Monday, January 17, 2011

ইতিহাসের নজিরবিহীন উত্থান-পতন দেখলেন বিনিয়োগকারীরা

গত সপ্তাহের পুঁজিবাজার ( ৯- ১৪ জানুয়ারি)

দেশের পুঁজিবাজারের ইতিহাসে নজিরবিহীন উত্থান-পতন প্রত্য করেছে বিনিয়োগকারীরা। ফলে স্মরণীয় একটি সপ্তাহ পার করেছে প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। সপ্তাহের প্রথম  দু’দিন ভয়াবহ পতনের পর তৃতীয় দিন আবার অস্বাভাবিক উত্থান ঘটে। এতে সাধারণ সূচক কমে যায় ১২৩৫ পয়েন্ট। অবস্থা বেগতিক দেখে সোমবার সিকিউরিটিজ এন্ড একচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) ৫০ মিনিট পার হওয়ার আগেই লেনদেন বন্ধ করে দেয়। আর এতে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ লাভবান হলেও বেশির ভাগ হয়েছেন সর্বস্বান্ত। ফলে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে পুলিশের ব্যাপক ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। গত সপ্তাহে কমেছে বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ারে দাম। সাধারণ সূচক, বাজার মূলধনও গত সপ্তাহের তুলনায় কমেছে।  এ সবই ছিল পুঁজিবাজারের গেল সপ্তাহের চিত্র।
গত ৯ ও ১০ জানুয়ারি সূচকের পতন যেমন সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছিল, পরের দিন ১১ জানুয়ারি অতিমাত্রায় অগ্রগতিকেও স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেননি পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, সূচকের ভয়াবহ পতন যেমন প্রত্যাশিত নয়, তেমনি গ্রহণযোগ্য নয় মাত্রাতিরিক্ত উত্থানও। সাম্প্রতিক সময়ে পুঁজিবাজারে অবিশ্বাস্য ধরনের মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা ঘটলে বিশেষজ্ঞ মহল এ ব্যাপারে বারবার সাবধান করার চেষ্টা করেছেন বিনিয়োগকারীদের। এমনকি একপর্যায়ে দুই পুঁজিবাজার ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের প থেকেও আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন করে।

বাজারে উত্থান-পতন সম্পর্কে পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক ওসমান ইমাম বলেন, গত সপ্তাহের প্রথম তিন কার্যদিবসে সূচকের ওঠানামা ছিল বেশ অস্বাভাবিক। ওই সময়ে প্রথম দু’দিন যেভারে বাজারে দরপতন হয়েছে এবং তৃতীয় দিনও যেভাবে ১ হাজার পয়েন্ট উঠেছেÑকোনটাই স্বাভাবিক ছিল না। তিনি আরও বলেন, চলতি সপ্তাহে পুঁজিবাজার স্বাভাবিক থাকতে পারে।
জানা যায়, গত সপ্তাহের প্রথম দিন রোববার সাধারণ মূল্যসূচক ৭ দশমিক ৭৬ শতাংশ বা ৬০০.১৯ পয়েন্ট নেমে যায়। পরদিন সোমবার লেনদেনের ৫০ মিনিটের মাথায় সূচক ৬৩৫ পয়েন্ট নেমে যায়, যা ডিএসইর ইতিহাসে একদিনে সর্বোচ্চ সূচক কমার রেকর্ড। এরপর ৫০ মিনিটের মাথায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) লেনদেন বন্ধ করে দেয়। এই দরপতনে পুঁজি হারিয়ে বিনিয়োগকারীরা রাস্তায় নেমে বিােভ প্রদর্শন করে। এসময় বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পুলিশ বিুব্ধ বিনিয়োগকারীদের বেধড়ক লাঠিপেটা করে। পুলিশের লাঠিপেটায় সেখানে কর্তব্যরত চার সাংবাদিকসহ কমপে ৫০ জন আহত হয়। এদিকে টানা কয়েকদিনের দরপতনের পর নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি), বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের প থেকে নানামুখী উদ্যোগ নেয়া হয়। পতন ঠেকাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো বেশ কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করে।

বিভিন্নমুখী উদ্যোগ নেয়ার ফলে পরদিন চাঙ্গা হয়ে ওঠে বাজার। বিগ জাম্ফ দেয় শেয়ারবাজার। মঙ্গলবার সাধারণ সূচক ১৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ বা ১০১২.৬৫ পয়েন্ট বেড়ে যায়, যা ডিএসইর ইতিহাসে একদিনে সূচক বৃদ্ধির সর্বোচ্চ রেকর্ড। এর আগে ২০০৯ সালের ১৬ নভেম্বর বাজারে গ্রামীণফোনের শেয়ার লেনদেন শুরুর দিন ডিএসইতে সর্বোচ্চ ৭৬৪ পয়েন্ট বাড়ে। বাজারে চাঙাভাবের ধারা বুধবারও স্থায়ী ছিল। ওইদিন সূচক ১৭৮.৫৯ পয়েন্ট বাড়ে। তবে সপ্তাহের শেষ দিন বৃহস্পতিবার সূচক ১১৪.৮০ পয়েন্ট কমে যায়।

এদিকে ভয়াবহ দরপতনের পর স্বস্তিতে নেই বিনিয়োগকারীরা। কেননা, তারা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী ১:২ হারে মার্জিন ঋণ পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেন। এ ব্যাপারে মার্চেন্ট ব্যাংকার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি শেখ মর্তুজা আহমেদ এসইসির সিদ্ধান্ত অনুয়ায়ী ঋণ না দেয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসগুলোতে বেশ তারল্য সঙ্কট রয়েছে। এ কারণে ১:১.২ ঋণ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, বিনিয়োগকারীদের চাহিদার কথা বিবেচনা করে বেশির ভাগ মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসে ইতোমধ্যে ১:০.৭৫ হারে ঋণ দেয়া হচ্ছে। ধীরে ধীরে এই হার বাড়ানো হবে।

গেল সপ্তাহে বেশিরভাগ শেয়ারের দাম কমেছে। এ সময় লেনদেন হওয়া মোট ২৫১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দাম কমেছে ২১২টির এবং বেড়েছে ৩৬টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে তিনটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম।

বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত ৯ জানুয়ারি রোববার সপ্তাহের প্রথম দিন ৬০০ এবং পরদিন সোমবার আবার ৬৩৫ পয়েন্ট সূচক হারায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ। অবশ্য সোমবার ৬৩৫ পয়েন্ট সূচক হারাতে সময় লেগেছে ৫০ মিনিট। দু’দিনের টানা দরপতনে বিুব্ধ বিনিয়োগকারীরা বিােভে ফেটে পড়েন। একপর্যায়ে তা ছড়িয়ে পড়ে দেশব্যাপী। ১০ জানুয়ারি এক ঘন্টারও কম সময়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ৬৩৫ ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ ১ হাজার ৩৯৬ পয়েন্ট সূচক হারালে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) সকাল ১১টা ৫০ মিনিটে দুই পুঁজিবাজারের লেনদেন বন্ধ ঘোষণা করে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে ওই দিনই নিয়ন্ত্রক সংস্থা ঋণসুবিধা বৃদ্ধিসহ আগের নেয়া কয়েকটি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে। পরদিন মঙ্গলবার আবার উল্টোচিত্র দেখা যায় দুই পুঁজিবাজারে। এদিন ডিএসই’র প্রধান সূচকটি বেড়ে যায় ১ হাজার পয়েন্টের বেশি। চট্টগ্রামে সূচক বাড়ে দুই হাজার ৬০০ পয়েন্টের বেশি। তবে সপ্তাহের শেষ দুই দিন সূচকের উঠানামা স্বাভাবিক থাকায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে। সপ্তাহের শুরুতে রোববার সাধারণ মূল্যসূচক ৭ হাজার ৭৩৫ দশমিক ২২ পয়েন্ট থাকলেও সপ্তাহের শেষ দিন বৃহস্পতিবার তা ৭ হাজার ৫৭৫ দশমিক ৮৯ পয়েন্টে নেমে আসে। মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে সাধারণ মূল্যসূচক কমে যায় ১৫৯ দশমিক ৩৩ পয়েন্ট।

গত সপ্তাহে পাঁচ কার্যদিবসে ডিএসইতে লেনদেন হয় মাত্র ৫ হাজার ৪২১ কোটি টাকা। এ সময় গড় লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৮৪ কোটি টাকা। অন্যদিকে গত সপ্তাহের আগের সপ্তাহে ৫ কার্যদিবসে ডিএসইতে লেনদেন হয় ৬ হাজার ১৪০ কোটি টাকা। এ সময় গড় লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ হাজার ২২৮ কোটি টাকা। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে গড় লেনদেন কমেছে ১৪৪ কোটি টাকা।

গত সপ্তাহে ডিএসইতে আর্থিক লেনদেনের পাশাপাশি বাজার মূলধন, সব সূচক এবং লেনদেন হওয়া বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ারের বড় ধরনের দরপতন হয়। সপ্তাহের শুরুতে রোববার ডিএসই’র বাজার মূলধন ছিল ৩ লাখ ৩০ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। অন্যদিকে সপ্তাহের শেষ দিন বৃহস্পতিবার বাজার মূলধন কমে দাঁড়ায় ৩ লাখ ২৭ হাজার ৬৩২ কোটি টাকা। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে বাজার মূলধন কমেছে প্রায় ২ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা।

এদিকে নতুন প্রজন্মের বিপুলসংখ্যক বিনিয়োগকারী বাজারে সম্পৃক্ত হন, বাজারের আচরণ সম্পর্কে যাদের কোন ধারণাই ছিল না। এ বাজারে দরপতন স্বাভাবিক হলেও ৯ ও ১০ জানুয়ারির পতনে ছিল ভয়াবহতা। গোটা বাজারে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। আর এ আতঙ্কে বিনিয়োগকারীরা বাছবিচার না করেই বিক্রি করেছেন হাতে থাকা শেয়ার। হয়েছেন সর্বস্বান্ত।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরা এ সময় বিনিয়োগকারীদের খুবই সতর্ক আচরণের পরামর্শ দেন। তাদের মতে, বিনিয়োগকারীদের এখন অন্তত বাজারের ঝুঁকি বোঝা উচিত। এ বাজার যেমন দিতে পারে, তেমনি নিতেও পারে। তাই সবসময় বিনিয়োগে সতর্ক থাকতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সালাহ উদ্দিন আহমেদ খান বলেন, গত কিছুদিন থেকে পুঁজিবাজারে মূল্যবৃদ্ধির যে প্রবণতা দেখা গেছে তাতে এ পতন অপরিহার্য ছিল। কিন্তু একদিন পর যেভাবে বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে তাও আরো অস্বাভাবিক। তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীদের এ সময় ভালো মৌলভিত্তির শেয়ারে ফিরে আসা উচিত। নিয়ন্ত্রক সংস্থার উদ্দেশে তিনি বলেন, বাজারের এ পর্যায়ে এসইসিকে আরও কৌশলী হতে হবে। দ্রুততার সঙ্গে পুঁজিবাজারে আনতে হবে। আর বুকবিল্ডিং পদ্ধতিকে যেভাবে অপব্যবহার করা হচ্ছে তাকে সংশোধনের মাধ্যমে আইপিওতে যৌক্তিক মূল্যে শেয়ার সরবরাহের ব্যবস্থা নিতে হবে। এটা করা হলে বিনিয়োগকারীরা আবার আইপিওতে ফিরে আসবে। কমবে তাদের বিনিয়োগ ঝুঁকি।

গত সপ্তাহে লেনদেনে শীর্ষে থাকা দশটি প্রতিষ্ঠান হলোÑএনবিএল, ইউসিবিএল, বেক্সিমকো, বেক্সটেক্স, গ্রামীণফোন, সাউথইস্ট ব্যাংক, তিতাস গ্যাস, এবি ব্যাংক, বে লিজিং এন্ড ইনভেস্টমেন্ট ও প্রাইম ব্যাংক। সমাপনী মূল্যের ভিত্তিতে গত সপ্তাহে দাম বৃদ্ধিতে শীর্ষে থাকা ১০টি প্রতিষ্ঠান হলোÑসিনোবাংলা ইন্ডাস্ট্রিজ, মিরাকল ইন্ডাস্ট্রিজ, রহিম টেক্সটাইল, বেক্সিমকো সিনথেটিকস, স্টান্ডার্ড সিরামিক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, স্কয়ার টেক্সটাইল, ডেসকো, তৃতীয় আইসিবি মিউচ্যুয়াল ফান্ড ও দ্বিতীয় আইসিবি মিউচ্যুয়াল ফান্ড। সমাপনী মূল্যের ভিত্তিতে দাম কমে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শীর্ষ ১০টি প্রতিষ্ঠান হলোÑএশিয়া ইন্ডাস্ট্রিজ, চট্টগ্রাম ভেজিটেবল, সাভার রিফ্রাক্টরিজ, দুলামিয়া কটন, এইচআর টেক্সটাইল, জুট স্পিনার্স, তাল্লু স্পিনিং, মেঘনা পেট্রোলিয়াম, আজিজ পাইপ ও ইমাম বাটন।

No comments:

Post a Comment