ডিএসইতে সূচক ৮ হাজার পয়েন্ট ছুঁই ছুঁই
৩ হাজার ২৮৬ কোটি টাকার রেকর্ড লেনদেন
৩ হাজার ২৮৬ কোটি টাকার রেকর্ড লেনদেন
পুঁজিবাজারের ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত থাকায় বৃহস্পতিবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) ২ হাজার ৯৪৬ কোটি টাকার রেকর্ড লেনদেন হয়েছে। একই সঙ্গে ডিএসইর বাজার মূলধন, দৈনিক লেনদেন এবং সূচকের ক্ষেত্রে সৃষ্টি হয়েছে নতুন রেকর্ড। ডিএসইতে সাধারণ মূল্যসূচক আগের দিনের চেয়ে ৮৮ দশমিক ৪৯ পয়েন্ট বেড়ে ৭ হাজার ৯৩৭ দশমিক ৪ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।
ধারাবাহিক উর্ধগতির ফলে ঝুঁকির মাত্রা বৃদ্ধি, নিয়ন্ত্রক সংস্থার একের পর এক পদক্ষেপ এবং বাজার সংশ্লিষ্টদের ও সম্প্রতি দুই স্টক এক্সচেঞ্জের সভাপতিদ্বয়ের সতর্কতা কোন কিছুতেই থামছে না লাগামহীন শেয়ারবাজারের ছুটে চলা। এ ধরনের রেকর্ডে সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (এসইসি) আরও শঙ্কিত করে তুলছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে এসইসির নেয়া সব পদক্ষেপই ব্যর্থ হচ্ছে। মাত্র একদিন আগে মঙ্গলবার ডিএসইতে ২ হাজার ৮শ ৩৬ কোটি টাকার রেকর্ড লেনদেন হয়েছে। এর আগে ৭ অক্টোবর ডিএসইতে রেকর্ড লেনদেন হয়েছে ২৮০১ কোটি টাকা।
শুধু ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জেই (ডিএসই) নয়, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) ৩৪০ কোটি ৪৭ লাখ ২৪ হাজার কোটি টাকার রেকর্ড লেনদেন হয়েছে। দুই শেয়ারবাজার মিলে লেনদেনের পরিমাণ ৩ হাজার ২৮৬ কোটি টাকা, যা অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় সর্বোচ্চ। ডিএসই এবং সিএসইতে লেনদেনের পাশাপাশি সূচক এবং বাজার মূলধনেও নতুন রেকর্ড হয়েছে কাল। সবমিলিয়ে ৮টি নতুন রেকর্ড হয়েছে বৃহস্পতিবার।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, নানা কারণে লাগামহীনভাবে ছুটে চলেছে দেশের শেয়ারবাজার। এসব কারণের মধ্যে রয়েছে বাজারে শেয়ারের স্বল্পতা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত বিনিয়োগ, অন্য খাতের জন্য দেয়া ঋণ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ, গ্যাস-বিদ্যুত সঙ্কটের কারণে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের সুযোগ কমে যাওয়া, সেকেন্ডারি মার্কেটের প্রতি শিল্পোক্তাদের ঝোঁক, নতুন নতুন মিউচ্যুয়াল ফান্ড গঠন, মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসের মাত্রাতিরিক্ত ঋণ বিতরণ, গত অর্থবছরে কালো টাকার শর্তহীন বিনিয়োগের সুযোগ এবং ব্যাংক আমানত ও সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমে যাওয়া। বিনিয়োগের বিকল্প ক্ষেত্র হিসেবে পুঁজিবাজারকে বেছে নিচ্ছে বিপুল সংখ্যক মানুষ। প্রতিদিনই নতুন নতুন বিনিয়োগকারী শেয়ারবাজারে আসছেন। অব্যাহতভাবে বাড়ছে তারল্য। এর ফলে একদিকে লেনদেনের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে নতুন শেয়ারের যোগান না থাকায় বাড়ছে তালিকাভুক্ত বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ারের দর। আর এরসঙ্গে বাজারে সক্রিয় সিন্ডিকেটের কারসাজি তো আছেই। সব মিলিয়ে প্রতিদিনই আরও ফেপে উঠছে পুঁজিবাজার। বাজারের এই পরিস্থিতিতে শুধু নিরপেক্ষ বিশ্লেষকরাই নন, খোদ নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ এ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনও (এসইসি) এবং দুই স্টক এক্সচঞ্জের পক্ষ থেকে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, ব্যাপক তারল্য প্রবাহের কারণে বাজারে এত রেকর্ড হয়েছে। তাদের মতে, সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংক আমানতের সুদহার হ্রাস, শিল্প খাতে বিনিয়োগে গতিহীনতা এবং ব্যাংকের হাতে থাকা ব্যাপক উদ্বৃত্ত অর্থের কারণে বাজারে তারল্য বেড়েছে। এছাড়া ঊর্ধ্বমুখী বাজারে প্রতিনিয়ত যুক্ত হচ্ছে অসংখ্য নতুন নতুন বিনিয়োগকারী।
বাজার সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সালাহউদ্দিন আহমেদ খান বলেন, শিল্প ও বাণিজ্য খাতে বিনিয়োগ নেই, ব্যাংকগুলোর কাছে অসল টাকা, মানুষের হাতে প্রচুর নগদ টাকা। এসব অর্থ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ হওয়ায় এমন লাগামহীন হয়ে ওঠেছে বাজার।
এদিকে অধিকাংশ শেয়ারের দরবৃদ্ধির কারণে পুঁজিবাজারের সামগ্রিক মূল্য-আয় অনুপাত (পিই রেশিও) সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এতে বিনিয়োগকারীর ঝুঁকি বৃদ্ধি পেলেও নতুন বিনিয়োগকারীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এদিকে, চাহিদার তুলনায় বাজারে শেয়ার সঙ্কটের কারণে পুঁজিবাজারে স্বাভাবিক সংশোধন হচ্ছে না। ফলে সব ধরনের সূচকের পাশাপাশি বাজার মূলধন বেড়ে চলেছে। এতে করে লেনদেনে একের পর এক রেকর্ড সৃষ্টি হচ্ছে। বিনিয়োগকারী বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাজারে শেয়ার সরবরাহ না বাড়ালে খুব শিগগির পুঁজিবাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে বাজার বিশ্লেষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এছাড়া, অস্বাভাবিক রেকর্ডের কারণে এসইসি হতাশা প্রকাশ করেছে। পাশাপাশি বাজার নিয়ন্ত্রণে নতুন কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করার কথা জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদ বলেন, বাজারে প্রতিদিন নতুন বিনিয়োগকারী আসছেন। ব্রোকারেজ হাউজগুলোতে প্রতিদিন শত শত নতুন অ্যাকাউন্ট খোলা হচ্ছে। ফলে বাজারে তারল্য প্রবাহ বাড়ছে। তিনি জানান, বাজারে শেয়ার সরবরাহের তুলনায় তারল্য বেশি হওয়ায় শেয়ারের দাম বাড়ছে। ফলে লাভজনক হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা এ বাজারের দিকে ঝুঁকছেন।
এরকম পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকরা ধারনা করছেন, শেয়ারবাজারের মতো ফটকা বাজারের সীমাহীন উর্ধগতি দেশের অর্থনীতির জন্য বুমেরাং হতে পারে। তাদের মতে, শেয়ার সরবরাহ বাড়িয়ে দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না নিলে যে কোন সময় এই ব্যাস্ট হয়ে যেতে পারে। আর এতে হঠাৎ করেই রাস্তার ফকিরে পরিণত হতে পারে মোটা লাভের স্বপ্ন নিয়ে শেয়ারবাজারে আসা লাখ লাখ বিনিয়োগকারী। সে ধরনের অনাকাঙ্গক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে শেষ পর্যন্ত তা রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হবে। যার দায় দায়িত্ব গিয়ে পড়বে ক্ষমতাসীন সরকারের ওপর।
ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে শেয়ারবাজার : চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভাল শেয়ার বাড়াতে না পারায় পুঁজিবাজারে অধিকাংশ কোম্পানির বাজার মূল্য ও আয়ের (পিই) অনুপাত ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ফলে এসব কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। চলতি বছরের জুলাই মাসে ডিএসইর তালিকাভুক্ত সব কোম্পানির গড় পিই অনুপাত ছিল ২৪.৫৫। সর্বশেষ গত সপ্তাহে এই অনুপাত ২৭.৬০-এ দাঁড়ায়। চলতি সপ্তাহে অধিকাংশ শেয়ারের দর যে হারে বেড়েছে তাতে পিই অনুপাত ইতোমধ্যেই ২৯-এর কাছাকাছি পৌঁছে গেছে বলে ধরে নেয়া যায়। আন্তর্জাতিকভাবে শেয়ারবাজারের পিই অনুপাত ১৫-এর নিচে থাকলে তাকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়া হয়। এর উপরে উঠলেই শেয়াবাজারে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, বৃহস্পতিবার ডিএসইতে ২৩৭টি কোম্পানির শেয়ার লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে দর বেড়েছে ১৩০টির, কমেছে ১০৬টির। আর ১টি কোম্পানির শেয়ারের দর ছিল অপরিবর্তিত। লেনদেনের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৯৪৬ কোটি ৩৭ লাখ ১৪ হাজার ২৭৪ টাকা, যা আগের দিনের চেয়ে ৪০১ কোটি ৮২ লাখ টাকা বেশি। ডিএসইর সাধারণ মূল্যসূচক আগের দিনের চেয়ে ৮৮ দশমিক ৪৯ পয়েন্ট বেড়ে ৭ হাজার ৯৩৭ দশমিক ৪ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। বাজার মূলধন ৩ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। অন্যদিকে সিএসইতে বৃহস্পতিবার ১৮৭টি কোম্পানি লেনদেনে অংশ নিয়েছে। এর মধ্যে দাম বেড়েছে ৯৯টি কোম্পানির, কমেছে ৭৯টির। সিএসই সার্বিক মূল্যসূচক আগের দিনের চেয়ে ১৫৮ দশমিক ৬০ পয়েন্ট বেড়ে ১৪ হাজার ৬৮২ দশমিক ২৪ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে। লেনদেনের পরিমাণ ৩৪০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
এদিকে সোমবার ইকোনমিকস রিপোর্টার্স ফোরামের এক অনুষ্ঠানে শেয়ারবাজার সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী যে বক্তব্য রেখেছেন তাও বিনিয়োগকারীদের উজ্জীবিত করেছে। বাজার অতি মূল্যায়িত এমন একজন সাংবাদিকের প্রশ্নের সঙ্গে একমত না হয়ে অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, বাজার অতিমাত্রায় চাঙ্গা। এছাড়া বাজারে ছিয়ানব্বইয়ের পুনরাবৃত্তির কোনো আশঙ্কা নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন। বাজার পরিস্থিতি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের ভেতর সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা উদ্বেগ থাকলেও অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে তা অনেকটাই কেটে যায়। এর প্রভাব পড়েছে বাজারে।
এদিকে বৃহস্পতিবার ডিএসইতে যেসব কোম্পানির শেয়ার সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে সেগুলো হলো- সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, তিতাস গ্যাস, পিপলস লিজিং ফাইন্যান্স এন্ড সার্ভিসেস লি., বেলিজিং, শাইনপুকুর সিরামিকস, প্রাইম ফাইন্যান্স, ইউনিয়ন ক্যাপিটাল, ইউসিবিএল, এবি ব্যাংক ও বেক্সিমকো লি.। যেসব কোম্পানির দর সবচেয়ে বেশি বেড়েছে সেগুলো হলো- সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, মুন্নু সিরামিকস, ফার্স্টলিজ ইন্টারন্যাশনাল, মিথুন নিটিং, শাইনপুকুর সিরামিকস, এপেক্স ট্যানারি, এপেক্স এডালচি ফুটওয়্যার, ইস্টার্ন ব্যাংক, ঢাকা ইন্স্যুরেন্স ও প্রিমিয়ার লিজিং। এছাড়া ডিএসইতে যেসব কোম্পানির শেয়ার সবচেয়ে বেশি কমেছে সেগুলো হলো- মালেক স্পিনিং, মিরাক্যাল ইন্ডাষ্ট্রিজ, ইমাম বাটন, ন্যাশনাল টি কোম্পানি, ৩য় আইসিবি, এসিআর ফরমুলেশন, তাল্লু স্পিনিং. দুলামিয়া কটন, ন্যাশনাল টিউবস ও দেশ গার্মেন্টস।
No comments:
Post a Comment