বিশেষজ্ঞদের মত,
শেয়ার সরবরাহ বাড়াতে ৫০ বেসরকারি ও ২৬ সরকারি কোম্পানিকে বাজারে আনার উদ্যোগ নিতে হবে, অতি মুনাফালোভী কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে
শেয়ার সরবরাহ বাড়াতে ৫০ বেসরকারি ও ২৬ সরকারি কোম্পানিকে বাজারে আনার উদ্যোগ নিতে হবে, অতি মুনাফালোভী কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে
দেশের শেয়ারবাজার ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে বাংলাদেশের শেয়ারবাজার এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। শেয়ারের মূল ও আয় অনুপাত (পিই রেশিও) বেশি হওয়ায় জন্য ঝুঁকিও বেশি। এছাড়া অতি মুনাফালোভী কোম্পানির দূর্বৃত্তায়ন, বাজারে শেয়ারের সরবরাহ কম এবং অসৎ ও দুর্নীতিবাজ লোকজন শেয়ারবাজার পরিচালনা করার কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে পিই সবচেয়ে বেশি। ঝুঁকির দিক থেকে এর পরের অবস্থান ভারতের মুম্বাই স্টক এক্সচেঞ্জ। এর পরে রয়েছে মালয়েশিয়া ও শ্রীলংকা। সবচেয়ে কম ঝুঁকিতে আছে পাকিস্তানের শেয়ারবাজার। এর পরে থাইল্যান্ড।
সারাবিশ্বেই শেয়ারের মূল্য ও আয়ের অনুপাত (যাকে পিই রেশিও বলা হয়) দিয়ে শেয়ার ও বাজারের ঝুঁকির অবস্থান নির্ণয় করা হয়। যে শেয়ারবাজারে মূল্য ও আয়ের অনুপাত (পিই) যত বেশি ওই বাজার তত ঝুঁকিপূর্ণ। যেমন, একটি কোম্পানির শেয়ারের মূল্য যদি ১০০ টাকা হয় এবং ওই শেয়ারের বিপরীতে আয় যদি হয় ১০ টাকা, তাহলে ১০০ কে ১০ দিয়ে ভাগ করলে ‘পিই’ হবে ১০। যদি কোনো শেয়ারের পিই ২০ এর ওপর চলে যায় তাহলে তাকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করা হয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জাতীয় অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের সার্বিকভাবে মূল্য ও আয়ের অনুপাত (পিই) দাঁড়ায় ২৭.৫৯। একই সময়ে পাকিস্তানের শেয়ারবাজারে পিই অনুপাত ছিল ৮, থাইল্যান্ডে (ব্যাঙ্কক) ১০, ইন্দোনেশিয়া ১৩, হংকং ১৬, শ্রীলংকা ১৮.৫৩, মালয়েশিয়া ২০.০০ এবং ভারতে (মুম্বাই) ২০.৫৬।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতি মুনাফা প্রবণতা, অন্য বিনিয়োগের ক্ষেত্র সঙ্কোচিত হওয়া এবং বাজারে শেয়ারের পর্যাপ্ত সরবরাহের অভাবে এমনটি হচ্ছে।
এ ব্যাপারে অর্থনীতিবিদ ড. আবু আহমেদ বলেন, দুর্বৃত্ত ও অসৎ লোকদের আখড়া বাংলাদেশের শেয়ারবাজার। বর্তমানে দেশের শেয়ারবাজার যেভাবে ঝুঁকির দিকে এগোচ্ছে তাতে দেশের সচেতন মানুষ শঙ্কিত। সরকারও এ দুর্বৃত্তায়ন ঠেকাতে পারছে না।
জানা গেছে, চলতি বছরের জুলাই মাসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তালিকাভুক্ত সব কোম্পানির গড় পিই অনুপাত ছিল ২৪.৫৫। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে এ অনুপাত দাঁড়ায় ২৬.৩৯। গত মাসের প্রথমার্ধে অধিকাংশ শেয়ারের দর যে হারে বাড়ে তাতে পিই অনুপাত ইতোমধ্যেই ২৭-এর কাছাকাছি চলে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিকভাবে শেয়ারবাজারের পিই অনুপাত ২০-এর নিচে থাকলে তাকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়া হয়। এর ওপরে উঠলেই ওই শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়।
শেয়ারবাজার বিশ্লেষকরা জানান, কোম্পানির মৌলভিত্তি দেখে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করা উচিত। বাজারে শেয়ারের মূল্য এবং কোম্পানির শেয়ার প্রতি আয়ের অনুপাত বা পিই মৌলভিত্তির অন্যতম প্রধান দিক। পিই দেখে বিনিয়োগকারীরা বুঝতে পারেন, শেয়ার কেনার পর কোম্পানির প্রকৃত আয় থেকে কত বছরে তার বিনিয়োকৃত অর্থ ফিরে পাওয়া সম্ভব। যে কোম্পানির পিই অনুপাত যত কম, ওই কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগে ঝুঁকিও তত কম। অন্যদিকে বেশি পিই অনুপাতের শেয়ারে বিনিয়োগ করা মানে ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ।
এ বিষয়ে পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, পিই দেখেই শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করা উচিত। যে সব শেয়ারের পিই ১০ থেকে ১৫’র মধ্যে রয়েছে সেসব শেয়ারে বিনিয়োগ ঝুঁকিমুক্ত। এর বেশি হলেই বিনিয়োগে ঝুঁকি থাকে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারের পিই অনুপাত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। বিশেষ করে গত দুই/তিন সপ্তাহ ধরে বাজার সূচকের ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি অধিকাংশ শেয়ারের দর ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে।
ডিএসই তালিকাভুক্ত কোম্পানির পরিসংখ্যান:
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চলতি বছরের প্রথম ৮ মাসে সিরামিক খাতের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর পিই অনুপাত ৩৯.৯৭ থেকে বেড়ে ১২০.৬৫ হয়েছে। একইভাবে পাট খাতের পিই ২৭.২৩ থেকে বেড়ে ৫৩.২৮, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ৩৬.৫০ থেকে বেড়ে ৬০.৯৫, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ২৫ থেকে বেড়ে ৪৮.৩৮, খাদ্যখাতে ১৭.২৯ থেকে বেড়ে ২২.২২, জ্বালানি ও বিদ্যুতে ১৭.৭১ থেকে বেড়ে ২৭.০২, বস্ত্রখাতে ৩২.৯৩ থেকে ৫৭.৪৯, ওষুধ খাতে ২৭.৬৪ থেকে বেড়ে ৩৪.৩৮, সেবা ও গৃহায়ন খাতে ৫৪.৬৫ থেকে বেড়ে ৬৬.৮৯, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ৬০.৭১ থেকে বেড়ে ৭৭.৬৮ এবং বীমা খাতের পিই অনুপাত ৩১.৩৯ থেকে বেড়ে ৪৩.৬০-এ দাঁড়িয়েছে।
তবে ওই সময়কালে ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন ব্যাংকিং, টেলিযোগাযোগ ও সিমেন্ট খাতের পিই অনুপাত হ্রাস পাওয়ায় সামগ্রিকভাবে বাজারের গড় পিই ব্যাপক মাত্রায় বাড়তে পারেনি। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতের গড় পিই অনুপাত ১৮.১৭ থেকে কমে ১৫.৭২ হয়। টেলিকম খাতের একমাত্র কোম্পানি গ্রামীণফোনের পিই ৮৪.৮৫ থেকে কমে ২১.১৫ হয়েছে। এছাড়া সিমেন্ট খাতের পিই ৫৬.৯০ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৩২.৫০। মূলত শেয়ারবাজারে এসব খাতের অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ার সংখ্যা অনেক বেশি থাকায় বাজারে চাহিদা ও যোগানের ভারসাম্য রয়েছে। এ কারণেই এসব কোম্পানির পিই অনুপাত দ্রুত বৃদ্ধি পায় না।
ডিএসই’র সাবেক সহ-সভাপতি আহমেদ রশিদ লালী এ ব্যাপারে বলেন, একমাত্র ব্যাংকিং খাতের গড় পিই বর্তমানে সবচেয়ে ভালো রয়েছে। এছাড়া বেশিরভাগ খাতের শেয়ারই ঝুঁকিপূর্ণ বলে তিনি মনে করেন।
এছাড়া বিনিয়োগকারী এবং অর্থ প্রবাহ বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ভালো শেয়ারের যোগান না বাড়ার কারণেই শেয়ারের দর ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে চলে যাচ্ছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। দর বৃদ্ধির এই হার কোম্পানির আয় বৃদ্ধির চেয়ে বেশি হওয়ায় বাড়ছে শেয়ারের পিই অনুপাত, যা বাজারকে ক্রমশ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থায় শেয়ারের সরবরাহ বাড়ানোকেই সবচেয়ে বড় সমাধান বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এজন্য বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছু কারণ উল্লেখ করছেন।
অতি মুনাফার লোভ:
বাংলাদেশের শেয়ারবাজার এরকম অস্থিরতার পেছনে বিনিয়োগকারীদের অতি মুনাফার লোভকেই দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ ব্যাপারে পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ ড. সালাউদ্দিন আহমেদ খান বলেন, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের প্রধান আয় হওয়া উচিত কোম্পানির ঘোষিত লভ্যাংশ থেকে। সে ক্ষেত্রে একজন বিনিয়োগকারীকে কমপক্ষে ছয় মাস বা তার চেয়ে বেশি সময় শেয়ার ধরে রাখা উচিত। অথচ এদেশে শেয়ার কিনে চার দিনেই তা বিক্রি করে দেয়া হচ্ছে। আর এই স্বল্পসময়ে হাতবদলের ফলে শেয়ারের দর বেড়েই যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা কেনাবেচা থেকে লাভ করাই প্রধান আয় মনে করছেন। অনেকেই লভ্যাংশ দেয়ার আগেই শেয়ার ছেড়ে দিচ্ছেন।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ:
বিনিয়োগ থেকে দ্রুত অধিক মুনাফা আসে বলেই ব্যাংক ও ননব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো শেয়ারবাজারে মাত্রাতিরিক্ত বিনিয়োগ করছে। ফলশ্রুতিতে ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিশোধিত মূলধনের ২৫ শতাংশ এবং ব্যাংকগুলোকে মোট আমানতের ১০ শতাংশের মধ্যে বিনিয়োগ সীমাবদ্ধ রাখার নির্দেশ দেয়। এরপরও এসব প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ কমছে না। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক গত মাসে মার্কেন্ট্রাইল, স্ট্যান্ডার্ড ও সাউথইস্ট ব্যাংককে তলব করে।
তাদের কাছে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়। গত আগস্ট মাসে ব্যাংকগুলোর পাঠানো তথ্যানুযায়ী শেয়ারবাজারে তাদের বিনিয়োগ ১০ শতাংশের বেশি বলে প্রতীয়মান হয়েছে। এর আগে প্রাইম ব্যাংক, এবি ব্যাংক, এনসিসি, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক ও ট্রাস্ট ব্যাংককেও নভেম্বরের মধ্যে বিনিয়োগ কমিয়ে আনার নির্দেশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধতন কর্মকর্তা বলেন, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের রাস টেনে ধরতে বাংলাদেশ ব্যাংক বদ্ধপরিকর। কারণ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাত্রাতিরিক্ত বিনিয়োগের ফলে শিল্পসহ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা আর্থিক সহায়তা পাচ্ছে না। তাই এ ব্যাপারে কঠোর হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বিনিয়োগের ক্ষেত্র সঙ্কুচিত হওয়া:
সঞ্চয়পত্র, ব্যাংক আমানতসহ অন্য বিনিয়োগে সুদের হার কমে যাওয়ায় মানুষ এখন শেয়ারবাজারের দিকে ঝুঁকছে।
এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ ড. আবু আহমেদ জানান, সঞ্চয়পত্রে সুদ কমে যাওয়া এবং উৎসেকর ধার্য্য করায় এ খাতে বিনিয়োগ কমে গেছে এবং আরো কমবে। এছাড়া এখানে বিনিয়োগে কিছু প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে। ফলে অনেকেই এখন শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করছেন বলে মনে করেন তিনি।
অধিকাংশ কোম্পানি দুর্বল:
বর্তমানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত সাড়ে ৪০০ কোম্পানির মধ্যে অন্তত ১০০ কোম্পানির মৌলভিত্তি খুবই দুর্বল। এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই বছরের পর বছর শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দিচ্ছে না। ইতোমধ্যে এসব কোম্পানির মধ্যে ৭৫টিকে মূল শেয়ারবাজার থেকে তালিকাচ্যুত করে ডিএসইর বিকল্প বাজার ওভার দ্য কাউন্টার (ওটিসি) মার্কেটে পাঠানো হয়েছে। এরমধ্যে সরকারি কিছু কোম্পানিও রয়েছে।
এ ব্যাপারে ডিএসই সভাপতি শাকিল রিজভী জানান, ১৯৯৬ পরবর্তীসময়ে বেশ কিছু দুর্বল কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়। এসব কোম্পানির বেশিরভাগই বর্তমানে উৎপাদনে নেই। লোকসানে থাকায় এগুলো শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। যারা এসব কোম্পানি শেয়ারবাজারে নিয়ে এসেছে তাদের বিরুদ্ধে সরকারের ব্যবস্থা নেয়া উচিত। কারণ তখন একটি শক্তিশালী চক্র শেয়ার সঙ্কটের সুযোগ কাজে লাগিয়ে নামে বেনামে কিছু কোম্পানি তালিকাভুক্ত করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
বেসরকারি কোম্পানি আনতে ব্যর্থতা:
কয়েক বছর ধরে বাজারে শেয়ারের চরম সঙ্কট চলছে। শত চেষ্টা করে শেয়ারের সরবরাহ বাড়ানো যাচ্ছে না। অথচ তালিকাভুক্ত হওয়ার যোগ্য এমন অন্তত ৫০টি কোম্পানিকে বাজারে আনা সম্ভব। নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) তালিকায় দেখা যায় অন্তত ৫০টি কোম্পানির শেয়ারবাজারে আসা বাধ্যতামূলক। সিকিউরিটিজ আইন অনুসারে ৫০ কোটি টাকার বেশি পরিশোধিত মূলধন হলে ওই কোম্পানির শেয়ারবাজারে আসা বাধ্যতামূলক। এসব কোম্পানি তালিকাভুক্ত না হলে তাদের জরিমানা বা মামলা করার ক্ষমতাও রয়েছে এসইসির।
সরকারি ২৬ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার:
অন্যদিকে বহুল আলোচিত সরকারি ২৬ প্রতিষ্ঠানকে শেয়ারবাজারে আনা যাচ্ছে না। চলতি বছরের জুন মাসের মধ্যে এসব কোম্পানি শেয়ারবাজারে আসার কথা ছিল। এ ব্যাপারে অর্থমন্ত্রী একাধিকবার প্রতিশ্রুতি দিলেও তা রক্ষা হয়নি। ২৪ অক্টোবর ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) এক আলোচনা সভায় অর্থমন্ত্রী সরকারি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ছাড়ার জন্য আরো তিন মাস সময় চেয়েছেন।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সভাপতি ফখর উদ্দীন আলী আহমেদ বলেন, বাজারে সরবরাহ-ঘাটতি থাকার কারণেই শেয়ারের দর অস্বাভাবিকহারে বাড়ছে। এ অবস্থায় সরবরাহ বাড়ানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। অর্থমন্ত্রী ২৬টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ছাড়ার ঘোষণা দিলেও অজানা কারণে সেই প্রক্রিয়া অগ্রসর হচ্ছে না। কার স্বার্থে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া আটকে আছেÑ তা খতিয়ে দেখতে হবে।
ডিএসই সভাপতির বক্তব্য:
এ ব্যাপারে ডিএসই (ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ) সভাপতি শাকিল রিজভী বলেন, শেয়ারবাজারে অধিকাংশ কোম্পানির মূল্য ও আয়ের (পিই) অনুপাত দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। অনেক কোম্পানির ক্ষেত্রেই এই ঊর্ধ্বমুখী যাত্রা টেকসই হবে না। এভাবে চলতে থাকলে বড় ধরনের বিপর্যয় হতে পারে। এতে বিনিয়োগকারীরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের শেয়ারবাজার। বড় ধরনের ধসের কারণে আবার শেয়ারবাজারের সুনাম ক্ষুণœ হলে আগামী ৮-১০ বছরেও তা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না। তিনি আরো বলেন, দুর্বল মৌলভিত্তিসম্পন্ন শেয়ার নিয়ে সম্প্রতি বিনিয়োগকারীরা অতি উৎসাহী হয়ে পড়েছেন। ফলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শেয়ার ইতোমধ্যেই অতি মূল্যায়িত হয়ে পড়েছে। সামগ্রিকভাবে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ঝুঁকির মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে।
সিএসই প্রেসিডেন্টের বক্তব্য:
সিএসই (চিটাগাং স্টক এক্সচেঞ্জ) সভাপতি ফখর উদ্দীন আলী আহমেদ বলেন, বাজারে সরবরাহ ঘাটতির কারণেই শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। ফলে বিনিয়োগকারী ও বাজার ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠেছে। বাজারে সরবরাহ ঘাটতি থাকলেই শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকহারে বাড়ে। এ অবস্থায় সরবরাহ বাড়ানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
তিনি দেশের অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ও পর্যটন খাতের উন্নয়নের জন্য শেয়ারবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহের আহ্বান জানিয়ে বলেন, শেয়ারবাজারে বিপুল তারল্য প্রবাহের এই সুযোগ সরকারকে কাজে লাগাতে হবে। এ টাকা দেশের উন্নয়নে কাজে লাগাতে হবে। বিনিয়োগ বোর্ডের মাধ্যমে কোম্পানি গঠন করে অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ও পর্যটন খাতের উন্নয়নে তহবিল সংগ্রহ করা সম্ভব। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই প্রক্রিয়ায় তহবিল সংগ্রহ করতে পারলে একদিকে শেয়ারবাজারে সরবরাহ সঙ্কট কাটবে, অন্যদিকে জাতীয় উন্নয়নে শেয়ারবাজারের শক্তিকে কাজে লাগানো সম্ভব।
এম সাইফুল
উৎস: যায়যায় দিন, সোমবার, ১ নভেম্বর ২০১০।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে পিই সবচেয়ে বেশি। ঝুঁকির দিক থেকে এর পরের অবস্থান ভারতের মুম্বাই স্টক এক্সচেঞ্জ। এর পরে রয়েছে মালয়েশিয়া ও শ্রীলংকা। সবচেয়ে কম ঝুঁকিতে আছে পাকিস্তানের শেয়ারবাজার। এর পরে থাইল্যান্ড।
সারাবিশ্বেই শেয়ারের মূল্য ও আয়ের অনুপাত (যাকে পিই রেশিও বলা হয়) দিয়ে শেয়ার ও বাজারের ঝুঁকির অবস্থান নির্ণয় করা হয়। যে শেয়ারবাজারে মূল্য ও আয়ের অনুপাত (পিই) যত বেশি ওই বাজার তত ঝুঁকিপূর্ণ। যেমন, একটি কোম্পানির শেয়ারের মূল্য যদি ১০০ টাকা হয় এবং ওই শেয়ারের বিপরীতে আয় যদি হয় ১০ টাকা, তাহলে ১০০ কে ১০ দিয়ে ভাগ করলে ‘পিই’ হবে ১০। যদি কোনো শেয়ারের পিই ২০ এর ওপর চলে যায় তাহলে তাকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করা হয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জাতীয় অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের সার্বিকভাবে মূল্য ও আয়ের অনুপাত (পিই) দাঁড়ায় ২৭.৫৯। একই সময়ে পাকিস্তানের শেয়ারবাজারে পিই অনুপাত ছিল ৮, থাইল্যান্ডে (ব্যাঙ্কক) ১০, ইন্দোনেশিয়া ১৩, হংকং ১৬, শ্রীলংকা ১৮.৫৩, মালয়েশিয়া ২০.০০ এবং ভারতে (মুম্বাই) ২০.৫৬।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতি মুনাফা প্রবণতা, অন্য বিনিয়োগের ক্ষেত্র সঙ্কোচিত হওয়া এবং বাজারে শেয়ারের পর্যাপ্ত সরবরাহের অভাবে এমনটি হচ্ছে।
এ ব্যাপারে অর্থনীতিবিদ ড. আবু আহমেদ বলেন, দুর্বৃত্ত ও অসৎ লোকদের আখড়া বাংলাদেশের শেয়ারবাজার। বর্তমানে দেশের শেয়ারবাজার যেভাবে ঝুঁকির দিকে এগোচ্ছে তাতে দেশের সচেতন মানুষ শঙ্কিত। সরকারও এ দুর্বৃত্তায়ন ঠেকাতে পারছে না।
জানা গেছে, চলতি বছরের জুলাই মাসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তালিকাভুক্ত সব কোম্পানির গড় পিই অনুপাত ছিল ২৪.৫৫। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে এ অনুপাত দাঁড়ায় ২৬.৩৯। গত মাসের প্রথমার্ধে অধিকাংশ শেয়ারের দর যে হারে বাড়ে তাতে পিই অনুপাত ইতোমধ্যেই ২৭-এর কাছাকাছি চলে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিকভাবে শেয়ারবাজারের পিই অনুপাত ২০-এর নিচে থাকলে তাকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়া হয়। এর ওপরে উঠলেই ওই শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়।
শেয়ারবাজার বিশ্লেষকরা জানান, কোম্পানির মৌলভিত্তি দেখে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করা উচিত। বাজারে শেয়ারের মূল্য এবং কোম্পানির শেয়ার প্রতি আয়ের অনুপাত বা পিই মৌলভিত্তির অন্যতম প্রধান দিক। পিই দেখে বিনিয়োগকারীরা বুঝতে পারেন, শেয়ার কেনার পর কোম্পানির প্রকৃত আয় থেকে কত বছরে তার বিনিয়োকৃত অর্থ ফিরে পাওয়া সম্ভব। যে কোম্পানির পিই অনুপাত যত কম, ওই কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগে ঝুঁকিও তত কম। অন্যদিকে বেশি পিই অনুপাতের শেয়ারে বিনিয়োগ করা মানে ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ।
এ বিষয়ে পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, পিই দেখেই শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করা উচিত। যে সব শেয়ারের পিই ১০ থেকে ১৫’র মধ্যে রয়েছে সেসব শেয়ারে বিনিয়োগ ঝুঁকিমুক্ত। এর বেশি হলেই বিনিয়োগে ঝুঁকি থাকে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারের পিই অনুপাত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। বিশেষ করে গত দুই/তিন সপ্তাহ ধরে বাজার সূচকের ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি অধিকাংশ শেয়ারের দর ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে।
ডিএসই তালিকাভুক্ত কোম্পানির পরিসংখ্যান:
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চলতি বছরের প্রথম ৮ মাসে সিরামিক খাতের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর পিই অনুপাত ৩৯.৯৭ থেকে বেড়ে ১২০.৬৫ হয়েছে। একইভাবে পাট খাতের পিই ২৭.২৩ থেকে বেড়ে ৫৩.২৮, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ৩৬.৫০ থেকে বেড়ে ৬০.৯৫, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ২৫ থেকে বেড়ে ৪৮.৩৮, খাদ্যখাতে ১৭.২৯ থেকে বেড়ে ২২.২২, জ্বালানি ও বিদ্যুতে ১৭.৭১ থেকে বেড়ে ২৭.০২, বস্ত্রখাতে ৩২.৯৩ থেকে ৫৭.৪৯, ওষুধ খাতে ২৭.৬৪ থেকে বেড়ে ৩৪.৩৮, সেবা ও গৃহায়ন খাতে ৫৪.৬৫ থেকে বেড়ে ৬৬.৮৯, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ৬০.৭১ থেকে বেড়ে ৭৭.৬৮ এবং বীমা খাতের পিই অনুপাত ৩১.৩৯ থেকে বেড়ে ৪৩.৬০-এ দাঁড়িয়েছে।
তবে ওই সময়কালে ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন ব্যাংকিং, টেলিযোগাযোগ ও সিমেন্ট খাতের পিই অনুপাত হ্রাস পাওয়ায় সামগ্রিকভাবে বাজারের গড় পিই ব্যাপক মাত্রায় বাড়তে পারেনি। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতের গড় পিই অনুপাত ১৮.১৭ থেকে কমে ১৫.৭২ হয়। টেলিকম খাতের একমাত্র কোম্পানি গ্রামীণফোনের পিই ৮৪.৮৫ থেকে কমে ২১.১৫ হয়েছে। এছাড়া সিমেন্ট খাতের পিই ৫৬.৯০ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৩২.৫০। মূলত শেয়ারবাজারে এসব খাতের অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ার সংখ্যা অনেক বেশি থাকায় বাজারে চাহিদা ও যোগানের ভারসাম্য রয়েছে। এ কারণেই এসব কোম্পানির পিই অনুপাত দ্রুত বৃদ্ধি পায় না।
ডিএসই’র সাবেক সহ-সভাপতি আহমেদ রশিদ লালী এ ব্যাপারে বলেন, একমাত্র ব্যাংকিং খাতের গড় পিই বর্তমানে সবচেয়ে ভালো রয়েছে। এছাড়া বেশিরভাগ খাতের শেয়ারই ঝুঁকিপূর্ণ বলে তিনি মনে করেন।
এছাড়া বিনিয়োগকারী এবং অর্থ প্রবাহ বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ভালো শেয়ারের যোগান না বাড়ার কারণেই শেয়ারের দর ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে চলে যাচ্ছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। দর বৃদ্ধির এই হার কোম্পানির আয় বৃদ্ধির চেয়ে বেশি হওয়ায় বাড়ছে শেয়ারের পিই অনুপাত, যা বাজারকে ক্রমশ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থায় শেয়ারের সরবরাহ বাড়ানোকেই সবচেয়ে বড় সমাধান বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এজন্য বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছু কারণ উল্লেখ করছেন।
অতি মুনাফার লোভ:
বাংলাদেশের শেয়ারবাজার এরকম অস্থিরতার পেছনে বিনিয়োগকারীদের অতি মুনাফার লোভকেই দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ ব্যাপারে পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ ড. সালাউদ্দিন আহমেদ খান বলেন, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের প্রধান আয় হওয়া উচিত কোম্পানির ঘোষিত লভ্যাংশ থেকে। সে ক্ষেত্রে একজন বিনিয়োগকারীকে কমপক্ষে ছয় মাস বা তার চেয়ে বেশি সময় শেয়ার ধরে রাখা উচিত। অথচ এদেশে শেয়ার কিনে চার দিনেই তা বিক্রি করে দেয়া হচ্ছে। আর এই স্বল্পসময়ে হাতবদলের ফলে শেয়ারের দর বেড়েই যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা কেনাবেচা থেকে লাভ করাই প্রধান আয় মনে করছেন। অনেকেই লভ্যাংশ দেয়ার আগেই শেয়ার ছেড়ে দিচ্ছেন।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ:
বিনিয়োগ থেকে দ্রুত অধিক মুনাফা আসে বলেই ব্যাংক ও ননব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো শেয়ারবাজারে মাত্রাতিরিক্ত বিনিয়োগ করছে। ফলশ্রুতিতে ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিশোধিত মূলধনের ২৫ শতাংশ এবং ব্যাংকগুলোকে মোট আমানতের ১০ শতাংশের মধ্যে বিনিয়োগ সীমাবদ্ধ রাখার নির্দেশ দেয়। এরপরও এসব প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ কমছে না। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক গত মাসে মার্কেন্ট্রাইল, স্ট্যান্ডার্ড ও সাউথইস্ট ব্যাংককে তলব করে।
তাদের কাছে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়। গত আগস্ট মাসে ব্যাংকগুলোর পাঠানো তথ্যানুযায়ী শেয়ারবাজারে তাদের বিনিয়োগ ১০ শতাংশের বেশি বলে প্রতীয়মান হয়েছে। এর আগে প্রাইম ব্যাংক, এবি ব্যাংক, এনসিসি, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক ও ট্রাস্ট ব্যাংককেও নভেম্বরের মধ্যে বিনিয়োগ কমিয়ে আনার নির্দেশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধতন কর্মকর্তা বলেন, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের রাস টেনে ধরতে বাংলাদেশ ব্যাংক বদ্ধপরিকর। কারণ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাত্রাতিরিক্ত বিনিয়োগের ফলে শিল্পসহ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা আর্থিক সহায়তা পাচ্ছে না। তাই এ ব্যাপারে কঠোর হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বিনিয়োগের ক্ষেত্র সঙ্কুচিত হওয়া:
সঞ্চয়পত্র, ব্যাংক আমানতসহ অন্য বিনিয়োগে সুদের হার কমে যাওয়ায় মানুষ এখন শেয়ারবাজারের দিকে ঝুঁকছে।
এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ ড. আবু আহমেদ জানান, সঞ্চয়পত্রে সুদ কমে যাওয়া এবং উৎসেকর ধার্য্য করায় এ খাতে বিনিয়োগ কমে গেছে এবং আরো কমবে। এছাড়া এখানে বিনিয়োগে কিছু প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে। ফলে অনেকেই এখন শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করছেন বলে মনে করেন তিনি।
অধিকাংশ কোম্পানি দুর্বল:
বর্তমানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত সাড়ে ৪০০ কোম্পানির মধ্যে অন্তত ১০০ কোম্পানির মৌলভিত্তি খুবই দুর্বল। এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই বছরের পর বছর শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দিচ্ছে না। ইতোমধ্যে এসব কোম্পানির মধ্যে ৭৫টিকে মূল শেয়ারবাজার থেকে তালিকাচ্যুত করে ডিএসইর বিকল্প বাজার ওভার দ্য কাউন্টার (ওটিসি) মার্কেটে পাঠানো হয়েছে। এরমধ্যে সরকারি কিছু কোম্পানিও রয়েছে।
এ ব্যাপারে ডিএসই সভাপতি শাকিল রিজভী জানান, ১৯৯৬ পরবর্তীসময়ে বেশ কিছু দুর্বল কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়। এসব কোম্পানির বেশিরভাগই বর্তমানে উৎপাদনে নেই। লোকসানে থাকায় এগুলো শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। যারা এসব কোম্পানি শেয়ারবাজারে নিয়ে এসেছে তাদের বিরুদ্ধে সরকারের ব্যবস্থা নেয়া উচিত। কারণ তখন একটি শক্তিশালী চক্র শেয়ার সঙ্কটের সুযোগ কাজে লাগিয়ে নামে বেনামে কিছু কোম্পানি তালিকাভুক্ত করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
বেসরকারি কোম্পানি আনতে ব্যর্থতা:
কয়েক বছর ধরে বাজারে শেয়ারের চরম সঙ্কট চলছে। শত চেষ্টা করে শেয়ারের সরবরাহ বাড়ানো যাচ্ছে না। অথচ তালিকাভুক্ত হওয়ার যোগ্য এমন অন্তত ৫০টি কোম্পানিকে বাজারে আনা সম্ভব। নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) তালিকায় দেখা যায় অন্তত ৫০টি কোম্পানির শেয়ারবাজারে আসা বাধ্যতামূলক। সিকিউরিটিজ আইন অনুসারে ৫০ কোটি টাকার বেশি পরিশোধিত মূলধন হলে ওই কোম্পানির শেয়ারবাজারে আসা বাধ্যতামূলক। এসব কোম্পানি তালিকাভুক্ত না হলে তাদের জরিমানা বা মামলা করার ক্ষমতাও রয়েছে এসইসির।
সরকারি ২৬ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার:
অন্যদিকে বহুল আলোচিত সরকারি ২৬ প্রতিষ্ঠানকে শেয়ারবাজারে আনা যাচ্ছে না। চলতি বছরের জুন মাসের মধ্যে এসব কোম্পানি শেয়ারবাজারে আসার কথা ছিল। এ ব্যাপারে অর্থমন্ত্রী একাধিকবার প্রতিশ্রুতি দিলেও তা রক্ষা হয়নি। ২৪ অক্টোবর ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) এক আলোচনা সভায় অর্থমন্ত্রী সরকারি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ছাড়ার জন্য আরো তিন মাস সময় চেয়েছেন।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সভাপতি ফখর উদ্দীন আলী আহমেদ বলেন, বাজারে সরবরাহ-ঘাটতি থাকার কারণেই শেয়ারের দর অস্বাভাবিকহারে বাড়ছে। এ অবস্থায় সরবরাহ বাড়ানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। অর্থমন্ত্রী ২৬টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ছাড়ার ঘোষণা দিলেও অজানা কারণে সেই প্রক্রিয়া অগ্রসর হচ্ছে না। কার স্বার্থে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া আটকে আছেÑ তা খতিয়ে দেখতে হবে।
ডিএসই সভাপতির বক্তব্য:
এ ব্যাপারে ডিএসই (ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ) সভাপতি শাকিল রিজভী বলেন, শেয়ারবাজারে অধিকাংশ কোম্পানির মূল্য ও আয়ের (পিই) অনুপাত দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। অনেক কোম্পানির ক্ষেত্রেই এই ঊর্ধ্বমুখী যাত্রা টেকসই হবে না। এভাবে চলতে থাকলে বড় ধরনের বিপর্যয় হতে পারে। এতে বিনিয়োগকারীরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের শেয়ারবাজার। বড় ধরনের ধসের কারণে আবার শেয়ারবাজারের সুনাম ক্ষুণœ হলে আগামী ৮-১০ বছরেও তা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না। তিনি আরো বলেন, দুর্বল মৌলভিত্তিসম্পন্ন শেয়ার নিয়ে সম্প্রতি বিনিয়োগকারীরা অতি উৎসাহী হয়ে পড়েছেন। ফলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শেয়ার ইতোমধ্যেই অতি মূল্যায়িত হয়ে পড়েছে। সামগ্রিকভাবে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ঝুঁকির মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে।
সিএসই প্রেসিডেন্টের বক্তব্য:
সিএসই (চিটাগাং স্টক এক্সচেঞ্জ) সভাপতি ফখর উদ্দীন আলী আহমেদ বলেন, বাজারে সরবরাহ ঘাটতির কারণেই শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। ফলে বিনিয়োগকারী ও বাজার ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠেছে। বাজারে সরবরাহ ঘাটতি থাকলেই শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকহারে বাড়ে। এ অবস্থায় সরবরাহ বাড়ানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
তিনি দেশের অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ও পর্যটন খাতের উন্নয়নের জন্য শেয়ারবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহের আহ্বান জানিয়ে বলেন, শেয়ারবাজারে বিপুল তারল্য প্রবাহের এই সুযোগ সরকারকে কাজে লাগাতে হবে। এ টাকা দেশের উন্নয়নে কাজে লাগাতে হবে। বিনিয়োগ বোর্ডের মাধ্যমে কোম্পানি গঠন করে অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ও পর্যটন খাতের উন্নয়নে তহবিল সংগ্রহ করা সম্ভব। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই প্রক্রিয়ায় তহবিল সংগ্রহ করতে পারলে একদিকে শেয়ারবাজারে সরবরাহ সঙ্কট কাটবে, অন্যদিকে জাতীয় উন্নয়নে শেয়ারবাজারের শক্তিকে কাজে লাগানো সম্ভব।
এম সাইফুল
উৎস: যায়যায় দিন, সোমবার, ১ নভেম্বর ২০১০।
No comments:
Post a Comment