Saturday, October 30, 2010

গত সপ্তাহের শেয়ারবাজার : কিছুটা সংশোধন, নয়ছয় নয়

নয়ছয় মানে '৯৬। ১৯৯৬ সালের বাজার ধ্বস। পুঁজিবাজার কিছুটা টালমাটাল হলেই যে প্রসঙ্গ ও তুলনা টেনে আনেন বিনিয়োগকারীরা। বাজারকে অতিমূল্যায়িত বলা, এর লাগাম টেনে ধরার চেস্টা, সেই চেস্টা করতে গিয়ে নানা নতুন নিয়ম সামনে আনা এবং বাস্তবায়ন ও এর জটিলতা সব কিছুই করা হচ্ছে, '৯৬ পরিস্থিতি যেন না হয় তা নিশ্চিত করতে। কারণ বিনিয়োগকারীদের অনেকেই সে সময় হাতের সব সম্বল হারিয়েছিলেন।

'৯৬ এর পর একদিনে বড় ধরণের পতন হয় এবছরের আগস্টে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সাধারণ সূচক ২০৫ পয়েন্ট বা ৩ দশমিক ১৯ শতাংশ কমে যায়। সূচক আরো ২৮ বা ৩০ নামলেই '৯৬ সালের ৫ নভেম্বরের রেকর্ড ছুঁয়ে যেতো। সেদিন সূচক কমেছিলো ২৩৩ পয়েন্ট বা ৬ শতাংশের বেশি। তবে, দুটি সূচক পতনের চরিত্রের মধ্যে ব্যবধান বিস্তর। '৯৬ এ দরপতন হয়ে ছিলো প্রায় ৬ শতাংশ, যেখানে সার্বিক মূল্যসূচক ছিলো তিন হাজারের বেশি। গত আগস্টে দরপতন হলো ৩ শতাংশ যেখানে সার্বিক সূচক ছিলো ৬ হাজারেরও বেশি। মনোযোগ দেয়ার বিষয় হলো, এর পরদিনই বাজার ঘুরে দাঁড়ায়। আতঙ্ক বা যে কোন কারণেই এই দরপতন হোক না কেন, বাজার ঘুরে দাঁড়ানোর বিষয়টি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। আর এর সঙ্গে '৯৬ ভীতিও কেটেছে অনেকখানি। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মুখে মুখে ফিরছে, বাজার পড়লেও নয়ছয় মানে '৯৬ হবে না। বাজার বিশ্লেœষক এবং বিশেষজ্ঞরাও এখন বলছেন, ৯৬ পরিস্থিতি হবে না। ইলেকট্রনিক লেনদেন, বেশি মানুষের অংশগ্রহণ, সরকারি নজরদারি, উন্নত ব্যবস্থাপনা-এমন নানা বিষয় বাজারের শক্ত অবস্থানের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন বিশ্লেষকরা। এখন প্রশ্ন উঠে, তাহলে বাজার ঝুঁকিপূর্ণ বলা হয় কেন?

বিশ্লেষকদের মতে, যত টাকা হওয়া উচিত নয়, তারচেয়ে বেশি দাম উঠে আছে অনেক কোম্পানির শেয়ারের। সেগুলোতে ক্রয় করতে হচ্ছে অনেক টাকায়। এই অতিমূল্যায়ন যদি হঠাৎ একদিনে কমে যায়, তবে তখন যারা বাজারে থাকবেন তারা প্রচুর টাকা হারাবেন। এখন যেহেতু অনেক বিনিয়োগকারী বাজারে, তারা রাজধানী, বিভাগীয় শহর বা জেলা শহরে বসেই বিনিয়োগ করছেন, ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তাই এই সতর্কতা।

এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা, যারা বাজারের চরিত্র ও অংকের হিসাব না বুঝেই নেমে যান কাড়ি কাড়ি টাকা নিয়ে, তাদের। তাই বাজারের কিছুটা সংশোধন অনেকেই চান। বেশ জোরেসোরে যারা সংশোধন চান তাদের মধ্যে আর্থিকখাতের দুই গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) ও বাংলাদেশ ব্যাংক অন্যতম। মার্চেন্ট ব্যাংক বা বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউজের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেক কর্মকর্তাই মনে করেন, আচমকা বড় ধরণের দরপতনের চেয়ে সংশোধন অনেক নিরাপদ। এবার অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও বাজারের মূল্য সংশোধনের কথা বললেন। অর্থমন্ত্রীর মতে, সরকার চায় বাজার কিছুটা সংশোধন হোক। তবে সংশোধনটা হতে হবে নিম্নগতিতে।

অর্থাৎ আচমকা বা দ্রুত বাজারপতন মোটেও কামনা করেন না অর্থমন্ত্রী। এছাড়াও অর্থনৈতিক সাংবাদিকদের সংগঠন ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের বা ইআরএফ'র সঙ্গে মত বিনিময়ে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, শেয়ারবাজারে তেজিভাব থাকলেও তা অতিমূল্যায়িত নয়।

বলার অপেক্ষা রাখেনা, তার এ কথা বিনিয়োগকারীদের আস্থার মাত্রা আরো বাড়াবে। বিনিয়োগকারীদের একজনও বাজারের দ্রুত নিম্নগতি কল্পনা করতে চান না। বাজার যখন বাড়ে, নগদ মুনাফা পকেটে আসে, তখন খুশীই হন বিনিয়োগকারীরা। বলাবাহুল্য বাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে যথেস্ট সচেতন আছেন, অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, বাজারে প্রচুর লোক, আর প্রচুর টাকা। কিন্তু কেনার তেমন কোনো শেয়ার নেই। শেয়ার সরবরাহ বাড়ানোটা তাই জরুরি বলে মনে করেন তিনি। তার এই কথা থেকে বাজারে শেয়ারের সরবরাহ বাড়াতে সরকার আন্তরিক বলেই ধারণা করছেন বিনিয়োগকারীরা। শুধু নিয়ন্ত্রণ আর নিয়মের বেড়াজালে বেঁধে বাজার সংশোধনের উদ্যোগ থেকে, এবার বোধকরি সরে আসবে কর্তৃপক্ষ। বিনিয়োগকারীরাও আশা করছেন শেয়ারের সরবরাহ এবার বাড়বে। অবশ্য এরইমধ্যে আইপিও বাজারে আনার নিয়ম বেশ খানিকটা শিথিল করেছে এসইসি।

সরকারি কোম্পানির শেয়ার: নতুন উদ্যোগ
সরকারি কোম্পানির শেয়ার বাজারে ছাড়ার বিষয়টি এবার নতুন মাত্রা পেলো। নতুন একটি উদ্যোগও দেখা গেলো অর্থমন্ত্রণালয়ের তরফে। গত সপ্তাহে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত জানিয়েছেন, শিগগিরই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি তালিকা পাঠানো হবে। প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন দিলেই এগুলোর শেয়ার আসবে বাজারে। গত সোমবার সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ছাড়া সংক্রান্ত এক পর্যালোচনা বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত আসে।

বহুল আলোচিত ২৬ সরকারি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের বাইরে সরকারি মালিকানাধীন কয়েকটি কোম্পানি এবং সরকারের হাতে থাকা কয়েকটি কোম্পানির শেয়ার আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই বাজারে ছেড়ে দেওয়া হবে বলে আশাবাদী অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, যে কোম্পানিগুলো ইতোমধ্যেই বাজারে তালিকাভুক্ত, সেগুলোর শেয়ার ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত। বাকিদের ব্যাপারে একটু সময় লাগবে। এ হিসেবে শিগগিরই বাজারে যোগ হতে পারে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন বা বিএসসি, রেকিট অ্যান্ড বেনকিজার, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানি বা বিএটি, বাংলাদেশ সার্ভিসেস লিমিটেড বা শেরাটন হোটেল, পদ্মা অয়েল, ডেসকো ও পাওয়ার গ্রিড। কেননা এগুলো এরইমধ্যে বাজারে তালিকভূক্ত এবং সরকারের হাতে এসব কোম্পানির শেয়ার আছে। সরকারের এই উদ্যোগ পুঁজিবাজারের ঝুঁকি কিছুটা হলেও কমাবে এতে কোন সন্দেহ নেই।

এর আগে চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, এ বছরের জুন মাসের মধ্যে সরকারি ২৬টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বাজারে নিয়ে আসার। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সভাপতিত্বে সচিবালয়ে এক বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সেই বৈঠকে সংশ্লিষ্ট ২৬টি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। বলা হয়েছিলো, কোম্পানির ৫১ ভাগ শেয়ার সরকারের হাতে রেখে বাকী ৪৯ ভাগ শেয়ার পর্যায়ক্রমে নিয়ে আসা হবে, বাজারে। কিন্তু অক্টোবর পার হতে বসেছে, বাস্তবায়ন হয়নি সেই সব সিদ্ধান্তের। এদিকে, প্রতিদিনই বাজার বাড়ছে সূচকে, মূলধনে । এই পরিস্থিতিতে বিদ্যমান শেয়ারগুলোরই দাম ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বাড়ছে।

এদিকে, বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারি লাভজনক কোম্পানির শেয়ার বাজারে এলে মুনাফা অনেক মানুষের মাঝে ভাগ হবে। বাজারের ও চাহিদা ও সরবরাহের একটি ভারসাম্য আসবে।

আর্থিকখাতে শৃঙ্খলা : কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন উদ্যোগ
পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ নিরাপদ রাখতে এর আগেও উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিনিয়োগসীমা আমানতের ১০ ভাগে নামিয়ে আনার নির্দেশ দেয়া হয়েছে তখন। অবশ্য সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অতিরিক্ত বিনিয়োগে অভিযুক্ত ব্যাংকগুলোকে নভেম্বর পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এবার পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ ঝুঁকি কমাতে ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের বিপরীতে প্রভিশন আরো এক শতাংশ বাড়ালো বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আগে পুঁজিবাজারে কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিকে দেওয়া, খেলাপি নয় এমন ঋণের বিপরীতে ১ শতাংশ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হতো। নতুন নির্দেশনায় এক্ষেত্রে দুই শতাংশ প্রভিশন বাধ্যতামূলক করা হয়। নতুন নির্দেশনা মেনে নির্দিষ্ট ছকে বাংলাদেশ ব্যাংককে অবহিত করতে হবে ব্যাংকগুলোকে। ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ থেকে এক সার্কুলারে এসব নতুন নির্দেশনা দেয়া হয়। পুঁজিবাজারে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের ঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনায় আনা হয়েছে বলে সার্কুলারে উল্লেখ করা হয়েছে।

জানা গেছে, এপ্রিল মাসে ব্যাংকগুলোর জিম্মায় থাকা শেয়ারের মূল্য ছিল চার হাজার ৪৪৬ কোটি ১৪ লাখ টাকা। মে মাসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৬৬১ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক্ষেত্রে জিম্মায় থাকা শেয়ারের মূল্য বেড়েছে ছয় হাজার ১৮৫ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। এর অর্ধেক মার্জিন ঋণ ধরলে, মাত্র এক মাসের ব্যবধানে পুঁজিবাজারে মার্জিন ঋণ হিসেবে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ বেড়েছে তিন হাজার ৯৪ কোটি ৮১ লাখ টাকা। এ ছাড়া ব্যাংকগুলোর শেয়ার জামানত হিসেবে রেখে বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ মে মাসে বেড়ে দাঁড়িয়েছে পাঁচ হাজার ৫৩০ কোটি ৭০ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে পুঁজিবাজারে ব্যাংকগুলোর এক্সপোজারের পরিমাণ হতে পারে প্রায় ১২ হাজার ২৭৮ কোটি ৩০ হাজার টাকা।

সার্কুলারে বলা হয়েছে, ব্যাংকের বিনিয়োগ ঝুঁকি কমাতে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ব্যাংকের অনেক নির্বাহীই মনে করেন, শেয়ার বাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ কমাতে এই নতুন উদ্যোগ নেওয়া হলো। নতুন নিয়ম অনুযায়ী বছর শেষে বা ডিসেম্বরের ৩০ তারিখের এক্সপোজার বিবেচনায় আনা হবে বলে জানিয়েছেন একটি ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা। ফলে সে তারিখে এক্সপোজার কম দেখাতে ব্যাংকগুলোর জিম্মায় থাকা শেয়ার বিক্রি বেড়ে যেতে পারে। ব্যাংকগুলো এই চর্চা করলে, ডিসেম্বরে শেয়ার বিক্রির চাপ বেড়ে যাওয়ায় বাজারে একটা প্রভাব পড়তে পারে। এমনকি তা শুরু হতে পারে নভেম্বর থেকেও। এক্ষেত্রে, পুরো বছর বেশি বিনিয়োগ করে, বছর শেষে বিনিয়োগ কমিয়ে আনার প্রবণতা দেখাতে পারে ব্যাংকগুলো। যার প্রভাব ঋণনির্ভর বিনিয়োগকারীদের ওপর পড়তে পারে।

আনোয়ার সাদী, দৈনিক ইত্তেফাক, ৩০ অক্টোবর, ২০১০।

No comments:

Post a Comment