Monday, November 8, 2010

মডার্ন পলি ইন্ডাস্ট্রিজের আইপিও বাতিল করেছে এসইসি


শেয়ারবাজার থেকে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহের আগেই অনিয়ম তথা শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তিতে বিধিমালা ভঙ্গ করার অভিযোগে মডার্ন পলি ইন্ডাস্ট্রিজের আইপিও বাতিল করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। একইসঙ্গে এ কোম্পানির তালিকাভুক্তির আবেদনে তথ্য গোপনের দায়ে মডার্ন পলি ইন্ডাস্ট্রিজ, মডার্ন ফাইবার লিমিটেড এবং ইস্যু ম্যানেজার এলায়েন্স ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছে সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। গতকাল কমিশনের ৩৬৪তম সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সভা শেষে এসইসি’র মুখপাত্র নির্বাহী পরিচালক আনোয়ারুল কবির ভূঁইয়া ও এটিএম তারিকুজ্জামান এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।

সভা শেষে এসইসি’র ক্যাপিটাল ইস্যু বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক এটিএম তারিকুজ্জামান সাংবাদিকদের জানান, মডার্ন পলি ইন্ডাস্ট্রিজ শেয়ারবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করে যে কোম্পানির শেয়ার কিনবে সেই কোম্পানির মূলধন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এসইসি’র বিধিমালা ভঙ্গ করা হয়েছে। শেয়ারের নির্দেশক মূল্য নির্ধারণের জন্য আয়োজিত রোড শো’তে সেই তথ্য গোপন করা হয়েছে। এসইসি’র কাছে দেয়া আবেদনেও তা গোপন করা হয়েছে। তাই পুরো প্রক্রিয়াটিকে অস্বচ্ছ এবং অগ্রহণযোগ্য মনে করে কমিশন এ কোম্পানির আইপিও’র অনুমোদন বাতিল করেছে।

প্রাথমিক অবস্থায় এসব বিষয় চিহ্নিত না করে এসইসি কেন এ কোম্পানির আইপিও অনুমোদন দিয়েছিলÑ এ প্রশ্নের জবাবে তারিকুজ্জামান বলেন, একটি কোম্পানি আইপিও’তে আসতে চাইলে প্রাথমিকভাবে তার সব রকম তথ্যের যথার্থতা নির্ণয় করা ইস্যু ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব। শেয়ারবাজারে আসার জন্য সব রকম যোগ্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার পরই ইস্যু ব্যবস্থাপক আইপিও আবেদনটি এসইসিতে জমা দেবে। বড় কোনো সমস্যা না থাকলে তাদের দেয়া তথ্যের প্রতি আস্থা রেখেই এসইসি আইপিও অনুমোদন করে। মডার্ন পলির ক্ষেত্রেও তাই করা হয়েছে। কিন্তু ইস্যু ব্যবস্থাপক মডার্ন ফাইবারের মূলধন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এসইসি’র অনুমোদন না নেয়ার তথ্য গোপন করেছে। এ কারণেই এসইসি’র প্রাথমিকভাবে বিষয়টি চিহ্নিত করতে পারেনি।

তিনি জানান, এ কোম্পানিটি শেয়ারবাজার থেকে সংগৃহীত অর্থ মডার্ন ফাইবারে বিনিয়োগ করবে। তাই বিধি-বহির্ভূতভাবে ওই কোম্পানির মূলধন বৃদ্ধির বিষয়টি আইপিও’র সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এক্ষেত্রে তথ্য গোপনের দায়-দায়িত্ব ইস্যু ব্যবস্থাপকের ওপর বর্তায়। প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে শিগগিরই এ কোম্পানির ইস্যু ব্যবস্থাপক এলায়েন্স ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে তিনি জানান। একই সঙ্গে তথ্য গোপনের অভিযোগে মডার্ন পলি ইন্ডাস্ট্রিজ ও মডার্ন ফাইবার লিমিটেডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য এসইসির এনফোর্সমেন্ট বিভাগকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

জানা গেছে, একই ব্যবসায়িক গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান মডার্ন ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ার কেনার জন্য শেয়ারবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের আবেদন করেছিল মডার্ন পলি ইন্ডাস্ট্রিজ। বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে মূল্য নির্ধারণের পর মডার্ন পলি ইন্ডাস্ট্রিজকে শেয়ারবাজার থেকে ১৯২ কোটি টাকা সংগ্রহের অনুমতি দেয় এসইসি। গত ২৫ আগস্ট অনুষ্ঠিত কমিশন সভায় এই কোম্পানির আইপিও অনুমোদন করা হয়।

সূত্র জানায়, ২০০৯ সালে মডার্ন ফাইবার ইন্ডাস্ট্রিজের পরিশোধিত মূলধন ৬০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হলেও আইন অনুযায়ী এ বিষয়ে এসইসি’র অনুমোদন নেয়া হয়নি। পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী বাংলাদেশে নিবন্ধিত যে কোনো কোম্পানি ১০ কোটি টাকার বেশি মূলধন সংগ্রহ করতে চাইলে এসইসি’র অনুমোদন নেয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু মডার্ন ফাইবারের ক্ষেত্রে তা করা হয়নি। আইপিও আবেদনে মূলধন বৃদ্ধির বিষয়ে রেজিস্ট্রার অফ জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ এন্ড ফার্মসের (আরজেএসসি) সনদ জমা দেয়া হলেও এসইসি’র অনুমোদন না নেয়ার বিষয়টি গোপন করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী এসইসি’র অনুমোদন নেয়ার আগে আরজেএসসি থেকে মূলধন বৃদ্ধির সনদ পাওয়ার কথা নয়।

অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন ৪০ কোটি টাকা অতিক্রম করলে ওই কোম্পানিকে পাবলিক লিমিটেডে রূপান্তর করতে হয়। আবার পরিশোধিত মূলধন ৫০ কোটি টাকা বা তার বেশি হলে কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে হয়। মডার্ন ফাইবারের মূলধনের চেয়ে বেশি হলেও কোম্পানিটি এখনও প্রাইভেট লিমিটেড রয়ে গেছে। কমিশন সভায় এসব বিষয় পর্যালোচনা করে এর আগে দেয়া আইপিও অনুমোদন বাতিল করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, মডার্ন পলি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের ৩ কোটি শেয়ার ছেড়ে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের অনুমোদন পেয়েছিল। কোম্পানির প্রতিটি শেয়ারের নির্দেশক মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৬৪ টাকা। তাই কোম্পানির আইপিও’র জন্য বরাদ্দ শেয়ারের প্রস্তাবিত সর্বমোট মূল্য ছিল ১৯২ কোটি টাকা। একই শিল্প গ্রুপের মডার্ন ফাইবার ইন্ডাস্ট্রিজ নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠানের ৫ লাখ ৬ হাজার ৩০০ শেয়ার কেনার জন্য এ অর্থ সংগ্রহ করা হতো। ওই কোম্পানির ১ হাজার টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে ২ হাজার ৮৮০ টাকা প্রিমিয়ামসহ ৩ হাজার ৮৮০ টাকা মূল্য নির্ধারণ করা হয়। প্রসঙ্গত ২০০৯ সালে মডার্ন ফাইবার লিমিটেডে আগুন লেগে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও সে বছর কোম্পানির আয় অস্বাভাবিক বেশি দেখানো হয়েছে।

জানা গেছে, অস্বাভাবিক হারে প্রিমিয়াম মূল্য যুক্ত করে একই গ্রুপের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের শেয়ার কেনার জন্য পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের অনুমোদন দেয়ার বিষয়ে শুরু থেকে ডিএসই বিরোধিতা করছিল। ডিএসই’র পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এভাবে সুযোগ দেয়া হলে অনেক ভুয়া কোম্পানি নানা ধরনের কারণ দেখিয়ে পুঁজিবাজার থেকে টাকা নেয়ার চেষ্টা করবেÑ যা দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগকারীদের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। মডার্ন পলি ইন্ডাস্ট্রিজের তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে আপত্তির বিষয়টি ডিএসই’র পক্ষ থেকে এসইসিকে অবহিত করা হয়। কিন্তু এই আপত্তি উপেক্ষা করেই প্রথম অবস্থায় আইপিও অনুমোদন করেছিল এসইসি।

No comments:

Post a Comment