![]() |
| ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ জেনারেল ইন্ডেক্স |
রেকর্ড পরিমাণ ধ্বসের পরদিন অতীতের সব রেকর্ড ভেঙ্গে সর্বোচ্চ পরিমাণ সূচক বেড়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। পুঁজিবাজারের ইতিহাসে সাধারণ মূল্যসূচক বৃদ্ধির সর্বোচ্চ রেকর্ড হয়েছে। গতকাল ডিএসইতে লেনদেন শেষে সাধারণ মূল্যসূচক ১০১২ পয়েন্ট বেড়ে ৭৫১২ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে, যা ডিএসইর ইতিহাসে আগে কখনো ঘটেনি। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মাঝে অনেকটা স্বস্তি এনে দিয়েছে। এর আগে ২০০৯ সালের ১৬ নভেম্বর গ্রামীণফোনের লেনদেন চালুর প্রথম দিনে ডিএসইর সাধারণ মূল্যসূচক সর্বোচ্চ ৭৬৪ দশমিক ৮৪ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছিল। সোমবার ডিএসইতে ইতিহাসের সর্বোচ্চ দরপতনের ঘটনা ঘটার পরেই সূচকের এই বৃদ্ধি হলো।
মঙ্গলবার সূচক বৃদ্ধির পাশপাশি বাজার মূলধন ২ লাখ ৮৭ হাজার ৭৭২ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৩ লাখ ২৬ হাজার ১০৮ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। মাত্র একদিনে বাজার মূলধন বেড়েছে ৩৮ হাজার ৩৩৬ কোটি টাকা।
গতকাল লেনদেন হওয়া ২৪৮টি কোম্পানির মধ্যে ২৪৩টি কোম্পানিরই শেয়ারের দাম বেড়েছে, আর কমেছে মাত্র ৫টি কোম্পানির শেয়ারের দাম।
এদিকে ডিএসইতে মঙ্গলবার ১৯৫টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বৃদ্ধির সর্বোচ্চ সীমায় যাওয়ায় (সার্কিট ব্রেকার) সেগুলোর লেনদেন স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়ায় বন্ধ হয়ে যায় অর্থাৎ ৯৫ শতাংশ শেয়ারের লেনদেন স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় স্থগিত হয়ে যায়। এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের ক্রেতা থাকলেও বিক্রেতা ছিল না বলে জানা গেছে। আজ বুধবার আবার যথারীতি এসব শেয়ারের লেনদেন চালু হবে।
বাজার বিশ্লেষকেরা বাজারের চাঙাভাবকে অস্বাভাবিক হিসেবে মন্তব্য করছেন। তারা বলছেন, হঠাৎ করে অতিরিক্ত দরপতন বা অতিরিক্ত চাঙ্গাভাব বাজারের জন্য মোটেও শুভকর নয়। বাজারের স্থিতিশীলতা রায় ধীরে ধীরে এটা হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তারা।
অন্যদিকে বিনিয়োগকারীরা বলছেন, বাজার অতিরিক্ত চাঙ্গা হওয়ার কারণে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের দাম সার্কিট ব্রেকারে পৌঁছানোর কারণে তারা আর শেয়ার কিনতে পারেননি।
অন্যদিকে সিএসইতেও এদিন লেনদেন হওয়া বেশির ভাগ কোম্পানির শেয়ারের দাম বেড়েছে। সে সঙ্গে বেড়েছে সব সূচক ও বাজার মূলধন। দিনশেষে লেনদেন হওয়া ১৯৪টি কোস্পানির মধ্যে ১৮৬টি কোম্পানির শেয়ারের দাম বেড়েছে। সিএসই সার্বিক মূল্য সূচক আগের দিনের চেয়ে ২ হাজার ৬৮২ পয়েন্ট বেড়ে ২১ হাজার ৮৯৫ পয়েন্টে উন্নীত হয়।
ডিএসইর প্রেসিডেন্ট শাকিল রিজভী বাজার ধ্বসের এক দিনের মধ্যেই নজিরবিহীন ঊর্ধ্বগতির সমালোচনা করে বলেন, গত কয়েকদিনে মূল্য সংশোধনের সময় বিনিয়োগকারীরা শেয়ার ক্রয় করেননি। অথচ মূল্য সংশোধনের সময় দর কমে যাওয়ায় শেয়ার ক্রয়ের উপযুক্ত সময় ছিল। অথচ ঊর্ধ্বগতির কারণে আজ (মঙ্গলবার) সবাই একসঙ্গে শেয়ার ক্রয়ে ঝুঁকে পড়েছেন। অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি হলে আবার সেভাবেই পতন হবে। সম্প্রতি সে ধরণের কিছু নজির দেখা গেছে। শাকিল রিজভী বলেন, দুঃখজনক হচ্ছে সাধারণ বিনিয়োগকারীর সঙ্গে সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাও একই ধরণের আচরণ করছে।
বাজারের ঊর্ধ্বমুখী প্রসঙ্গে মার্চেন্ট ব্যাংকার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি মূর্তজা আহমেদ বলেন, অধিকাংশ ব্রোকারেজ হাউজে বিক্রিতা শুন্য থাকায় সূচকের পরিমাণটা বেশি বেড়েছে। ওঠা-নামা করেনি। তিনি আরও বলেন, বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা আসতে শুরু করেছে। তবে বাজারে সূচক ৫০০ থেকে ১০০০ পয়েন্ট বাড়া কিংবা কমা কোনটাই স্বাভাবিক নয়। তবে তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, এভাবে একটা সময় পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা আসবে।
এক প্রশ্নের জবাবে আহমেদ বলেন, সিকউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) ১:২ মার্জিন ঋণ সীমা নির্দ্ধারণ করে দিয়েছে। এর অর্থ এই না যে সব মাচের্ন্ট ব্যাংকে ১:২ দিতে হবে। এসইসি যেটা দিয়েছে সেটা হলো সর্বোচ্চ সীমা। মাচের্ন্ট ব্যাংকগুলো এর কম দিতে পারে, কিন্তু এর বেশি দিতে পারবে না। তবে বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে যা দেওয়া দরকার সেই পরিমাণ ঋণ দিতে হবে।
জানা যায়, মঙ্গলবার উভয় স্টক এক্সচেঞ্জে সূচকের বড় ধরণের ঊর্ধমুখী এবং লেনদেন হওয়া প্রায় সব কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়লেও সে তুলনায় আর্থিক লেনদেনের পরিমাণ বাড়েনি। এদিন লেনদেন শুরুর পর থেকেই ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ওঠে মূল্যসূচক। দুই ঘণ্টায় মূল্যসূচক বেড়েছে ৯৯৬ দশমিক ৮৪ পয়েন্ট। এদিকে গতকাল থেকে মার্জিন ঋণ অনুপাত ১ঃ২ কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও অনেক ব্রোকারেজ হাউজে তা দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ নিয়ে বেশ ক’টি হাউজে বিােভের ঘটনাও ঘটেছে। আইডিএলসি ব্রোকারেজ হাউজে নির্ধারিত অনুপাতে মার্জিন ঋণ না দেওয়ায় লেনদেন বন্ধ করে দিয়েছে বিনিয়োগকারীরা। এছাড়া জনতা ব্যাংকের মার্চেন্ট শাখায়ও বিােভের ঘটনা ঘটে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ব্যাংকটি ১ঃ৫ অনুপাতে ঋণ দেওয়া শুরু করে।
এছাড়া মঙ্গলŸার লেনদেন হওয়া বেশির ভাগ কোম্পানির শেয়ারের দাম সার্কিট ব্রেকার এর কাছাকাছি চলে এলেও বেশির ভাগ বিনিয়োগকারী শেয়ার বিক্রি করেনি। ফলে বেশির ভাগ সময় ক্রেতা থাকলেও বিক্রেতা ছিল না বললেই চলে। আর এই কারণেই লেনদেন কম হয়েছে।
এদিন ডিএসইতে লেনদেন হয় মাত্র ৯৭৭ কোটি টাকা। এটি গত ৯ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন লেনদেন। অন্যদিকে সিএসইতে লেনদেন হয় মাত্র ১৭১ কোটি টাকা।
বাজারের এই ঊর্ধ্বগতিতে বিনিয়োগকারী জানান, বাজারে বড় ধরণের দরপতনের পর অধিকাংশ শেয়ারের দাম বাড়লেও এখনো তারা বড় ধরণের লোকসানে রয়েছে। ফলে দাম বাড়লেও বিনিয়োগকারীদের লোকসানে থাকায় শেয়ার বিক্রি করেনি। অন্যদিকে বর্ধিত হারে মার্জিন লোন না পাওয়ায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা নতুন করে শেয়ার কিনতে পারেনি। ফলে লেনদেন কম হয়েছে।
ঘোষিত হারে মার্জিন ঋণ না পেয়ে বিনিয়োগকারীদের বিক্ষোভ
সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) সোমবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১:২ হারে মার্জিন ঋণ না দেওয়ায় গতকাল মঙ্গলবার বিনিয়োগকারীরা কয়েকটি মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে। ব্রোকারেজ হাউসগুলো হলো- আইডিএলসি, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংকসহ আরও কয়েকটি ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসে বিনিয়োগকারীরা বিােভ প্রদর্শন করেন। একই সঙ্গে তারা কয়েকটি হাউসে লেনদেনও বন্ধ করে দেন।
বিনিয়োগকারীরা অভিযোগ করেছেন, গতকাল লেনদেনের শুরুতে তারা বিভিন্ন মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসে এসইসির সিদ্ধান্ত অনুয়ায়ী ১:২ মার্জিন ঋণ প্রদানের দাবি জানান। তবে ওই হাউসগুলো থেকে এসইসির নির্ধারিত হারে ঋণ না দেওয়ায় তারা বিােভ প্রদর্শন করেন।
এ ব্যাপারে মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও প্রাইম ব্যাংক ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) শেখ মর্তুজা আহমেদ এসইসির সিদ্ধান্ত অনুয়ায়ী ঋণ না দেওয়ার কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসগুলোতে বেশ তারল্যসংকট রয়েছে। এ কারণে ওই হারে ঋণ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে আমরা কিছুটা বাড়িয়েছি। বেশির ভাগ হাউসে ১:০.৭৫ হারে ঋণ দেওয়া হচ্ছে। ধীরে ধীরে এই হার বাড়ানো হবে। আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের ব্যাপস্থাপনা পরিচালক একরামুল হক বলেন, আমরা এর আগে নিয়মানুযায়ী মার্জিন ঋণ দিয়েছি। বর্তমানে তারল্য সংকটের কারণে নিয়মানুযায়ী ঋণ দিতে পারছি না। তবে ঋণের হার ১:০.৭৫ হারে দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান।

No comments:
Post a Comment