ডেস্ক রিপোর্ট: শুধু ক্রেস্ট নয়, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ১০ ব্রোকারেজ হাউসের সমন্বিত গ্রাহক অ্যাকাউন্টে অর্থ ঘাটতির প্রমাণ মিলেছে। ১৭ হাউস সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার কর্তৃপক্ষ এসব তথ্য পেয়েছে। এগুলোসহ অন্তত ৪০ হাউসে গ্রাহকদের জমা করা অর্থের ঘাটতির তথ্য পাওয়া গেছে। অবশ্য বেশিরভাগ হাউসে তা কোটি টাকার কম। চলিত মাসের মধ্যে সবাইকে ঘাটতি পূরণের নির্দেশ দিয়েছে স্টক এক্সচেঞ্জ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি।
ডিএসই এসব প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানো নোটিশ দেওয়ার পাশাপাশি সংশ্নিষ্টদের তলব করেছে। তবে এ বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কারণে অনেক হাউস ধার করে বা সরিয়ে নেওয়া অর্থ অ্যাকাউন্টে ফেরত দিয়ে ঘাটতি মেটাতে শুরু করেছে বলে জানা গেছে। করোনাকালে ছুটির সময় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং অফিস ভাড়া পরিশোধের জন্য গ্রাহকদের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তোলার কারণে অনেক হাউসের ঘাটতি হয়েছে বলে সংশ্নিষ্টরা দাবি করেছে।
এমন পরিস্থিতিতে গ্রাহকদের অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ সরানো বন্ধ করতে বিনা নোটিশে ব্রোকারেজ হাউস সরেজমিন পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছানাউল হক জানান, রিয়েল টাইমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রাহকদের অর্থ ও শেয়ার যাচাই করতে ব্রোকারেজ হাউস, সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি প্রতিষ্ঠান সিডিবিএল, ব্যাংক হিসাব এবং বিএসইসির সঙ্গে একটি সমন্বিত (ইন্ট্রিগেটেড) সফটওয়্যার চালুর পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
ক্রেস্ট সিকিউরিটিজের মালিক গ্রাহকদের টাকা হাতিয়ে পালানোর পর গত সপ্তাহে ১৭ হাউসে সরেজমিন পরিদর্শন করে ১০টিতে কমবেশি ঘাটতির প্রমাণ মেলে। এ ছাড়া হাউসগুলোর জমা দেওয়া তথ্য বিশ্নেষণ করে আরও দুই ডজনেরও বেশি হাউসে ঘাটতি রয়েছে বলে জানতে পেরেছেন কর্মকর্তারা। হাউসগুলোর সংশ্নিষ্ট ব্যাংক অ্যাকাউন্টের হিসাব পরীক্ষা এবং সরেজমিন যাচাই করা গেলে এ সংখ্যা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।
এদিকে ডিএসই তাৎক্ষণিকভাবে অনেক পদক্ষেপ নিলেও অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) নিয়মিত তথ্য নেওয়ার বাইরে বাড়তি কোনো উদ্যোগ এখনও নেয়নি বলে জানিয়েছেন এক্সচেঞ্জটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মামুন রশীদ। যদিও গত কয়েক বছরে এক্সচেঞ্জটির বেশ কয়েকটি হাউসের বিরুদ্ধে গ্রাহকদের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আসে। এর মধ্যে সিলেট মেট্রোসিটির ঘটনা ছিল বেশ আলোচিত। ওই ঘটনায় গ্রাহকরা তাদের অন্তত ১০ কোটি টাকা ও শেয়ার এখনও বুঝে পাননি।
গ্রাহক হিসাবে ঘাটতি: স্টক এক্সচেঞ্জ সূত্র জানিয়েছে, সর্বাধিক ২১ কোটি টাকার বেশি ঘাটতি থাকার তথ্য মিলেছে এপেক্স সিকিউরিটিজ নামের ব্রোকারেজ হাউসে। এর বাইরে সিনহা সিকিউরিটিজে গ্রাহকদের আট কোটি টাকা নগদ জমা থাকলেও ব্যাংক অ্যাকাউন্টে রয়েছে মাত্র দুই লাখ টাকা। ইউনিক্যাপ সিকিউরিটিজে ঘাটতি ছয় কোটি টাকা।
এপেক্স সিকিউরিটিজের সিইও দিলীপ কাজুরি বলেন, করোনাকালে ছুটির সময় প্রতিষ্ঠানের কোনো আয় ছিল না। কর্মীদের বেতন-ভাতা দিতে গ্রাহকদের টাকা অন্য একটি ব্যাংক হিসাবে নেওয়া হয়। এটা আত্মসাৎ নয়। এরই মধ্যে ওই টাকা গ্রাহকদের হিসাবে ফিরিয়ে আনা হয়েছে বলে তার দাবি। একই রকম দাবি করেন ইউনিক্যাপের সিইও ওয়ালি-উল ইসলাম। তিনি বলেন, গ্রাহকদের দেড়শ' কোটি টাকার মধ্যে ছয় কোটি টাকা ঘাটতি ছিল। বেশিরভাগ ইতোমধ্যে সমন্বয় করা হয়েছে। শিগগির বাকিটুকুও সমন্বয় করা হবে।
ডিএসইর এক পরিচালক বলেন, গ্রাহকদের অর্থ খরচ করার বা অন্য কোনো অ্যাকাউন্টে সরানোর সুযোগ নেই। বছরের পর বছর কিছু হাউস এটা নিয়মিত করছে। প্রায় প্রতিটি সরেজমিন পরিদর্শনে গুরুতর এ অনিয়ম ধরা পড়ছে। বিএসইসি এসব প্রতিষ্ঠানকে নামমাত্র জরিমানা করায় এ অপসংস্কৃতি বন্ধ হয়নি। শুধু ক্রেস্ট নয়, গত একযুগে অন্তত ১০ হাউসে গ্রাহকের বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। গত বছর প্রায় একই ধরনের ঘটনায় ডিএসইর শাহ্ সগীর ব্রোকারেজ হাউস জব্দ করা হয়। হাউসটি বিক্রি করে গ্রাহকের অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা নেয়। ২০১৬ সালে সিএসইর সিলেট মেট্রোসিটিসহ একাধিক হাউসে এমন ঘটনার প্রমাণ মেলে। ২০১৭ সালে একই কারণে এ এক্সচেঞ্জের মোহারাম ও জালালাবাদ সিকিউরিটিজের লেনদেন স্থগিত করা হয়েছিল।
গ্রাহকদের হিসাবে ঘাটতির অভিযোগে গত বছর বেশকিছু ব্রোকারেজ হাউসকে জরিমানা করেছিল বিএসইসি। এর মধ্যে ২০১৮ সালে ডিএসইর এম সিকিউরিটিজে ৭ কোটি এবং ২০১৭ সালে সিএসইর ফার্স্টলিডে প্রায় ১০ কোটি টাকা ঘাটতির তথ্য পেয়ে লাইসেন্স বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

No comments:
Post a Comment