বিশ্ব অর্থনৈতিক সঙ্কটের একটি অন্যতম কারণ হলো ঝুঁকি ভাগাভাগির অনুপস্থিতি যা বাজার শৃঙ্খলাকে ভঙ্গুর করে দেয় এবং অতিমাত্রায় ধার-দেনা, উচ্চ লিভারেজ সুবিধা, ফটকাবাজি ও অস্থিতিশীল বাজার মূল্যের দিকে ধাবিত করে। প্রকৃত পণ্য ক্রয়ের জন্য পর্যাপ্ত আস্থা এবং ঝুঁকি ভাগাভাগি বাজার ব্যবস্থাপনায় বড় ধরণের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারে এবং আর্থিক অস্থিতিশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে পারে ; ইসলামী অর্থায়ন এটিই প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ইসলামী অর্থনীতির স্বাভাবিক কার্যপদ্ধতি রয়েছে যা বিশ্ব অর্থব্যবস্থাকে স্বাভাবিক গতিতে পরিচালনায় সম করে তোলে এবং পদ্ধতিগত ধ্বস থেকে রা করে। আন্তর্জাতিক অর্থবাজারে ইসলামী আর্থিক নীতিমালা মানা হলে বর্তমান বিশ্ব অর্থনৈতিক সঙ্কট সৃষ্টি হতোনা। সর্বোচ্চ উতপাদন নিশ্চিত করার জন্য সম্পদ বন্টনে ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থার নিজস্ব প্রণোদনা রয়েছে। আধুনিক সমাজের জটিল আর্থিক সমস্যা সমাধানের জন্য ইসলামী অর্থনীতি ও সামাজিক নীতিমালার গবেষণা ও উন্নয়ন প্রয়োজন। স্বল্পকালীন তারল্য ব্যবস্থাপনা পণ্যের স্বল্পতার কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এখনো ইসলামিক ব্যাংকিং ও ফিন্যান্স অদম্য চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। দণি পূর্ব এশিয়ার ওআইসির সদস্য দেশসমূহের মধ্যে যোগাযোগ ও আলোচনা আরো অধিক হারে বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। ইসলামী ব্যাংকিং-এর মুদারাবা ও মুশারাকা পদ্ধতির সাহায্যে উদ্যোক্তা উন্নয়নের একটি আদর্শ পরিবেশ সৃষ্টি করা যেতে পারে। ইসলামী ব্যাংকগুলো দ্বি-স্তর বিশিষ্ট মুদারাবা পদ্ধতি ও সম্পদ বন্টনের মাধ্যমে গ্রাহক বঞ্চনার সমস্যাটি সমাধান করতে পারে। আশা করা যায়, ২০২৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং মূলধারার ব্যাংকিং-এ পরিণত হবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার, ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক এবং মুসলিম দুনিয়ার প্রচেষ্টা প্রশংসনীয়।
“বিশ্ব অর্থনৈতিক সঙ্কট এবং ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থার শক্তি” শীর্ষক দুইদিন ব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এ পর্যবেণ করা হয়। ইসলামিক ব্যাংকস কনসালটেটিভ ফোরাম (আইবিসিএফ) সম্প্রতি ঢাকায় এ সেমিনারের আয়োজন করে। আইডিবি প্রেসিডেন্ট ড. আহমাদ মোহাম্মদ আলী এ সেমিনার উদ্বোধন করেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
সেমিনারের দ্বিতীয় দিনে পাঁচটি কর্ম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন- তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এ বি মীর্জ্জা মোঃ আজিজুল ইসলাম, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশ-এর সভাপতি মাহবুবুর রহমান, সাবেক উপদেষ্টা আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী, ওআইসি’র সাবেক এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারী জেনারেল মোহাম্মদ মহসিন এবং সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলী খান। সেমিনারে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অর্থনীতিবিদ ড. এম উমর চাপড়ার ‘বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকট : ইসলামী ফাইন্যান্সের আলোকে বৈশ্বিক আর্থিক স্থাপত্যগত সংস্কারের জন্য কতিপয় পরামর্শ’, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ অরলিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. কবীর হাসানের ‘বৈশ্বিক অর্থনেতিক সংকট ও ইসলামী আর্থিক সমাধান’, সংযুক্ত আরব আমিরাতের এইচএসবিসি, আমানাহ কমার্শিয়াল ব্যাংকের গ্লোবাল হেড ইয়াকুব বৌবাতের ‘বৈশ্বিক আর্থিক সংকট এবং জরুরী ইসলামী আর্থিক প্রবণতা’, বাংলাদেশের বিশিষ্ট ইসলামী ব্যাংকিং কনসালটেন্ট এম আযীযুল হকের ‘বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং-এর অবস্থান এবং একুশ শতকের এজেন্ডা’ এবং মালয়েশিয়ার ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর এডুকেশন এন্ড ফাইন্যান্স-এর প্রফেসর ড. যুবায়ের হাসানের ‘আত্ম স্বার্থের ঘাটতি এবং ইসলামী দৃষ্টিকোন থেকে এর বৃদ্ধি’ শীর্ষক পাঁচটি প্রবন্ধ উপস্থাপিত হয়। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষক ও অর্থনীতিবিদগণ এসব প্রবন্ধের উপর আলোচনা করেন। এসব আলোচনা উপস্থাপনা, পরামর্শ ও পর্যবেণের ভিত্তিতে সেমিনারে কতিপয় সুপারিশ গ্রহণ করা হয়।
সেমিনারে সুপারিশ গ্রহণ করা হয়, প্রচলিত অর্থব্যবস্থার মোকাবেলায় সর্বজনগ্রাহ্য ইসলামী অর্থব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে সমন্বিত অধ্যয়ন ও গবেষণা করতে হবে। ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে টেকসই করে গড়ে তোলার জন্য পরিচালনার অভিন্ন নীতিমালা ও বিধান প্রণয়ন করতে হবে। সৃজনশীল ও শরী‘আহ অনুমোদিত নতুন নতুন প্রোডাক্ট উদ্ভাবনের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকিং ইন্ডাস্ট্রির আরো উন্নতি ও প্রসার করতে হবে। অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, বৃহত্তর সমন্বয় এবং ক্রস বর্ডার আর্থিক প্রবাহ সুবিধার জন্য সকল ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যোগাগোগ বৃদ্ধি
করতে হবে এবং ইসলামী ব্যাংকিং বিষয়ক তদারকির জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি আলাদা ডিভিশন গঠন করতে হবে।
ইসলামী ব্যাংকিং-এর শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত করার জন্য বিশ্বব্যাপী ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে নিয়মিত প্রযুক্তি, ধারণা ও অভিজ্ঞতার বিনিময় করতে হবে। বিভিন্ন নীতিমালা, পণ্য, নিয়মকানুন ও সুপারিশ প্রণয়ন ও বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে তা বাস্তবায়নের জন্য একটি ফোকাস গ্রুপ গড়ে তুলতে হবে। পাশ্চাত্য বিশ্বে ইসলামী ব্যাংকিং-এর ধারণা বাস্তবায়ন করতে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শক্তিশালী জোট গড়ে তুলতে হবে।
সেমিনারে আরো সুপারিশ করা হয়, শরী‘আহ ভিত্তিক ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের তারল্য সংকট বা অতিরিক্ত তারল্য যথাযথ ব্যবস্থাপনার জন্য ইসলামী মানি মার্কেট গড়ে তুলতে হবে। ইসলামী ক্যাপিটাল মার্কেটের অবকাঠামো গড়ে তোলার জন্য সরকার ও রেগুলেটররা ইসলামী ব্যক্তিত্বদের সহযোগিতা গ্রহণ করতে পারেন। ইসলামী ব্যাংকগুলো, রেগুলেটর ও সরকারের যৌথ উদ্যোগে ইসলামী ব্যাংকারদের সমন্বয়ে একটি রিসোর্স পুল গড়ে তুলতে হবে। সম্পদ ভিত্তিক অর্থায়ন বৃদ্ধি করতে যেসব প্রচলিত ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকিং-এ রূপান্তরিত হতে চায় তাদেরকে সাহস ও সুবিধা প্রদান করতে হবে। নীতি নির্ধারনী মহলে ইসলামী ব্যাংকিং বিষয়ক ধারণার স্বল্পতা দূর করতে রেগুলেটরদের সাথে বৈঠক করার জন্য আইবিসিএফ-এর উচিত দ্রুত উদ্যোগ গ্রহণ করা। ইসলামী অর্থায়ন শিল্প আরো বিকাশে সম্পদ ভিত্তিক ও ঝুঁকি বন্টনমুলক পণ্য চালু করা প্রয়োজন। ওয়াক্ফ ফান্ডের অর্থ সুদমুক্ত বিনিয়োগ প্রদানে ব্যবহার করতে হবে এবং ক্যাশ ওয়াক্ফ পদ্ধতিকে জনপ্রিয় করে তুলতে হবে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ কোম্পানীসমূহে যাকাতকে কর অনুমোদনযোগ্য ব্যয় ধরতে হবে। স্বল্প সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষের কাছে সম্পদ পৌঁছানোর মাধ্যমে বন্টনমূলক সুবিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইসলামী ব্যাংকগুলোকে ক্ষুদ্র অর্থায়নে আরো সম্পদ বন্টন করতে হবে। ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে তাদের লাভ-লোকশান অংশীদারিত্বমূলক পণ্য আরো বৃদ্ধি করতে হবে। মুনাফা বৃদ্ধি প্রাধান্য না দিয়ে সামাজিক মূল্যবোধকে প্রাধান্য দান করে ব্যাংকিং করতে হবে। ঋণের প্রয়োজনকে বাস্তব ভিত্তিক খাতের ভিত্তিতে প্রাধান্য দিতে হবে যাতে ঋণের সম্প্রসারণ বাস্তব অর্থনীতির সম্প্রসারণের পদপে হয় এবং ফটকাবাজি ও জুয়া প্রতিষ্ঠায় সহায়ক না হয়। ডেরিভেটিভ মার্কেটকে যথাযথ মনিটরিং করতে হবে যাতে তা শুধুমাত্র রাকবচ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে এবং জুয়ার উপাদান উতপাটনে সহায়ক হয়।
সেমিনার মুসলিম বিশ্বের রাষ্ট্র প্রধানদেরকে অর্থনীতির সকল ক্ষেত্রে প্রচলিত ব্যাংকিং-এর তুলনায় শ্রেষ্ঠ ব্যবস্থা হিসেবে ইসলামী অর্থনীতির নিয়ম-কানুন প্রতিষ্ঠা করার জন্য সুপারিশ করছে। সকল লেনদেনে শুধুমাত্র মুনাফা বৃদ্ধির চেয়ে সামাজিক কল্যাণকে প্রাধান্য দিতে হবে। ইসলামী অর্থনীতিকে প্রচলিত অর্থনীতির মোকাবেলায় শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করতে হবে এবং এর সার্বিক ধারনাকে বাস্তবায়ন করার জন্য মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধানদের প্রতি সুপারিশ করা হয় এবং ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থাকে একটি বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য ইসলামী ব্যাংকসমূহকে গবেষণায় বেশি বেশি অর্থ ব্যয় করার আহ্বান জানানো হয়।
ইসলামী ক্যাপিটাল মার্কেট গড়ে তুলতে ইসলামী দেশগুলোর সরকারকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। ইসলামী ব্যাংকগুলোকে নতুন নতুন পণ্য আবিষ্কারের মাধ্যমে গ্রাহকের চাহিদা পূরণ করতে হবে। মুসলিম স্কলারদেরকে বিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা ও অর্থনীতিতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের প্রতি মনোযোগ দিতে হবে। ইসলামীক আর্থিক ব্যবস্থার শক্তি বৃদ্ধির জন্য জনগণের অর্থনৈতিক ধারণা বৃদ্ধি করতে হবে। অর্থায়নের জটিল সমস্যা সমাধানে ও ইসলামী অর্থায়নের আলোকে সমাধান প্রদান করতে মেধাবীদের উন্নয়নকে প্রাধান্য দিতে হবে। সেমিনার বিশ্বাস করে যে নিয়মিত ও ধারাবাহিক ইসলমী ফিন্যান্স-এর উপর নেতৃত্ব সৃষ্টির প্রশিণ-এর আয়োজন, বাস্তবায়ন ও উন্নয়ন অতি জরুরী।
No comments:
Post a Comment