মানবজমিনকে আইএফআইসি’র ইসি চেয়ারম্যান
নেপাল-বাংলাদেশ ব্যাংক লিমিটেডকে (এনবিবিএল) নেপালের শীর্ষ ব্যাংককে পরিণত করতে চান বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন এনবিবিএল ও আইএফআইসি ব্যাংককের নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান লুৎফর রহমান বাদল। তার মতে, বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে এই প্রথম আমি বিদেশের কোন ব্যাংকের চেয়ারম্যান হয়েছি। চেয়ারম্যান হওয়ার পর এ ব্যাংকটির ১৮টি শাখা থেকে বর্তমানে ২৬টি শাখায় উন্নতি করেছি। ব্যাংকটিতে বিনিয়োগ রয়েছে প্রায় ২ হাজার কোটি নেপালি রুপি। গত বছর এটি মুনাফা করেছে ৯০ কোটি রুপি। আশা করছি, আরও দ্রুত ব্যাংকটির প্রবৃদ্ধি হবে। ব্যাংকটিতে আমাদের বিনিয়োগ ছিল মাত্র ৬ কোটি রুপি। এখন এর মূল্য দাঁড়িয়েছে ২০০ কোটি রুপি। এছাড়া কৃষি ঋণ, এসএমই ঋণ ও মহিলা উদ্যোগক্তা তৈরিসহ নতুন নতুন সেবা চালুর ব্যবস্থা করা হয়েছৈ।
সম্প্রতি নেপালের কাঠমান্ডুতে নেপাল ও বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত নেপাল-বাংলাদেশ ব্যাংক লিমিটেডের (এনবিবিএল) চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন লুৎফর রহমান বাদল। তিনি আইএফআইসি ব্যাংকের ইসি কমিটির চেয়ারম্যান ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্য। তিনি ওই ব্যাংকে বাংলাদেশের আইএফআইসি ব্যাংকের প্রতিনিধিত্ব করছেন। ১৯৯৪ সালে আইএফআইসি ব্যাংক ও নেপালের কয়েকজন ব্যবসায়ীর যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় এনবিবিএল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী লুৎফর রহমান ঢাকা-সাংহাই সিরামিকস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং এনটিভি, আরটিভি, এটিএন বাংলা ও ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির পরিচালক। এছাড়া তিনি বহু সামাজিক-সাংস্কৃতিক, ক্রীড়া ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। মানবজমিনের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে ব্যাংকিং খাত, নতুন ব্যাংক কোম্পানি আইন ও এ খাতে দুর্নীতি, পুঁজিবাজারের মন্দাভাব ও নেপাল-বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপকালে উপরোক্ত বিষয়গুলো তুলে ধরেন লুৎফর রহমান বাদল। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এমএম মাসুদ।
মানবজমিন: নেপাল-বাংলাদেশ ব্যাংককে শীর্ষস্থানে নিয়ে যেতে সেদেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থা কি রকম সহযোগিতা করতে পারে বলে মনে করেন?
লুৎফর রহমান বাদল: হ্যা ঠিকই বলেছেন। নেপালের রেগুলেটর খুবই শক্তিশালী। এমনকি বাংলাদেশের চেয়েও। কারণ এখানে কোন ব্যাংককে কোন ধরনের অসংগতি ধরা পড়লে প্রয়োজনে পুরো পরিচলানা পর্ষদকে ফায়ার করে দিয়ে নিয়ন্ত্রণ নেন কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যা বাংলাদেশে এযাবতকালে হয়নি। তবে কোন কোন ক্ষেত্রে সফল হলেও অনেক ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংক তার মূল দায়িত্ব পালনে অনেক সময়ই ব্যর্থ হয়েছে। বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোকে শক্ত হাতে তদারকি করলেও রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে তা করতে পারেনি। এসব বিবেচনায় নিয়ে আশা করছি নেপালের এমন একটা নিয়ন্ত্রক সংস্থার অধীনে কাজ করে এই ব্যাংককে নেপালের শীর্ষস্থানে নিয়ে যাওয়া খুব একটা বেগ পেতে হবে না। প্রয়োজনে লোকাল ব্যাংকের সংঙ্গে যুক্ত হয়ে হলেও আমাদের টার্গেট পুরন করার চেষ্টা করা হবে।
মানবজমিন: নেপালে এনবিবিএল ব্যাংক নিয়ে কি কি পরিকল্পনা রয়েছে?
লুৎফর রহমান বাদল: ১৯৯৪ সাল থেকে আইএফআইসি ব্যাংক ও নেপাল-বাংলাদেশ ব্যাংক যৌথভাবে কাজ করছে। বর্তমানে নেপাল-বাংলাদেশ ব্যাংকে আইএফআইসি ব্যাংকের শেয়ার ২৫% থেকে বেড়ে এখন ৫১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা বাংলাদেশের জন্য গর্ব। এছাড়া শেয়ার আরও বাড়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করা হয়েছে। বিনিয়োগের আবেদন অনুমোদন ছাড় হয়েছে। ডলার নেয়ার আবেদনও চূড়ান্ত। নতুন করে আরও প্রায় ১২৫ কোটি নেপালি রুপি বিনিয়োগ করা হবে। এটি হলে পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় আমাদের ক্ষমতা আসবে। প্রধান নির্বাহী থেকে অনেক জায়গায় বাংলাদেশিরা কাজের সুযোগ পাবেন। এসবের পাশাপাশি আমরা নেপালের পর্যটন খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে চাই। রড ও সিমেন্ট উৎপাদন, রাস্তাঘাট নির্মাণ এবং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ অব্যাহত রয়েছে। আগামীতে এসব খাতে বিনিয়োগ আরও বাড়বে।
মানবজমিন: নতুন ব্যাংক-কোম্পানি আইনে বলা হয়েছে, একজন পরিচালক দুইবারের বেশি (৩ বছর করে) পরিচালনা পরিষদে থাকতে পারবেন না। আপনি কী মনে করেন বিষয়টি যুক্তিযুক্ত?
লুৎফর রহমান বাদল: আমার (একজন পরিচালকের) তৈরি করা সম্পদ আমি কার হাতে দিয়ে যাব। সরেই বা যাব কীভাবে। এমন আইনে ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আইন করে মালিকানা ঠিক করা যায় না। এ আইনটি করা ঠিক হয়নি। একজন পরিচালক ৬ বছর পরিচালনা পর্ষদে থেকে দায়িত্ব পালন করবেন। তারপর তিনি থাকতে পারবেন না। পরিচালকরা আইনটি মানতে বাধ্য হলেও এটি যৌক্তিক নয়। কারণ, আইন করে মালিকানা ঠিক করা যায় না। অন্য একজন এসে ব্যাংকের দায়িত্ব নেবেন, এটি হয় না। কার হাতে পরিচালকরা ব্যাংক দিয়ে যাবেন? আমরা আইন মানতে প্রস্তুত। তবে এই আইনকে আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হতে পারে।
মানবজমিন: ব্যাংকগুলোয় খেলাপি ঋণ বাড়ছে আপনি এটিকে কিভাবে দেখছেন?
লুৎফর রহমান বাদল: ঋণ শ্রেণীকরণ ও প্রভিশনিংয়ের নতুন নীতিমালার ফলে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ কিছুটা বেড়েছে। এতে ব্যাংকগুলোর মুনাফার একটি অংশ প্রভিশন রাখতে হচ্ছে। এটি মুনাফার ক্ষেত্রে সাময়িক প্রভাব ফেললেও দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংক খাত শক্তিশালী হবে। তবে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাংকগুলোর কথা ভিন্ন। নতুন নীতিমালার কারণে এ খাতে স্বচ্ছতা ও সুশাসন আরও বাড়বে বলে মনে করি।
মানবজমিন: শেয়ারবাজারে মন্দা কাটছে না। একজন বিনিয়োগকারী ও ব্যাংকার হিসেবে কি করা উচিত বলে মনে করেন?
লুৎফর রহমান বাদল: আসলে বিনিয়োগকারীরা যতদিন ঋণ করে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে থাকবে ততদিদন মন্দাভাব দূর হবে না। কারণ ঋণের একটা চিন্তা বিনিয়োগকারীর মাথায় থকে সব সময়। তাই এর প্রভাব বাজারে পড়ে। এছাড়া ব্যাংক বিষয়ে বলতে গেলে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের ছোট্ট একটি ক্ষেত্র শেয়ারবাজার। যেসব ব্যাংক এ বাজারে বিনিয়োগ করেছে, তাদের বিনিয়োগটা এখনও সেখানেই রয়েছে। তাই এখনও লাভ বা লোকসান কিছু বলা যাবে না। তবে শেয়ারবাজারে পুঁজি সংকট দূর করতে হবে। এখানে প্রতিদিন প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হচ্ছে। এর ১৫ হাজার কোটি টাকা আটকে আছে ঋণ হিসেবে। সরকার ৯০০ কোটি টাকা দিচ্ছে। কিন্তু ১৫ হাজার কোটি টাকা না থাকায় লেনদেনে আশানুরূপ কোন ফল হচ্ছে না। তাই এ অর্থের ও এর সুদের সুরাহা করতে হবে।
মানবজমিন: অর্থায়নে আইএফআইসি ব্যাংকের ভূমিকা কতটুকু? কোন কোন খাতকে অগ্রাধিকার দেয়?
লুৎফর রহমান বাদল: আমরা যাত্রা শুরু করেছিলাম লিজিং কোম্পানি হিসেবে। এরপর প্রথম প্রজন্মের ব্যাংক হিসেবে যাত্রা শুরু করি। আমরা (বর্তমান পর্ষদ) ২০০৬ সালে দায়িত্ব নিই। এরপর ৭ বছরে যে প্রবৃদ্ধি হয়েছে গত ৩০ বছরে তা হয়নি। আমরা বিদেশে শাখা খুলেছি। প্রধান কার্যালয়ের জন্য সম্পদ কিনেছি। ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। আইএফআইসি ব্যাংক মডেল হিসেবে গড়ে উঠতে চায়। এখানে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ স্বাধীনভাবে কাজ করছে।
এছাড়া আইএফআইসি ব্যাংক তৈরি পোশাক খাতকে পৃষ্ঠপোষকতা করে। একক খাত হিসেবে বেশি বিনিয়োগ করা হয়েছে তৈরি পোশাক শিল্পে। নারী উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ঋণ উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ, জাহাজ নির্মাণ শিল্প ও কুটির শিল্পে অর্থায়ন করে। এ নিয়ে আমাদের বিস্তারিত নীতিমালা রয়েছে-কোন খাতে কিভাবে অর্থায়ন করবো। রানা প্লাজার ঘটনার পর আমরা প্রথম ব্যাংক হিসেবে ফায়ার সেফটি খাতে ঋণ কার্যক্রম হাতে নিয়েছি। অন্য ব্যাংকগুলোও এখন এটি শুরু করতে চাচ্ছে। এ ঋণের সুদ হার ৬ শতাংশ। আমরা লোকসানে এসব ঋণ দিচ্ছি। লোকসান সিএসআর খাত থেকে সমন্বয় করা হচ্ছে।
মানবজমিন: দেশে নতুন করে নয়টি ব্যাংক কার্যক্রম শুরু করছে, একজন উদ্যোক্তা হিসেবে নতুন ব্যাংককে কিভাবে দেখছেন?
লুৎফর রহমান বাদল: নতুন ব্যাংক কার্যক্রম শুরু করলে গ্রাহকরা আরও ভাল সেবা পাবেন। ভাল সেবা দিয়ে গ্রাহক আকর্ষণ করতে হবে। তবে বেশি ব্যাংক হলে এক ব্যাংকের গ্রাহককে অন্য ব্যাংকে নেয়ার জন্য অসুস্থ প্রতিযোগিতা দেখা দিতে পারে। ব্যাংকগুলো আমানত পেতে প্রতিযোগিতা করবে, এটিই স্বাভাবিক।
মানবজমিন: রাজনৈতিক অস্থিরতায় প্রবৃদ্ধির ধারা কি অব্যাহত থাকবে?
লুৎফর রহমান বাদল: ব্যবসায়ীরা শঙ্কায় আছেন। এটাই স্বাভাবিক। কোন সরকার আসবে, নীতি কি হবে? একেক সরকার একেকভাবে দেশ পরিচালনা করে। তাই ব্যবসায়ীরা ঝুঁকিতে যেতে চাইছেন না। বিনিয়োগ কমিয়ে দিয়েছেন। বেড়ে যাচ্ছে অলস টাকা। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমে গেছে। কাঁচামাল আমদানিও কমেছে।
মানবজমিন: সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ
লুৎফর রহমান বাদল: আপনাকেও ধন্যবাদ।
No comments:
Post a Comment