ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি সংরক্ষণে ব্যর্থ বেসরকারি ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড (এনবিএল)। প্রতিষ্ঠানটিতে সঞ্চিতির (Provision) পরিমাণ প্রয়োজনের মাত্র অর্ধেক। কিন্তু সঞ্চিতির এই বিশাল ঘাটতিতেও যেন ব্যাংকটির কোনো ব্যর্থতা বা দায় নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক অতি উদারতার দৃষ্টান্ত দেখিয়ে ঘাটতি পূরণে ৪ বছরের লম্বা সময় দিয়েছে ব্যাংকটিকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী ন্যাশনাল ব্যাংকের নিরাপত্তা সঞ্চিতির প্রয়োজন ছিল ২ হাজার ৭০৩ কোটি টাকা। কিন্তু ২০১৮ সালে ১ হাজার ৪২৪ কোটি টাকা প্রভিশন হিসেবে জমা করেছে ব্যাংকটি। যা প্রয়োজনের চেয়ে ১ হাজার ২৭৯ কোটি টাকা কম। বাকি টাকা পরিশোধে অতিরিক্ত ৪ বছর সময় নিয়েছে এনবিএল।
এ বিষয়ে ন্যাশনাল ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) এএসএম বুলবুল বলেন, এই বছর আমর প্রভিশনের পুরো টাকা রাখতে পারিনি।নিরাপত্তা সঞ্চিতির পুরো টাকা একসাথে রাখতে না পারলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমতি নিতে হয়।আমরাও বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে ৪ বছর বর্ধিত সময় চেয়ে নিয়েছে।ব্যাংকের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় তার আমাদের এই টাকাটা পরিশোধের জন্য অতিরিক্ত সময় দিয়েছে।সমস্ত নিয়ম কানুন মেনেই ব্যালেন্সশিট অনুমোদন করিয়ে নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বিশেষ সুবিধায় মোট চার বছরে এই টাকা পরিশোধ করবে ন্যাশনাল ব্যাংক। চলতি বছরে (২০১৯) অপরিশোধিত টাকার ২০ শতাংশ ও ২০২০ সালে ২০ শতাংশ; পরবর্তী দুই বছর অর্থাৎ ২০২১ ও ২০২২ সালে ৩০ শতাংশ করে জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।
২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে ১৫টি ব্যাংক প্রভিশন ঘাটতিতে পড়েছে। আমানতকারীদের সুরক্ষা দিতে সব ধরনের ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে নির্ধারিত হারে প্রভিশন রাখতে হয়। সাধারণ ঋণের বিপরীতে দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে শুরু করে ৫ শতাংশ পর্যন্ত প্রভিশন রাখার নিয়ম রয়েছে। আর যথাসময়ে আদায় না হওয়া নিম্নমান, সন্দেহজনক এবং মন্দ বা ক্ষতিমানে শ্রেণীকৃত খেলাপি ঋণের বিপরীতে যথাক্রমে ২০, ৫০ ও ১০০ ভাগ প্রভিশন রাখতে হয়। ব্যাংকগুলোর অর্জিত মুনাফা থেকে এ অর্থ রাখতে হয়। প্রভিশন ঘাটতি থাকলে সাধারণভাবে লভ্যাংশ দেওয়ার সুযোগ না থাকলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বিশেষ অনুমোদন নিয়ে অনেক ব্যাংক ধাপে ধাপে প্রভিশন রাখার শর্তে কেউ কেউ লভ্যাংশ দেয়।
গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোর সার্বিকভাবে ৫৭ হাজার ৪৩ কোটি টাকা প্রভিশন সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল। তবে সংরক্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে ৫০ হাজার ৪২৯ কোটি টাকা। এতে করে ঘাটতি দেখা দিয়েছে ৬ হাজার ৬১৪ কেটি টাকা। ১৫টি ব্যাংক ঘাটতিতে থাকলেও বেশ কয়েকটি ব্যাংকে এক টাকাও প্রভিশন উদ্বৃত্ত নেই। এসব ব্যাংক প্রভিশন ঘাটতির ঝুঁকিতে রয়েছে। এর বাইরে কিছু ব্যাংক প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য হলেও বেশি প্রভিশন রাখতে পেরেছে। আর ঘাটতিতে থাকা ১৫ ব্যাংক প্রয়োজনের তুলনায় নয় হাজার ৫২৩ কোটি টাকা কম রাখতে সক্ষম হয়েছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকানার চার ব্যাংকের ঘাটতি সাত হাজার ৮৮৩ কোটি টাকা। বেসরকারি ১১ ব্যাংকে এক হাজার ৬৪০ কোটি টাকা।
এবিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহ উদ্দিন আহমেদ অর্থসূচককে বলেন, এসব সুবিধা আর্থিক খাতের জন্য মোটেও ভালো নয়। এতে করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। আজ যাদেরকে এরকম সুবিধা দেওয়া হয়েছে তাদের দেখে আগামীতে অন্যরাও এই সুবিধা চাইবে। উৎসাহিত হবে ঋণ খেলাপি। আড়ালেই থেকে যাবে ব্যাংকের আসল চিত্র।
এসব সমস্যা সমাধানে ঋণ বিতরণের সময় গুণগত মান যাচাই-বাছাই করার পরামর্শ এই অর্থনীতিবিদের। আর্থিক খাতের রোগ নির্ণয় করে সঠিক চিকিৎসা করা দরকার।এক নাগাড়ে সুবিধা না দিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কঠোর ভূমিকা পালেনের পরামর্শ দেন তিনি।

No comments:
Post a Comment