Wednesday, January 5, 2011

পুঁজিবাজারে ৩ দিনে ১৩ হাজার কোটি টাকা উধাও: দরপতনে আবারও বিক্ষোভ, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, জলকামান ব্যবহার ও টিয়ার সেল নিক্ষেপ

টানা তৃতীয় দিনের মতো দেশের প্রধান পুঁজিবাজারে দরপতনের প্রতিবাদে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সামনে বিনিয়োগকারীরা বিক্ষোভ, যানবাহন ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে। অন্যদিকে বিােভকারীদের হঠাতে পুলিশ লাঠিচার্জ, টিয়ার সেল নিক্ষেপ ও জলকামান ব্যবহার করেছে। এ ঘটনায় ডিএসইর সামনের সড়কে প্রায় আড়াই ঘন্টা যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকে। এলাকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য বিপুল সংখ্যক র‌্যাব-পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। গত তিনদিন ধরে টানা শেয়ারেরবাজারে দরপতনের প্রতিবাদে বিনিয়োগকারীরা বিক্ষোভ শুরু করলে এই অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
অপর দিকে তিন দিনে ৩৫৬ পয়েন্ট সূচক কমেছে এবং লেনদেন হওয়া বেশির ভাগ কোম্পানির শেয়ারের দাম কমায় বাজার মূলধন কমেছে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা।

এদিকে বুধবার সকাল ১১টায় দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেন শুরু হওয়ার আধা ঘন্টার মধ্যে সাধারণ মূল্যসূচক ১২০ পয়েন্টের বেশি নেমে যায়। এসময় ২০৮টি কোম্পানির শেয়ারের দাম কমে, দাম বাড়ে মাত্র ২৯টির। এরপর বেলা ১১টা ৩৭ মিনিটে বিনিয়োগকারীরা রাস্তায় নেমে আসে। এ সময় কিছু বিনিয়োগকারী ডিএসইর সামনের রাস্তায় টায়ার দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। দুপুর ১২টার দিকে বিনিয়োগকারীরা ডিএসই ভবনে ঢুকতে চাইলে পুলিশ বাধা দেয়। পরে ক্ষুব্ধ বিনিয়োগকারীরা মিছিল নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কার্যালয়ে ঢুকতে চাইলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। এ সময় বিনিয়োগকারীরা পুলিশকে ল্য করে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে এবং কয়েকটি বাস ও কার গাড়ি ভাংচুর করে।

বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, ডিএসইতে শেষ পর্যন্ত সুচক পতনের মধ্য দিয়েই বুধবারের লেনদেন শেষ হয়েছে। আগের দিনের চেয়ে সাধারণ সূচক ৩২ পয়েন্ট কমে ৭৯৪৮ পয়েন্ট দাঁড়িয়েছে। এদিন ডিএসইতে বেশিরভাগ শেয়ারের দরপতন হলেও লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ২৯ কোটি টাকা। ডিএসইতে ২৪৩টি কোম্পানির লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে দর কমেছে ১৫৮টির এবং বেড়েছে ৮০টি কোম্পানির শেয়ার ও অপরিবর্তিত ছিল ৫ কোম্পানির শেয়ারের দর।
জানা গেছে, সোমবার ও মঙ্গলবার ডিএসই সাধারণ সূচক ১১৯ পয়েন্ট, ২০৩ পয়েন্ট এবং বুধবার ৩২ পয়েন্টের বেশি কমেছে। তিনদিনে ডিএসই সাধারণ সূচক মোট ৩৫৬ পয়েন্ট কমে যায়। এভাবে কমে যওয়াতে বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, লেনদেন শুরুর কয়েক মিনিটের মধ্যেই শেয়ারবাজারের মূল্যসূচকে বড় ধরনের দরপতন ঘটতে শুরু করে। টানা দুই দিন দরপতনের পর গতকাল বড় ধরনের ধসের আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা লেনদেন ছেড়ে দলে দলে রাস্তায় নেমে আসেন। একপর্যায়ে কয়েক হাজার বিনিয়োগকারী জড়ো হয়ে ডিএসইর সামনে মতিঝিলের শাপলা চত্বর থেকে ইত্তেফাক মোড় পর্যন্ত সড়কটি অবরোধ করে বিােভ প্রদর্শন করতে থাকেন। এ সময় তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনরের বিরুদ্ধে সেøাগান দিতে থাকেন। গভর্নর ছাড়াও, ডিএসই ও এসইসি’র প্রধানদের পদত্যগ দাবি করে সেøাগান দিয়ে মিছিল করতে থাকে বিােভকারীরা। জুতা হাতেও মিছিল করে বিােভকারীরা। তাদের মিছিলের কারণে ডিএসই সংলগ্ন মতিঝিলের ব্যস্ত ওই সড়কে গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। মধুমিতা সিনেমা হলের সামনের সড়কে কাগজ স্তুপ করে তাতে আগুন ধরিয়ে দেন বিােভকারীরা। অবস্থা খারাপের দিকে এগোতে থাকলে ১টার দিকে র‌্যাবের একটি টিম ঘটনাস্থলে চলে আসেন।
দফায়-দফায় বিােভ চলতে থাকলে পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যরা সেখানে অবস্থান নেয়। প্রায় দুই ঘণ্টা বিােভের পর ১টা ৫২ মিনিটে একটি জল কামানের গাড়ি সেখানে পৌঁছে। এরপরই পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যরা একশনে যায়। হঠাৎ করেই জলকামান থেকে রঙ্গিন পানি ছোড়া শুরু হয়। একই সঙ্গে চলে লাঠিপেটা। বিােভকারীর ছোটাছুটি করে আশপাশের ভবনগুলোর ছাদে উঠে পড়েন। সেখান থেকে পুলিশকে ল্য করে ইট পাটকেল ছোড়া শুরু করে। পুলিশও তাদের লক্ষ্য করে কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। প্রায় ২০ মিনিট ধরে এভাবে চলার পর পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসে। দুপুর সোয়া ২টার পর মতিঝিল এলাকায় যান চলাচল শুরু হয়।

বেলা দেড়টার দিকে বিনিয়োগকারীদের সংগঠন শেয়ার মার্কেট ইনভেস্টর্স ফোরামের মোস্তাফিজুর রহমান, ফয়সাল আহমেদ ও শাহনেওয়াজ জুয়েলের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল দরপতন নিয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপরে সঙ্গে আলোচনা করতে যায়। তারা মিডিয়ার প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়ে আলোচনায় বসার দাবি জানালে ডিএসই কর্তৃপ তাতে অস্বীকৃতি জানায়। প্রায় ১ ঘন্টা বসে থাকার পর প্রতিনিধি দল বাইরে চলে আসে।

তারা জানায়, পুঁজিবাজার নিয়ে যারা কারসাজি করছে তাদের বিচার করতে হবে। তারা আরও বলেন, কারসাজির সাথে জড়িতদের শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়ের বিষয়টি তদন্ত করতে হবে। শেয়ার বাজার নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিরূপ মন্তব্য করায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমানের পদত্যাগও দাবি করেন তারা। পুঁজিবাজারের সার্বিক স্বার্থ রায় এসইসি, দুই স্টক এক্সচেঞ্জ ও বাংলাদেশ ব্যাংকে একত্রিত হয়ে বৈঠকে বসার আহ্বান জানান তারা।

পুঁজিবাজারে ৩ দিনে ১৩ হাজার কোটি টাকা উধাও: পুঁজিবাজারে অব্যাহত দরপতন হওয়ায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সামনে বিনিয়োগকারীরা বিক্ষোভ করেছে। বুধবার ১১টায় শেয়ারবাজারে লেনদেন শুরু হওয়ার আধা ঘন্টার মধ্যে সাধারণ মূল্য সূচক আগের দিনের তুলনায় ১২০ পয়েন্টের বেশি কমে যায়। এরপর বিনিয়োগকারীরা মতিঝিল, বাংলাদেশ ব্যাংক, ইত্তেফাক এবং ডিএসইর সামনে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ শুরু করেন। অবশ্য দুপুরের দিকে বাজার আবার ঊর্ধমূখী হতে থাকে। দিন শেষে ডিএসই সাধারণ সূচক ৩২ পয়েন্ট পতন হয়। এর আগের দুইদিনে (সোম ও মঙ্গলবার) ডিএসই ৩২৪ পয়েন্টের বেশি কমেছে। এই তিন কার্যদিবসে ৩৫৬ পয়েন্ট সূচক কমেছে। অন্যদিকে গত ৩ দিনে লেনদেন হওয়া বেশির ভাগ কোম্পানির শেয়ারের দাম কমায় বাজার মূলধন কমেছে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা। এদিন লেনদেন হওয়া বেশিরভাগ কোম্পানির দর কমেছে। আগের দিনের চেয়ে ১২৬ কোটি ৫২ লাখ টাকা কম লেনদেন হয়। ধারাবাহিক দরপতনের কারণে বুধবার বাজারে বড় ধরনের বিােভ মিছিল ও ভাঙচুর হয়। 

পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজারে তারল্য সঙ্কট কাজ করছে। মবিল যমুনার আইপিও চলছে। এময় অনেকেই শেয়ার বিক্রি করে আইপিওতে আবেদন করছে। এছাড়া মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো তাদের ঋণ কমিয়ে রেখেছে। ফলে বাজারে স্বাভাবিক দর সংশোধন হয়েছে। গত এক বছরে বাজার যে হারে বেড়েছে তার তুলনায় এ ধরনের দর সংশোধন হওয়া স্বাভাবিক।

এদিকে পুঁজিবাজারে অবস্থা সম্পর্কে ডিএসইর প্রেসিডেন্ট শাকিল রিজভী সাংবাদিকদের জানান, গত কয়েকমাসে পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত অধিকাংশ শেয়ারের দর বাড়ায় সূচক অনেক বেড়ে গেছে। এখন সেটা সংশোধন হতেই পারে। কিন্তু সংশোধন হলেই বিনিয়োগকারীরা বিক্ষোভ মিছিল করবে সেটা ঠিক নয়। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একটি বদ্ধমুল ধারণা জন্মেছে যে, বিক্ষোভ মিছিল করলেই শেয়ারের দর বাড়বে। তাদের এ ধারণা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। এ ধরণের বিক্ষোভের ফলে পুঁজিবাজার নিয়ে দেশে বিদেশে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হবে। এতে নতুন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার হবে, ফলে তারা পুঁজিবাজারে আসবে না।

অপর দিকে পুঁজিবাজার পরিস্থিতি নিয়ে এসইসির একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, পুঁজিবাজার ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) ঋণ সুবিধা বৃদ্ধি, সম্পদ মূল্য বিবেচনায় ঋণ প্রদানের বিষয়টি স্থগিত, মেম্বারস মার্জিন বাতিলসহ বেশ কিছু পদক্ষেপ ইতোমধ্যেই নিয়েছে। এরপরও দরপতন হলে এসইসির কি করার আছে। তবে গত কয়েক মাসে অব্যাহত উর্ধ্বগতির ফলে পুঁজিবাজারের বিনিয়োগ পরিস্থিতি অনেক ঝুকির মধ্যে চলে গিয়েছে। এ বিষয়টি এসইসি থেকে বিনিয়োগকারীদের বার বার সতর্ক করা হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা সতর্ক না হলে তাদের কিছুটা ঝুকি নিতে হবে। এছাড়া ব্যাংকগুলোর তারল্য সঙ্কট ছাড়াও কয়েকটি বড় আইপিও’র জন্য বিনিয়োগকারীরা অর্থ ধরে রাখছেন, যা বাজারে প্রভাব বিস্তার করছে। উল্লেখিত কারণে দরপতন ত্বরান্বিত হচ্ছে বলে এসইসি থেকে জানানো হয়েছে।

বাজার পরিস্থিতি: বুধবার ডিএসইর লেনদেনে উত্থান পতন খেলা লক্ষ্য করা গেছে। প্রতি আধ ঘন্টা পরপর সূচকের উঠা নামা ছিল উল্লেখ করার মতো। আগের দুদিনের বড় দরপতনের পর বুধবার লেনদেনের শুরুর প্রথম আধ ঘন্টায় ডিএসইর সাধারণ সূচক ১২০ পয়েন্ট হ্রাস পায়। এ সময় ডিএসইতে লেনদেন হওয়া কোম্পানির মধ্যে দর বাড়ে মাত্র ১৩টি কোম্পানির। অপরদিকে একই সময়ে দরহ্রাসের তালিকায় স্থান পায় ১৮৫টি কোম্পানির শেয়ারের দর। তবে বিক্ষোভ মিছিলের পর ডিএসইতে হারানো সূচক কিছুটা পূনরুদ্ধার হয়। বেলা বারোটায় ডিএসইর সাধারণ সূচক প্রায় ৯০ পয়েন্ট পূনরুদ্ধার হয়। এসময়ে দরহ্রাস পাওয়া কোম্পানির তালিকায় কিছুটা উন্নতি দেখা যায়। তবে এ পরিস্থিতি বেশিক্ষণ ধরে রাখা যায়নি। পরবর্তি ২০ মিনিটের মাথায় সূচকের আবার পতন দেখা যায়। যা সারাদিন ধরেই উঠা নামার মধ্যে ছিল। তবে লেনদেন শেষের কিছুক্ষন আগে ডিএসইর হারানো সূচক পূনরুদ্ধার করে ১৭ পয়েন্ট যোগ হয়েছিল। তবে শেষ মুহুর্তে শেয়ারের দর পরে যাওয়ায় ঋণাত্মক সূচক নিয়েই লেনদেন শেষ করে ডিএসই। একই সাথে কমেছে লেনদেন।

বুধবার ডিএসইতে অধিকাংশ শেয়ারের দর কমলেও শেষ মুহুর্তে ব্যাংকের শেয়ারের দর কিছুটা বেড়েছে। এ কারনে সূচক বড় ধরনের পতনের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ২৪৩টি কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ড ইউনিটের মধ্যে দর বেড়েছে ৮০টির, কমেছে ১৫৮টির এবং অপরিবর্তিত ৫টির। ডিএসইতে লেনদেন হয়েছে ১০২৯ কোটি টাকার। ডিএসইর সাধারন সূচক ৩২ পয়েন্ট কমে ৭৯৪৮ পয়েন্টে দাড়িয়েছে।

No comments:

Post a Comment