজের পকেটের টাকা দিয়ে হাউজের দায় মিটিয়ে শেয়াার বাজার থেকে বিদায় নিয়েছেন অনেক বিনিয়োগকারী, যা এখন সর্বত্ব আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএসইর এক কর্মকর্তা বর্তমান বাজার সম্পর্কে বলেন, বাজারের এই সংঙ্কটকালে অনেক ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান শেয়ার বিক্রয় করছেন। তিনি বলেন, এই অবস্থায় কেউ শেয়ার বিক্রি করে লাভবান হওয়ার কথা নয়। কিন্তু সামনে বাজার আরো খারাপ হতে পারে এ ধারণা থেকেই তারা এখন শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছেন। আর এর ফলে দর হারাচ্ছে ভালো কোম্পানিগুলো। অন্যদিকে মৌলভিত্তির দিক থেকে দুর্বল কোম্পানিগুলোর মূল্য বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। কারণ কোন প্রতিষ্ঠানের হাতে এসব শেয়ার নেই। তিনি বলেন, এসইসি চাইলে প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণের বিষয়টি তদন্ত করে বাজারে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করতে পারে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রথম সহসভাপতি আহসানুল ইসলাম বলেন, বিনিয়োগকারীরা এই মুহূর্তে বিনিয়োগ করলে লাভবান হতে পারবে কী না তা নিয়ে বড় ধরনের সংশয়ের মধ্যে রয়েছেন। তাই তারা বাজারের ওপর কিছুতেই বিশ্বাস রাখতে পারছেন না। আর এখান থেকেই আস্থার সঙ্কট সৃষ্টি হচ্ছে। তিনি বলেন, এ অবস্থার উত্তরণ করতে হলে নতুন ভালো কোম্পানি বাজারে নিয়ে আসা দরকার।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সভাপতি ফখর উদ্দিন আলী আহমেদ বলেন, আস্থা ও তারল্য সঙ্কটের কারণে শেয়ারবাজারে অব্যাহতভাবে দরপতনের ঘটনা ঘটছে। তার মতে, এই মুহূর্তে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। অন্যথায় পরবর্তীতে ব্যবস্থা নিলে তাতে আর কোনো কাজ হবে না।
বাজারের সামগ্রিক উন্নয়নে সাম্প্রতিক উদ্যোগ:
শেয়ারবাজারে স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনতে দফায় দফায় বৈঠক হয়। বৈঠকে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কিছু সুপারিশের প্রস্তাব করে, যা পর্যায়ক্রমে এসইসি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেয়।
একক গ্রাহক ঋণসীমা সমন্বয়ের সময়সীমা বৃদ্ধি: ১৯শে সেপ্টেম্বর পুঁজিবাজারে বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে বাজার সংশ্লিষ্টদের দাবির পরিপ্রেেিত ব্যাংকগুলোর সিঙ্গেল পার্টি এক্সপোজার লিমিট তথা একক গ্রাহক ঋণসীমা সমন্বয়ের সময়সীমা আরও এক বছর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে একক গ্রাহক ঋণসীমা সমন্বয়ের সীমা হয় ২০১২ সালের ৩১ ডিসেম্বর। এ নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণসীমা সমন্বয়ের সময়সীমা চতুর্থবারের মতো বাড়ালো।
বাংলাদেশ ফান্ড: ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে পুঁজিবাজারে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ের বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে তহবিল সংগ্রহ শুরু করে বাংলাদেশ ফান্ড।
মিউচ্যুয়াল ফান্ডের বিনিয়োগ সীমা স্থগিত: সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানির আবেদনের পরিপ্রেেিত মিউচ্যুয়াল ফান্ডের বিনিয়োগসীমা আপাতত স্থগিত করে এসইসি। এতে মিউচুয়াল ফান্ডের বিধিমালা, ২০০১-এর ৫৬-এর পঞ্চম তফসিলে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের বিধি-নিষেধ সম্পর্কে বলা হয়েছে। এ নীতিমালায় মিউচুয়াল ফান্ড একক কোম্পানির মূলধনের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ এবং একক খাতের শেয়ারে ২৫ শতাংশ শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করতে পারতো। ১৫ই সেপ্টেম্বর থেকে এ বিধি স্থগিত করা হয়।
শেয়ার বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা: পাঁচ শতাংশের বেশি কোনো শেয়ারহোল্ডার উদ্যোক্তা, পরিচালক ও মালিকদের শেয়ার বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে এসইসি। এ সিদ্ধান্তের ফলে পুঁজিবাজারের সার্বিক উন্নয়ন ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে নেয়া হয়।
আইপিডিসি’র মূলধন বৃদ্ধি: ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রমোশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি অব বাংলাদেশ (আইপিডিসি)’র মূলধন ১০০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪০০ কোটি টাকা করার ঘোষণা দেয়া হয়।
আইসিবি আট মিউচুয়াল ফান্ডের মেয়াদ বৃদ্ধি: ৫ই অক্টোবর রাষ্ট্রায়ত্ব বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) ব্যবস্থাপনাধীন ১০ বছর মেয়াদ অতিক্রান্ত নয়টি মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ৮টি মিউচুয়াল ফান্ডের মেয়াদ এক বছর বৃদ্ধি করে এসইসি।
বিনিয়োগকারীদের ১৫দফা দাবি: বাংলাদেশ ব্যাংকের সিঙ্গেল পার্টি এক্সপোজার লিমিট ৩১ ডিসেম্বর ২০১৩ পর্যন্ত বর্ধিত করতে হবে, প্রস্তাবিত ব্যাংক কোম্পানি আইনে ব্যাংকগুলির পরিশোধিত মূলধনের ২৫ শতাংশ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের যে প্রস্তাব করা হয়েছে তা সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহার করে পূর্বের জামানতের ১০ শতাংশের যে বিধান ছিল তা কার্যকর করতে হবে, মিউচুয়াল ফান্ডের মূলধনের ৮০ শতাংশ টাকা বাধ্যতামূলক পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে হবে, বর্তমানে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যে তিন থেকে চার শতাংশ বিনিয়োগ করতে তা ১০ শতাংশে বাধ্য করতে হবে, মার্জিন লোনের সুদ ১ ডিসেম্বর ২০১০ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১১ পর্যন্ত মওকূপ করে বিশেষ প্রণোদনা প্রদান করতে হবে এবং বাজার পতনের সময় মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোকে ‘অ্যাগ্রেসিভ বাই প্রেসার’-এর মাধ্যমে তাদের পূর্ণ পেশাদারিত্বের পরিচয় দিতে হবে।
ভুক্তভোগীর কথা: বিনিয়োগকারী হাসনাইনের আলাপকালে জানা যায়। তিনি বলেন, আমি এক বন্ধুর মাধ্যমে শুনেছিলাম যে, শেয়ারব্যবসায় শুধু টাকা আর টাকা, এমনকি বছরে টাকা দ্বিগুণ, তিনগুণ। সারাদেশের ব্যবসা বাণিজ্যে মন্দার রেশ, তাই লোভে পড়ে হোক আর প্রয়োজনের তাগিদেই হোক, পিতার মৃত্যুর পর পেনশেনেরর টাকা এনে পুরোটাই বিনিয়োগ করি।
তিনি বলেন, গত বছরের জুলাই মাসে তিনি এ ব্যবসায় নামেন, লাভও আসতে থাকে। তাই অতিরিক্ত লাভের আশায় ব্রোকার হাউজ থেকে নিজস্ব মূলধনের পাশাপাশি লোন নিয়ে তিনি এ ব্যবসায়ে পূর্ণ মনোযোগ দেন। মাস দুয়েক যেতে না যেতে তার স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়। ৯৬-এর মতো আরেকটি ভয়াভহ বিপর্যয়ের মুখে পড়ে শেয়ারবাজার।
তিনি জানান, তার ২৫ লাখ টাকার পুঁজি গিয়ে দাঁড়ায় ৫ লাখে। চোখের পলকেই জুয়াড়িদের ফাঁদে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়ে যান। পিতার মৃত্যুর পর তিনি সংসারের হাল ধরেছেন। সংসারে মা ছাড়াও দুই বোন রয়েছে। তাদের এখনো বিয়ে দেয়া হয়নি। শেয়ারবাজারের ৩৩ লাখ বিনিয়োগকারীর ভিড়ে এরকম হাজারো হাসনাইনরা সর্বস্বান্ত হয়ে বসে আছে।
এতো সব সিদ্ধান্তের পরও পুঁজিবাজারে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি। সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমান বর্তমান বাজার মূল্যে বেক্সিমকো ৫ লাখ শেয়ার কেনার ঘোষণার পর বাজারে কিছুটা চাঙ্গাভাব দেখা দিলে কার্যত তা আবারো দরপতনের প্রবণতায় চলছেই।
বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা, অভিহিত মূল্য ১০ টাকা করায় ুদ্র বিনিয়োগকারীদের প্রচ্ছন্নভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে। ১০ টাকা অভিহিত মূল্য করার কয়েকদিন বাজারে সূচক ঊর্ধ্বমুখী ধারায় ফিরলেও তা আবারো দরপতনের ধারায় চলে আসে। এতে ুদ্র বিনিয়োগকারীদের বাজারে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হয়েছে যা কোনো উন্নয়নশীল দেশের জন্য উদ্বেগের কারণ।