Thursday, February 17, 2011

এবারে শেয়ারবাজার ম্যানুপুলেশনের হাতিয়ার ছিল ‘পিই’

পিই অর্থাৎ প্রাইস আর্নিং রেশিও। সহজ বাংলা ভাষায় কোম্পানির আয় ও চলতি বাজার মূল্যের অনুপাত। উচ্চতর হিসাব বিজ্ঞান কিংবা ফাইন্যান্স পড়ার সময় ছাত্র-ছাত্রীরা রেশিও এনালাইসিস করে। ১৪-১৫ রকমের রেশিও বিদ্যমান রয়েছে এই বিষয়ের ওপর। যার প্রত্যেকটিই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে একজন বিনিয়োগকারী যখন পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেয় তখন আরও অনেক বিষয়ের সাথে এই রেশিওগুলোর এনালাইসিস করতে হয়। বিনিয়োগ বাজারে অনেকগুলো ফ্যাক্টর বা উপাদান কাজ করে। বিশেষ করে মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে। কিন্তু আমাদের শেয়ারবাজারের কর্তা ব্যক্তিরা যেন এই একটি বিষয়কেই ধন্বন্তরী ওষুধ বলে মনে করে থাকেন। 
স্টক এক্সচেঞ্জের নেতা, এসইসির কর্মকর্তা বা অনেক নামকরা সিকিউরিটিজ হাউজের পরিচালকরা মিডিয়ায় আলোচনাকালে এই ‘পিই‘কেই প্রাধান্য দিয়ে আসছে। শেয়ারবাজারে ‘বুলিশ’ অবস্থা সৃষ্টির জন্য এরা ’পিই‘কে তারা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। কোম্পানির ‘পিই’ থেকে শুরু করে শেয়ারবাজারের সামগ্রিক ’পিই’কেও তারা বার বার এর মধ্যে টেনে এনেছে। এমনকি মার্চেন্ট ব্যাংকের ঋণ সুবিধা প্রদানের ভিত্তি হিসেবে ’পিই’কে ফ্যাক্টর বিবেচনার নির্দেশ দিয়েছে। বিষয়টি যে যথার্থ নয়, আজকের শেয়ার বাজার তার জ্বলন্ত প্রমান। কিন্তু কেন?

ধরে নেয়া যাক X কোম্পানির শেয়ারের বাজার মূল্য ৫০০ টাকা। ওই কোম্পানির আর্নিং পার শেয়ার অর্থাৎ ইপিএস ২৫ টাকা। তাহলে কোম্পানির পিই দাঁড়াচ্ছে ২০, যাকে মোটামুটি ভাল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। আবার Y কোম্পানির শেয়ারের বাজার মূল্য ২০০ টাকা। কোম্পানিটি বন্ধ থাকায় বা প্রতিকূল অবস্থার কারণে লাভ করতে না পারলে পিই হবে ২০০ বা ক্ষেত্র বিশেষে নেগেটিভ। একটি ধারণা প্রচলিত আছে যে, X কোম্পানিতে বিনিয়োগ করলে ২০ বছরে এবং Y কোম্পানিতে বিনিয়োগ করলে পুঁজি ফেরত আসতে ২০০ বছর সময় লাগবে। এটি স্রেফ একটি থাম্ব রুল মাত্র। কিছু কিছু জাতীয় দৈনিকের সাংবাদিক নির্বিকার ভাবে একথা লিখে দেয়। কিন্তু ধরুন, X কোম্পানি পরবর্তি বছর প্রতিকূল অবস্থার কারণে কোন আয় করতে পারল না, সেকারণে শেয়ারহোল্ডারদের ডিভিডেন্ড দিল না, এর পিই হয়ে গেল নেগেটিভ। আবার Y কোম্পানি প্রতিকূল অবস্থা কাটিয়ে ভাল ব্যবসা করে ইপিএস ১০ টাকায় উন্নীত করল। এক্ষেত্রে ওই কোম্পানির পিই হলো ২০। অর্থাৎ প্রথম কোম্পানিটি রাতারাতি খারাপ হয়ে গেল আর দ্বিতীয় কোম্পানিটি খুব ভাল হয়ে গেল? 

মোডিগিলানি এন্ড মিলার এর তত্ত্ব কিন্তু সে কথা বলে না। অথচ আমাদের শেয়ারবাজারের কর্তা ব্যক্তিরা কিন্তু ওই একটি বিষয়কেই নিয়ামক হিসেবে ধরে নিয়ে প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছে। সাধারণ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরাও বিষয়টি মেনে নিয়ে তাদের বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এক্ষেত্রে তাদের দোষ কোথায়? সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) অবশ্য গা বাঁচাতে কোথাও কোথাও ‘পিই‘র সঙ্গে অন্য বিষয় বিবেচনার কথা বললেও তার আওয়াজ ছিল ক্ষীণ, যা সাধারণ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের কান পর্যন্ত পৌছায়নি। মূল বিবেচ্য বিষয় হওয়া উচিত ছিল ওই শেয়ারের Intrinsic value বা অন্তর্নিহিত মূল্য কত তার হিসেব করা। এক্ষেত্রে কোম্পানির নেট এসেট ভ্যালু কত সেই বিষয়টি বিনিয়োগ সিদ্ধান্তের সময় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা উচিত, যা অন্তর্নিহিত মূল্য নির্দ্ধারণে প্রধান সহায়ক।
 
উল্লেখ্য, নেট এসেট ভ্যালু হলো একটি কোম্পানির শেয়ারের প্রকৃত মূল্য অর্থাৎ ওই কোম্পানির সম্পদ ও দায় এর পার্থক্য। এই সম্পদ মূল্য শেয়ারের অভিহিত মূল্যের অনুপাতে দেখানো হয়। সম্পদের থেকে দায় বেশি হলে নেট এসেট ভ্যালু নেগেটিভ অঙ্কের হবে। আবার সম্পদের থেকে দায় কম হলে ওই শেয়ারের নেট এসেট ভ্যালু পজিটিভ হবে। 
 
সাধারণত: বিশেষজ্ঞদের মতামত হলো, অন্তর্নিহিত মূল্য বিবেচনায় নিয়ে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেয়া দরকার। অন্তর্নিহিত মূল্যের চেয়ে বাজার দাম কম হলে ক্রয় সিদ্ধান্ত এবং এর বেশি হয়ে গেলে বিক্রয় সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। শেয়ারের বাজার মূল্য কোম্পানির নেট এসেট ভ্যালূর তিনগুণ অতিক্রম করলে তা সাধারণত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়। অবশ্য এর ব্যতিক্রমও রয়েছে। তবে সেক্ষেত্রে ওই কোম্পানির ইতিবৃত্ত যেমন, কোম্পানিটি কি ধরণের পণ্য উৎপাদন বা সেবা প্রদান করে, কতদিন যাবৎ ব্যবসা করছে, সুনাম কতখানি এবং
Sustainable growth possibility কেমন সেই বিবেচনায় অন্তর্নিহিত মূল্য আরও কিছুটা বাড়তে পারে। কিন্তু তা কখনই লাগাম ছাড়া হবে না। কিন্তু আমাদের শেয়ার বাজারে বিপরীত ঘটনা ঘটেছে যার ফলে অনেক শেয়ার অতিমূল্যায়িত হয়েছে। পিই’কে একমাত্র বিবেচ্য বিষয় হিসেবে মেনে নেয়া যায়, যদি কিনা বিগত পাঁচ বছরের গড় পিই’কে বিবেচনায় নেয়া হয়। কিন্তু তা হয়নি। এই সুযোগ নিয়েছে বাজার সিন্ডিকেট। এরা অনেক ক্ষেত্রে অলাভজনক কোম্পানির মালিকদের সহায়তায় প্রকৃত হিসাব বিবরণী ওলোট-পালট করে লাভ দেখিয়েছে। আবার এই সিন্ডিকেটই লভ্যাংশের অর্থ যোগান দিয়ে কৃত্রিমভাবে বাজার মূল্যও বাড়িয়েছে, এমন খবরও পত্র-প্রত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এসইসি বিষয়টি দেখেও না দেখার ভান করেছে। শেয়ারবাজারকে সুষ্ঠ ও স্বাভাবিকভাবে চলতে দেয়ার নিয়ত ছিল না অনেকেরই। তাই শেয়ারবাজারের আজকের পরিণতি অনিচ্ছা সত্তেও আমাদের মেনে নিতে হচ্ছে। এর অবসান করতে হবে, তা যেকরেই হোকনা কেন।

No comments:

Post a Comment