Saturday, February 26, 2011

শেয়ারবাজার স্থিতিশীল হচ্ছে না কেন?

দিন কয়েক আগে অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, আগামী সপ্তাহে শেয়ারবাজার স্থিতিশীল হবে। সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও বাজার স্থিতিশীল হয়নি। এর কারণ অর্থমন্ত্রী এবং সরকারের উচ্চমহল শেয়ারবাজারের স্থিতিশীলতা চাইলেও বাজার খেলোয়াড়রা এটি চাইছে না। আর এ খেলোয়াড় বা কথিত সিন্ডিকেট চক্র আজও শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। এদের ক্ষমতা অনেক বেশি, যার কাছে সরকারের ইচ্ছা-অনিচ্ছা কোনরূপ মূল্যবহন করে না।
বলা হচ্ছে, শেয়ারবাজারে তারল্য সংকট রয়েছে। আরও বলা হচ্ছে, বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট বিরাজ করছে। মোটা দাগে দেখলে এটিই প্রতীয়মান হবে। কিন্তু গভীরভাবে যারা বাজার পর্যবেক্ষণ করেন তারা নিশ্চয়ই এর সঙ্গে একমত হবেন না। যারা তারল্য সংকটের কথা বলছেন, তারা আঙ্গুল তুলছেন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী এবং মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর দিকে। যারা শেয়ারবাজার সম্বন্ধে অভিজ্ঞ তারা জানেন, বাজারে একবার ধস নামলে এসব প্রতিষ্ঠান প্রথমেই হাত গুটিয়ে ফেলে। এর আগে উচ্চবাজার পরিস্থিতির সুযোগে তারা নিজেদের কাছে থাকা শেয়ার বিক্রি করে লাভ তুলে নিয়েছে। এখন দেখছে বাজার কতদুর পড়ে। কেবল দেখছে তাই নয়, তারা নিজেরাও সচেষ্ট রয়েছে বাজার যাতে আরও অস্থিতিশীল হয় তার জন্য। কারণ এরা জানেÑ পানি যত ঘোলা হবে, মাছ শিকারের সুবিধাটুকু তারাই পাবে।

এবার শেয়ারবাজারের এ চক্রের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ব্যাংক, ইনস্যুরেন্স ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন  কোম্পানির মালিক-পরিচালকরা। শেয়ারের উচ্চবাজার মূল্যের সুযোগে এরা নিয়মবহির্ভূত নিজেদের শেয়ারের সিংহভাগ অনেক বেশি দামে বিক্রি করে দিয়েছে। বড় বড় কোম্পানির স্পন্সর পরিচালকদের কাছে থাকা শেয়ারের বিবরণী পর্যালোচনা করলে তা সহজেই বোঝা যাবে। মূলত এরাই চাইছে শেয়ারের দাম আরও কমাতে। সরকারের উচ্চ মহলের সঙ্গে এরা সম্পর্কিত। তাই শেয়ারবাজারের এ উথাল-পাথাল অবস্থার পরেও এদের গায়ে আগুনের এতটুকু উত্তাপ লাগছে না।

শেয়ারবাজার স্থিতিশীল করতে সরকার যথাসাধ্য পদক্ষেপ নিয়েছে। আইসিবিসহ সরকারি ব্যাংকগুলো টাকা দিয়েছে বাজার পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটাতে। তাছাড়া প্রস্তাবিত অনেক মিউচুয়াল ফান্ডের ইক্যুইটি অংশের টাকা দিয়ে শেয়ার কেনার অনুমতিও দেয়া হয়েছে। কিন্তু তাতে বিশেষ ফল দিচ্ছে না। বলা হচ্ছে, চাহিদার তুলনায় এ অর্থের পরিমাণ খুবই নগণ্য। সত্যিই কি তাই? সরকার তো এজন্য তার ভা-ার উন্মুক্ত করে দিতে পারে না। এসব প্রতিষ্ঠানের ফান্ড ম্যানেজারদের দায়িত্ব হলো, সীমিত সম্পদ দিয়ে বাজার পরিস্থিতি সামাল দেয়া। কিন্তু তারা পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চাইতে বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করছে বেশি। এ পরিস্থিতিতে এদের কাজ হওয়া উচিত ঠেকা দিয়ে বাজার স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করা। অথচ এরাও আচরণ করছে একজন সাধারণ বিনিয়োগকারীর মতো। গত সপ্তাহে শেয়ার মূল্যসূচক ৫ হাজার ৫০০-এর কাছাকাছি চলে যাওয়ার পর সরকার জরুরিভিত্তিতে অর্থের জোগান দিয়ে আরও মূল্য পতন ঠেকাতে চেয়েছিল। বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রচার পাওয়ায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও কিছুটা আশ্বস্ত হয়ে পুনরায় বাজারমুখী হয়। এর ফলে একদিনে বাজারের মূল্য সূচক সাড়ে চারশ’র অধিক বেড়েছিল। পরদিন ট্রেডিংয়ের শুরুতে আবার যখন মূল্যবৃদ্ধির একই প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছিল, তখন বাজার আরও বাড়তে দেয়া কোন মতেই উচিত হয়নি। শেয়ার কেনার মতো যথেষ্ট অর্থ এখনো সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে। তারা তো চাইবেই-বাজারে চাহিদা সৃষ্টির মাধ্যমে দাম কিছুটা বাড়াতে। কিন্তু সরকারের এসব প্রতিষ্ঠানের তো সেই পথে চলা উচিত নয়। এ মুহূর্তে তাদের কাজ হওয়া উচিত, বাজারকে আরও বাড়তে না দিয়ে একটা জায়াগায় নিয়ে স্থিতিশীল করা। কারণ বাজার স্থিতিশীল হলেই কেবল সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে আসবে। অযথা বাজার বাড়লে স্বাভাবিক নিয়মেই বাজার আবার পড়ে যাবে এটি তো বোঝা যাচ্ছিল। হয়েছেও তাই। পরপর দু’দিন বাজার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক পরিণতিতে টানা কয়েক দিন বাজার পড়েছে। আর সে চক্র বাজারে সহজেই এই বলে গুজব ছড়াতে পারছে যে, বাজার আরও পড়বে।
 
আসলে এসব সরকারি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের একটা দুশ্চিন্তা সর্বদাই কাজ করছে। যেসব ফান্ড ম্যানেজার এগুলোর দায়িত্বে আছে তারা জেনে বুঝে আগেই অনেক উচ্চমূল্যে ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ার কিনে রেখেছে। এসব ভারি শেয়ারগুলো দিয়ে তাদের পোর্টফলিও সাজানো রয়েছে। অথচ তাদের উচিত ছিল, বাজারের উল্লম্ফন পরিস্থিতিতেও মাথা ঠা-া রেখে ভালো শেয়ারের মজুত বাড়ানো। ভালো শেয়ার মানে কেবলই কথিত ‘পিই’ সম্পন্ন ভালো কোম্পানির শেয়ার নয়। এগুলোর বাজার দামের দিকেও লক্ষ্য রাখা উচিত ছিল। একটি শেয়ার তখনই ভালো হয়, যখন কোম্পানির পারফরমেন্সের পাশাপাশি এর বাজার দামও স্বাভাবিক থাকে। এই কথিত অনেক ভালো শেয়ারের দাম যেমন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়েছিল তেমনি নাম করা অনেক প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির শেয়ারের বাজারমূল্য ৩০০ হাজার সূচকের দামের পর্যায়ে ছিল। কিন্তু এসব শেয়ারের দাম একটুও বাড়েনি বরং অনেক কমেছে এ কারণে যে, এগুলোর পেছনে গ্যাম্বলার ছিল না। কিন্তু এসেট ম্যানেজারদের তো সেদিকে দৃষ্টি দেয়ার কথা নয়।

বাজার স্থিতিশীল করতে হলে এসব বিষয়গুলো বিবেচনায় আনতে হবে। কারণ স্থিতিশীলতার অর্থ হলো, শেয়ারবাজারকে একটি ভারসাম্যের জায়গায় দাঁড় করানো। শেয়ারবাজারে ধস নামার পর ক্রমাগত মূল্য পতনের কারণে কথিত ভালো শেয়ারের পাশাপাশি অনেক প্রকৃত ভালো শেয়ারেরও অস্বাভাবিক মূল্য পতন ঘটছে। অনেক প্রকৃত ভালো শেয়ারের দাম এমনভাবে পড়ে গেছে যে, চোখ বুজে ওইসব শেয়ারে বিনিয়োগ করা যায়। সরকারি শেয়ারগুলোর দাম তো বিগত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থান করছে। অর্থমন্ত্রী এসব শেয়ারগুলো নিয়ে যেন তামাশা করছেন। একবার বলছেন অবিলম্বে এসব সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারবাজার ছাড়তে হবে। বাজার পরিস্থিতির কারণে তিনি আবার বললেন, আপাতত এগুলো বাজারে ছাড়া হবে না। আবার তার রেশ কাটতে না কাটতেই বলে বসলেন, মার্চেই এ শেয়ারগুলো বাজারে নিয়ে আসা হবে। সরকারের নীতিনির্ধারক মহলকে এ বিষয়ের ওপর প্রকৃত তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের এসব শেয়ার মধ্য মেয়াদের জন্য কিনতে উৎসাহ দেয়ার পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি এসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি এবং মিউচুয়াল ফান্ডগুলো যাতে এসব শেয়ার কেনে তার জন্য দিকনির্দেশনা দিতে হবে। এর ফলে যেসব শেয়ারের দাম অতিমূল্যায়িত রয়েছে সেগুলোর দাম আরও কিছুটা পড়ে এবং এসব অবমূল্যায়িত শেয়ারের দাম কিছুটা বেড়ে বাজারে একটা ভারসাম্য সৃষ্টি করবে। এর ফলে কমবেশি ৬ হাজার মূল্যসূচকের একটি স্থিতিশীল অবস্থা সৃষ্টির মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। বাজারে তারল্য সংকটের কারণে ট্রেডিং আওয়ার এক ঘণ্টা কমানো যেতে পারে। শেয়ারবাজারে বিপর্যয়ের পর অনেক দেশে এরূপ পদক্ষেপের ভালো ফল দেখা গেছে।
 
একবার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে তাদের বাজারমুখী করতে পারলে স্বাভাবিক নিয়মেই কথিত প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা শেয়ারবাজারে নিয়মিত কার্যক্রম শুরু করবে। কারণ, তারা লাভ চায়। চাপ দিয়ে তাদের শেয়ারবাজারে আনা যাবে না। লাভের সম্ভাবনা দেখা দিলে নিজের গরজেই তারা বাজারে ফিরে আসবে।

No comments:

Post a Comment