Saturday, August 21, 2010

শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে প্রথমিক পর্যায়ে যা করণীয়

ছবিঃ ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ভবন।


বাংলাদেশের মানুষ এখন শেয়ার ব্যবসার দিকে প্রতিনিয়ত ঝুঁকে পড়ছে, পুঁজি বাজারে অর্থ সর্বরাহ করে লাভের আশায় বাংলাদেশের যুব সমাজ এখন প্রতিযোগীতায় নেমে পড়েছে। কিন্তু যথাযত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার অভাবে পুঁজি বাজারে আসা ওসব বিনিয়োগকারী প্রতিনিয়ত ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছে। এভাবে পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে অসংখ্য বিনিয়োগকারী। শেয়ার বাজারে ক্ষতি এড়াতে কিছু বিষয় লক্ষ্য রাখতে হয়। একটু সচেতন হলেই পুঁজি বাজারে অনেক লাভ করা যায়।


আবেগী হওয়া যাবে না

দেশের পুঁজিবাজার ক্রমেই চাঙা হচ্ছে। তবে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে হলে আগে এ খাত সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নিতে হবে। আপনি ব্যবসায়ী, চাকরীজীবী অথবা যে কোন পেশার হতে পারেন। মোদ্দাকথা আপনার কাছে বেশ কিছু টাকা আছে। অনেকের কাছ থেকে শুনেছেন পুঁজিবাজার বা শেয়ারবাজারের কথা। ফলে আগ্রহী হয়ে ওঠেন শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে। ধারণা করতে পারেন রাতারাতি টাকা কামানোর এই বুঝি সহজ উপায়। শেয়ার কিনলেই লাভ। সেই হিসেবে একটি ব্রোকার হাউসে বেনিফিশারি হিসাব (বিও) খুললেন। শুরু করলেন বিনিয়োগ। না জেনে, না বুঝেই বিনিয়োগ শুরু করলেন। কিন্তু কিছু দিন যেতে না যেতেই বুঝতে পারলেন বিনিয়োগ ঠিকমতো হয়নি। তখন আর কিছুই করার নাই। কষ্টের জমানো টাকা প্রায় শেষ। শেয়ারবাজারের দরপতন দেখে কেনা শেয়ারগুলো আবার তড়িঘড়ি করে বিক্রি করে দিয়ে অনেকটা নিঃস্ব হয়ে ফিরে আসেন শেয়ারবাজার থেকে।


এটা শুধু হাতে গোনা দু’একজন ব্যক্তি নন। এরকম শত শত নতুন শেয়ারহোল্ডার আছে যারা না জেনে, না বুঝে বিনিয়োগ করে আর্থিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। নিজের জমানো টাকা লাভের আশায় বিনিয়োগ করে শেষ করে ফেলছেন। আবার অনেকেই বিনিয়োগ করে লাভবানও হচ্ছেন। তাই শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ শুরুর আগে পুরো বিষয়টি বুঝে নিতে হবে ভাল করে। বর্তমানে পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীর সংখ্যা প্রায় ২৬ লাখ। সিকিউরিটি এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, প্রায় পাঁচ থেকে ছয় লাখ লোক নিয়মিত শেয়ার লেনদেন করে থাকেন। আর প্রতিটি কার্য দিবসে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার বিনিয়োগকারী লেনদেনের কাজ করেন। প্রতিদিনের লেনদেনের পরিমাণও অনেক। এখান থেকে কেউ লাভ করছেন, কারও আবার বিনিয়োগ করা টাকা শেষ হয়ে যাচ্ছে। কাদের জন্য এই শেয়ারবাজার তাও জানতে হবে।
কাদের বিনিয়োগ করা উচিত

শেয়ার ব্যবসা কি সবার জন্য? পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে চাইলে কেউ আপনাকে বাধা দিতে পারবে না। তবে এ ব্যবসায় আপনার ঢোকাটা ঠিক হবে কি না, তা আপনাকেই বুঝতে হবে। শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, পুঁজিবাজার আসলে সবার জন্য নয়। বর্তমানে দেখা যায়, ন্যূনতম জ্ঞান নেই এমন অনেক লোক পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। এ ব্যবসা সত্যিকার অর্থে নির্বাচিত কিছু লোকের জন্য। যাঁদের পুঁজিবাজার সম্পর্কে জ্ঞান আছে, যাঁরা ব্যবসায় ঝুঁকি নিতে পারেন, কেবল এমন পেশাদার শিক্ষিত লোকেরই উচিত এখানে বিনিয়োগ করা।


পেশা হিসেবে নিতে পারেন?

পুঁজিবাজারে সাধারণত দুই ধরনের বিনিয়োগকারী থাকেন। এক. ব্যক্তিগত পর্যায়ে বিনিয়োগকারী। দুই. প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিনিয়োগকারী। আবার পুঁজিবাজারের ব্যক্তিগত পর্যায়ে বিনিয়োগকারীদের বেশির ভাগ বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। তাদের কেউ চাকরিজীবী, কেউ ব্যবসায়ী, কেউ শিক্ষিত বেকার, কেউ বা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া আবার অনেকেই আছেন যারা বিদেশ ফেরত। কেউ চাইলে এটাকে রীতিমতো পেশার ক্ষেত্র হিসেবেও নিতে পারেন। একটি সিকিউরিটিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যানের মতে, অল্প কিছু দিন আগেও মানুষ ভাবতে পারত না, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে এটাকে পেশা হিসেবে নেওয়া যাবে। তবে বর্তমানে সে ধারণা পাল্টে গেছে। এখন অনেকেই পুঁজিবাজারকে পেশার জায়গা হিসেবেই নিচ্ছেন। বিশেষ করে অনেক শিক্ষিত বেকার ও বিদেশ ফেরত লোকজন পুঁজিবাজারকে পেশার ক্ষেত্র হিসেবে নিচ্ছেন।


কৌশলী হতে হবে বিনিয়োগে

অনেকেই পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকে লটারির মতো মনে করে থাকে। তবে শেয়ার ব্যবসা কোনো লটারির খেলা নয়। এখানে বিনিয়োগ করে লাভবান হতে হলে তাকে কৌশলী হতে হবে। বাজারের ধারাকে বুঝতে হবে। বিনিয়োগের আগে বিনিয়োগকারীকে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অর্থনৈতিক তথ্য যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। তা ঠিকভাবে না করতে পারলে আর্থিক ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি। অনেকে আবার বিভিন্ন গুজবে কান দিয়ে বিনিয়োগ করে নিজের ক্ষতি করে ফেলছেন।


বিনিয়োগ করতে হবে ভিন্ন ভিন্ন খাতে

আপনি যদি শেয়ারে বিনিয়োগ করে লাভবান হতে চান, তবে বিনিয়োগ করার সময় একটি বিষয় অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। মূলধনের টাকাকে খাত অনুযায়ী ভাগ করে নিতে হবে। বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের ফলে কোনো একটি বিশেষ খাতের বিনিয়োগ যদি ক্ষতির মধ্যেও পড়ে যায় তা অন্য খাতের মাধ্যমে পুষিয়ে নিতে পারবেন। আর পুরো টাকা একটি খাতে বিনিয়োগ করে ফেললে সে সুযোগ আর থাকে না। বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের সিকিউরিটিকে ১৭টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। সেগুলো হলো ব্যাংকিং, বিনিয়োগ, করপোরেট বন্ড, বিমা, প্রকৌশল খাত, খাদ্য ও সমজাতীয় পণ্য, জ্বালানি, ওষুধ, কাগজ ও মুদ্রণ, সেবা, পাট, টেক্সটাইল, সিমেন্ট, তথ্যপ্রযুক্তি, সিরামিক, পর্যটন এবং বিবিধ। আপনি যদি শেয়ার ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে চান, তবে আপনাকে এসব খাত ধরে বিনিয়োগ করতে হবে।


বিভিন্ন শেয়ারের ক্যাটাগরি

শেয়ারবাজারে যেসব কোম্পানির শেয়ার আছে সেগুলোকে আবার এ, বি, এন এবং জেড ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করা হয়েছে। এ ক্যাটাগরিতে রয়েছে ওই সব কোম্পানির শেয়ার, যারা নিয়মিত বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) করে এবং শেয়ার লভ্যাংশও দেয় ১০ শতাংশের ওপর। নিয়মিত বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) করলেও লভ্যাংশ দেয় ১০ শতাংশের কম তারা পড়ে বি ক্যাটারিতে। এন ক্যাটারিতে আছে এক বছরের কম সময় আগে নিবন্ধিত কোম্পানির শেয়ার। আর জেড ক্যাটারিতে রয়েছে যারা নিয়মিত লভ্যাংশ দেয় না এবং এজিএমও করে না। যারা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে সাবধানতা মেনে চলেন, তারা সাধারণত এ ক্যাটারির শেয়ার কিনে থাকেন।


বিনিয়োগের আগে ভাবুন

যারা ভাবছেন শেয়ার ব্যবসায় বিনিয়োগ করবেন, তারা বিনিয়োগকে ঝুঁকিমুক্ত রাখতে কয়েকটি বিষয় বিশেষ খেয়াল রাখুন। তবে হ্যা ঝুঁকি যত বেশি, লাভবান হওয়ার সুযোগও তত বেশি। শেয়ার বেচার সময় শতকরা ১০ টাকা লাভ হলেই বিক্রি করে দেয়া উচিত। নিম্নে কিছু টিপস দেয়া হলো-
  • পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ একটি সুচিন্তিত, পরিকল্পিত ও বিশ্লেষণধর্মী বিনিয়োগ হতে হবে। 
  • এখানে লাভের যেমন সুযোগ আছে, তেমনি আছে আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকিও। 
  • কোম্পানি/ফান্ডের অতীত, বর্তমান, আর্থিক ফলাফল এবং অবস্থা, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ইত্যাদি নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করে বিনিয়োগ করতে হবে। 
  • বিনিয়োগের আগে পুঁজিবাজারের বিভিন্ন দিক, বিষয়, খুঁটিনাটি সম্পর্কে সঠিক, পর্যাপ্ত তথ্য ও জ্ঞানলাভ করতে হবে। বিনিয়োগের সময় প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষিত আয়-ব্যয়সহ আর্থিক অবস্থা সম্পর্কিত স্বীকৃত কিছু মানদ- বিশ্লেষণ করে দেখতে হয়। ফলাফল বিশ্লেষণ ছাড়া বিনিয়োগে ঝুঁকি বেশি।
বি.দ্র. : এ লেখাটি গত ১৫ আগস্ট দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত হয়েছে (শিল্প-বাণিজ্য পাতা)।

No comments:

Post a Comment