সম্ভাবনার পাশাপাশি ছিল আনন্দ-বেদনার খতিয়ান
(এক নজরে ডিএসই এই লেখার নিচে দেয়া হলো)
বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাকে উড়িয়ে দিয়ে ঝড়ের গতিতে শুরু হয়েছিল ২০১০ সালের পুঁজিবাজারের যাত্রা। এরপর কেবলই ঊর্ধ্বগতিতে ছুটেছে বাজার। নিয়ন্ত্রক সংস্থার নানা হস্তেেপও থামেনি তা। কয়েক লাখ নতুন বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তায় দারুণ চাঙ্গা বাজারে বছরজুড়ে লেনদেন, সূচক ও বাজার মূলধনে রেকর্ডের পর রেকর্ড হয়েছে।
বাজারের এই পরিবেশে নারী-পুরুষ, বেকার, কর্মজীবী, ছাত্র, গৃহিণী যার যার সঞ্চয় নিয়ে, ব্যাংকের আমানত ভাঙিয়ে, জমি কিংবা গহনা বিক্রি করে টাকা এনেছেন। শিল্পের জন্য ঋণ নিয়ে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেছেন অনেক উদ্যোক্তা। বসে থাকেনি ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও। সিন্ডিকেট কারসাজিও কম ছিল না।
আবার বছরের শেষভাগে এসে নজীরবিহীন দরপতনে কেঁপে ওঠে সারাদেশ। পতনের নতুন দৃষ্টান্ত তথা ইতিহাস হিসেবে আলোচনায় আসে ২০১০ সাল। দশের পুঁজিবাজারের ইতিহাসে এতো দরপতন আর কখনো ঘটেনি। অর্থাৎ পুজিবাজারে পতনের দৃষ্টান্ত হিসেবে আর প্রথমেই আলোচনায় আসবে না ১৯৯৬ সাল। ভয়াভয় ওই ঘটণায় ভীত, ক্ষুব্ধ বিনিয়োগকারীর বিােভে মুখরিত হয় রাজধানীর রাজপথ। নিয়ন্ত্রক সংস্থার হস্তক্ষেপে বাজার আবার ঘুরেও দাঁড়ায়।
বছরজুড়েই গুজব, আতঙ্ক আর অস্থিরতা সেই সঙ্গে বিক্ষোভ, অবরোধ, ভাঙচুর, অব্যাহত ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া থাকলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও ডিএসই কর্তৃপরে নানামুখী পদেেপর ফলে ২০১০ সালে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে পুঁজিবাজার। এছাড়া সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) বেশ কিছু পদপে যেমন ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, তেমনি কিছু কিছু পদপে দীর্ঘমেয়াদে পুঁজিবাজারকে ঝুঁকিমুক্ত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পরিণত করতে ভূমিকা রেখেছে। সব মিলিয়ে ঘটনাবহুল, রেকর্ডময় ও অভাবনীয় সাফল্যের চিহ্ন রেখে একটি বছর পার করেছে দেশের পুঁজিবাজার। এছাড়া বিদায়ী বছরটি পুঁজিবাজারের জন্য মাইলফলক হিসেবেও চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
অন্যদিকে গত বছর বড় ধরনের অগ্রগতি সত্ত্বেও বেশ কয়েকটি সঙ্কটের সমাধান ছাড়াই বছর শেষ করেছে দেশের পুঁজিবাজার। মিউচ্যুয়াল ফান্ড মামলা, মার্জিন ঋণ ও বিলুপ্তির প্রশ্নে বিনিয়োগকারীদের ক্ষোভ, বীমা আইন পাস নিয়ে অনিশ্চয়তা, নতুন কোম্পানির ৪০ শতাংশ শেয়ার অবমুক্ত করার প্রশ্নে সিদ্ধান্তহীনতা এবং কারসাজি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা নিয়েই নতুন বছর শুরু করছে শেয়ারবাজার।
আলোচিত বছরের প্রায় পুরো সময়ই বাজারে ছিল গতিশীল ধারা। লেনদেন, মূল্যসূচক, বাজার মূলধন সবকিছুর মধ্যেই যেন ছিল নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতা। এক বছরে জিডিপির বিপরীতে বাজার মূলধনের অনুপাত ১৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। সবমিলিয়ে বাজারে যে প্রবৃদ্ধি হয়েছে তা সারাবিশ্বে বাংলাদেশকে তৃতীয় অবস্থানে তুলে এনেছে। এদিক থেকে শ্রীলঙ্কা এবং মঙ্গোলিয়ার পরই বাংলাদেশের অবস্থান বলে লংকাবাংলা সিকিউরিটিজের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এভাবে নানা ঘটনায় পেরিয়ে গেছে শেয়ারবাজারের বর্ণিল একটি বছর; ২০১০ সাল।
বিদায়ী অর্থবছরের অর্জন সম্পর্কে ডিএসই সভাপতি শাকিল রিজভী বলেন, পুঁজিবাজার এখন আর শুধুমাত্র সিকিউরিটিজ লেনদেনের জায়গা নয়। গত এক বছরে তা অনেক দূর এগিয়ে গেছে। এজন্য সরকারের প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, মন্ত্রণালয়, এসইসি, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠান এবং বিনিয়োগকারীদের অভিনন্দন জানাই। তিনি বলেন, জাতীয় উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে পুঁজিবাজার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১ কোটি মানুষ পুঁজিবাজারের সঙ্গে জড়িত রয়েছে। গত এক বছরে অনেকগুলো ভাল কোম্পানি পুঁজিবাজারে এসেছে। বাজারে উন্নয়নের যে গতিধারা সৃষ্টি হয়েছে তা ধরে রাখার জন্য তিনি সবার সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন। শাকিল রিজভী বলেন, সরকারের পুঁজিবাজারবান্ধব নীতি এবং এসইসি ও ডিএসইর সমন্বিত প্রচেষ্টাসহ বিনিয়োগকারীদের আত্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে শেয়ারবাজারে টেকসই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা সম্ভব হবে। বাজারকে গতিশীল রাখতে হলে চাহিদা অনুযায়ী শেয়ারের সরবরাহ বাড়াতে হবে। এখন পর্যন্ত যেটুকু বোঝা যাচ্ছে, ২০১১ সালে পুঁজিবাজারে বিপুলসংখ্যক নতুন শেয়ার যুক্ত হবে। এর ফলে বাজারে ভাল শেয়ারের যোগান বাড়বে এবং চাহিদা ও যোগানের ভারসাম্য তৈরি হবে।
সর্বোচ্চ-সর্বনিম্ন রেকর্ড: বিদায়ী বছরে পুঁজিবাজার মেতেছিল সর্বোচ্চ-সর্বনিম্ন রেকর্ড ভাঙা-গড়ার খেলায়। তবে ইতিবাচক নানা রেকর্ডের পাশাপাশি দর-পতনের রেকর্ডও উপহার দিয়েছে বাজার। ২০০৯ সালে প্রধান বাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) দৈনিক সর্বোচ্চ লেনদেনের পরিমাণ ছিল এক হাজার ২৪৫ কোটি টাকা। ৫ ডিসেম্বর তা বেড়ে দাঁড়ায় তিন হাজার ২৪৯ কোটি টাকায়। নতুন এই মাইলফলকে পৌঁছানোর পথে অসংখ্যবার লেনদেনের পুরনো রেকর্ড ভেঙে নতুন রেকর্ড হয়েছে। নতুন বছরের শুরুতে ডিএসইর সাধারণ সূচক ছিল ৪ হাজার ৫৩৫ পয়েন্ট, ৫ ডিসেম্বর তা ৮ হাজার ৯১৮ পয়েন্টে উন্নীত হয়। ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজার মূলধন ৩ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।
১৩ লাখ নতুন বিও: বিপুলসংখ্যক বিনিয়োগকারীর আগমণের বিষয়টি ছিল ২০১০ সালে শেয়ারবাজারের সবচেয়ে বড় সাফল্য। আলোচিত বছরে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের জন্য ব্যবহৃত বেনিফিশিয়ারি ওনার (বিও) হিসাব খোলা হয়েছে ১৩ লাখ ৫ হাজার। আগের বছরে বিও হিসাব বেড়েছিল প্রায় ১১ লাখ। বছর শেষে বিও হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩২ লাখ ৭০ হাজার। একজন ব্যক্তির একাধিক বিওর সংখ্যা যদি মোট বিও হিসাবের ১০ শতাংশ হয় তাহলেও গত বছর বাজারে যুক্ত হয়েছেন প্রায় সাড়ে ১১ লাখ বিনিয়োগকারী।
লেনদেন গড় ছিল দেড় হাজার কোটি টাকার ঘরে: শেয়ারবাজারে ব্যাপক ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দিয়েই ২০১০ সাল শুরু হয়েছিল। বেশ কয়েক দফা উত্থান-পতনের পর এক বছরে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ডিএসইতে গড় লেনদেনের পরিমাণ প্রায় আড়াই গুণ হয়েছে। লেনদেনে অনেক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০১০ সালে ডিএসইতে মোট ২৪৪ দিন লেনদেন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এই সময়কালে মোট ১ হাজার ৬৯৭ কোটি ৪৫ লাখ সিকিউরিটিজ লেনদেন হয়েছে। যার মূল্য ৪ লাখ ৯৯১ কোটি ২৬ লাখ টাকা। ২০০৯ সালে ৭৯৬ কোটি ৮০ লাখ শেয়ার লেনদেন হয়েছিল। যার মোট মূল্য ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৩০ কোটি ৯০ লাখ টাকা। ২০০৯ সালের তুলনায় ২০১০ সালে সিকিউরিটিজ লেনদেনের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় ১১২.৯০ শতাংশ এবং টাকার দিক থেকে বৃদ্ধি পায় ১৭১.৮০ শতাংশ, যা ২০০৯ সালে ছিল ২৪৪। ২০১০ সালে প্রতিদিনের গড় লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ৬৪৩ কোটি ৪০ টাকা, যা ২০০৯ সালে ছিল ৬০৪ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। এছাড়া ডিএসইর ওভার দ্য কাউন্টার মার্কেটে (ওটিসি) তালিকাভুক্ত ৭৯টি কোম্পানির ৫ লাখ ২ হাজার ৯২১টি শেয়ার লেনদেন হয়, যার মোট মূল্য ১৩ কোটি ৪৫ লাখ ৯১ হাজার ৫৩৭ টাকা।
সাধারণ মূল্যসূচক: ২০১০ সালে দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রায় সব কোম্পানির শেয়ারে দর ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়। এ কারণে এক বছরে ডিএসই সাধারণ মূল্যসূচক ৩৭৫৪.৮৮ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর এই সূচক ৪৫৩৫.৫৩ পয়েন্টে অবস্থান করছিল। ২০১০ সালের ৩০ ডিসেম্বর সূচক দাঁড়িয়েছে ৮২৯০.৪১ পয়েন্টে। এর আগে ৫ ডিসেম্বর ডিএসই সাধারণ মূল্যসূচক সর্বোচ্চ ৮৯১৮.৫১ পয়েন্ট উন্নীত হয়েছিল।
বাজার মূলধন সাড়ে তিন লাখ কোটি টাকা:
নতুন ইস্যু তালিকাভুক্তি: ২০১০ সালে ডিএসইতে মোট ৩ হাজার ৯৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধনসম্পন্ন ২৫টি নতুন ইস্যু পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে। এরমধ্যে ১২টি মিউচ্যুয়াল ফান্ড, ১টি বন্ড, ১টি করপোরেট বন্ড এবং ১২টি কোম্পানি রয়েছে। ২০০৯ সালে ৩টি মিউচ্যুয়াল ফান্ডসহ ১ হাজার ৯৪১ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের ১৫টি ইস্যু পুঁজিবাজারে এসেছিল।
বিদায়ী বছরে মোট ১৮টি ইস্যুর জন্য পুঁজিবাজার থেকে আইপিও’র মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে। যার পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ২ হাজার ৬৫৩ কোটি ৬৫ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। এরমধ্যে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৩২৭ কোটি ৯৫ লাখ ২৪ হাজার টাকার শেয়ার। ২০০৯ সালে ২ হাজার ৩১৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকার পরিশোধিত মূলধনের ১৮টি কোম্পানি আইপিও’র মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করেছিল। এরমধ্যে ৮৯১ কোটি ৭২ লাখ ৫৮ হাজার টাকা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য বরাদ্দ ছিল।
শুধু লেনদেন বা তালিকাভুক্তির দিক থেকেই নয়, বাজার সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও ২০১০ সাল ছিল শেয়ারবাজারের জন্য বিশাল অগ্রগতির বছর। এ বছর বিও হিসাবধারীর সংখ্যা ১৪ লাখ ৬৭ হাজার ৪৬৭ থেকে বেড়ে ৩২ লাখ ৭০ হাজার ৭৭৫ এ উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ এক বছরে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বেড়েছে ১৮ লাখ ৩ হাজার ৩০৮ জন।
সারাদেশে নেটওয়ার্ক: এক বছর আগেও বিভাগীয় এবং বড় জেলা শহরের বাইরে ব্রোকার হাউজের সংখ্যা ছিল একেবারে নগণ্যসংখ্যক। ফলে এসব এলাকার বিনিয়োগকারীদের পে বিনিয়োগ ও লেনদেন খুব সহজ ছিল না। গত বছর এ জায়গাটিতেও যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। শুধু ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ব্রোকার হাউজগুলোই আলোচিত বছরে প্রায় ৫শ’ নতুন শাখা খুলেছে। বিভাগ এবং বড় জেলা শহরের বাইরে অনেক জেলা এবং উপজেলায়ও বেশকিছু শাখা হয়েছে। ফলে ওই অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে বাজারের সরাসরি সম্পৃক্তি বেড়েছে।
আইপিও এসেছে ১৮টি: গত বছর বাজারে এসেছে ১৮টি আইপিও। আইপিও তথা প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের মাধ্যমে বাজার থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে দুই হাজার ৬৫৩ কোটি টাকা।
সূচকের উত্থান-পতনে রেকর্ড: বিপুল বিনিয়োগকারী ও তারল্যের প্রভাবে বাজারে ছিল শেয়ারের অস্বাভাবিক ওঠা-নামা। ১৯ ডিসেম্বর বাজারে ভয়াবহ দর পতন হয়। ডিএসইতে সাধারণ সূচক কমে যায় ৫৫১ পয়েন্ট। দেশের শেয়ার বাজারে ৫৫ বছরের ইতিহাসে এটি ‘কালো রোববার’ হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। অন্যদিকে এ ঘটনার পর নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেয়া নানা ব্যবস্থার প্রভাবে ২০ ডিসেম্বর একই সূচক বেড়েছে ৩০৪ পয়েন্ট, যা একদিনে সর্বোচ্চ বৃদ্ধির ঘটনা।
তারল্যে সয়লাব: ২০১০ সালে তারল্যে সয়লাব হয়ে পড়ে বাজার। এতে লেনদেন বেড়ে যায় কয়েকগুণ। ২০০৯ সালে ডিএসইতে দৈনিক গড় লেনদেন ১ হাজার কোটি টাকার নিচে থাকলে ২০১০ সালে তা ২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। তারল্য নিয়ন্ত্রণে সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) দফায় দফায় ঋণ সুবিধা কমালেও তাতে লেনদেন ও সূচকের ঊর্ধ্বগতি কমেনি।
শেয়ার সরবরাহে খরা: বাজারে তারল্য-বন্যার বিপরীতে শেয়ার সরবরাহে ছিল তীব্র খরা। শিল্প সম্প্রসারণে সহজ মূলধন সংগ্রহের সুযোগ কাজে লাগাতে এগিয়ে আসেনি বেসরকারি শিল্পোদ্যোক্তারা। উৎপাদনশীল খাতের মাত্র চারটি কোম্পানি বাজারে শেয়ার ছাড়ে। বছরের শেষ ভাগে অবশ্য তিনটি কোম্পানির আইপিও অনুমোদন পেয়েছে। তবে এরা শেয়ার ছাড়বে নতুন বছরে। শেয়ার সরবরাহে সরকারি খাতের সাড়াও তেমন ইতিবাচক ছিল না। বছরের শুরুতে ২৬ সরকারি কোম্পানির শেয়ার বিক্রির সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এর একটিরও দেখা মেলেনি বাজারে।
বছরজুড়ে ঊর্ধ্বমুখী: ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত বাজারে ছিল প্রায় টানা ঊর্ধ্বগতি। চাহিদার বিপরীতে পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় শেয়ারের দাম কেবলই বেড়েছে। নানা সিন্ডিকেটের কারসাজিও শেয়ারের মূল্যকে আকাশছোঁয়া করেছে। এরা কয়েকজন মিলে বিভিন্ন হিসেবে শেয়ার কিনে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে। কখনও আবার নানা গুজব ছড়িয়ে শেয়ারের দামকে প্রভাবিত করেছে। কোম্পানির পরিচালকদের সঙ্গে গোপন বৈঠক করে পরিকল্পনামাফিক বিভিন্ন ঘোষণা দিয়ে শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধিকে উস্কে দিয়েছে। এভাবে এক বছরের ব্যবধানে কোন কোন শেয়ারের দাম ১০ গুণ পর্যন্ত বেড়েছে।
অসাধু উদ্যোক্তারা ছিল তৎপর: ঊর্ধ্বমুখী বাজারের সুযোগ কাজে লাগাতে সারাবছরই তৎপর ছিল অনেক অসাধু উদ্যোক্তারা। নানা কৌশলে এরা বিনিয়োগকারীদের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে অথবা চেষ্টা করেছে। বিধিবহির্ভূত সুবিধাভোগী লেনদেনও এ সময়ে যথেষ্ট বেড়েছে। এমনও কোম্পানি দেখা গেছে, যার উদ্যোক্তারা বিনিয়োগকারীদের কাছে ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের শেয়ার ৩০০ টাকা দরে বিক্রি করেছে। এর চার মাসের মধ্যে দাম নেমে এসেছে ১০০ টাকায়। কখনোই ৩০ শতাংশের বেশি লভ্যাংশ দেয়নি এমন কোম্পানিও ৫০০ শতাংশ বোনাস দিয়েছে। আবার দীর্ঘ সময় উৎপাদন বন্ধ থাকা কোম্পানিও বিস্ময়করভাবে একশ’ শতাংশ বোনাসের সঙ্গে দেড়শ শতাংশ রাইট শেয়ার ঘোষণা করেছে। এতে কোম্পানি দুটির শেয়ারের দাম যথাক্রমে ৩৫ হাজার ও আড়াই হাজার টাকায় উঠে যায়। এমন অবিশ্বাস্য লভ্যাংশ ও শেয়ারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা আরও অনেক কোম্পানির ক্ষেত্রেই দেখা গেছে। অন্যদিকে কোম্পানির পরিচালক ও কর্মকর্তাদের বিধিবহির্ভূত শেয়ার ব্যবসার প্রবণতা এ বছর আরও বেড়েছে।
এসইসি’র ১৩ সিদ্ধান্ত পরিবর্তন: শেয়ারবাজারে গত বছরের উল্লেখযোগ্য আরও একটি দিক ছিল ঘন ঘন সিদ্ধান্ত পরিবর্তন। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) ১১ মাসে মার্জিন ঋণ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত ১৩ বার পরিবর্তন করেছে। অসংখ্য নির্দেশনা জারি করে আবার তা থেকে পিছিয়ে এসেছে। এর প্রেেিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি এসইসিকে ঘন ঘন সিদ্ধান্ত পরিবর্তন না করার জন্য একদফা সতর্কও করেছে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ উপো করে মার্চে আইন করে আইপিওর জন্য ন্যূনতম মূলধন বেঁধে দেয়া হয় ৪০ কোটি টাকা। এতে বাজারে শেয়ারের জোগান আইনি বাধার মুখে পড়ে। নভেম্বরে আবার মূলধনের সীমা ৩০ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়; শিথিল করা হয় অন্য শর্তাবলি। শেয়ার কেনার জন্য প্রদত্ত ঋণ সুবিধার ক্ষেত্রে নিট সম্পদ মূল্য বা এনএভি সংক্রান্ত ফর্মুলা, লেনদেনের বিপরীতে ব্রোকারদের জমা দেয়া নিরাপত্তা জামানতের বর্ধিত হার নির্ধারণসহ এসইসির অনেক সিদ্ধান্ত নানা বিতর্কের জন্ম দেয়। সংশ্লিষ্টদের আপত্তি এবং অনুরোধে এসইসি তার অবস্থান না বদলালেও পরবর্তী সময়ে ঠিকই সেখান থেকে পিছিয়ে আসে। এই নীতি-অস্থিরতা বিভিন্ন সময়ে বাজারকেও প্রভাবিত করে। এসইসি’র মার্জিন ঋণ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত বাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠেছে। এতে বাজারে তুলনামূলক কম সংখ্যক কোম্পানি মার্জিন ঋণের আওতায় থাকলেও ঋণ আতঙ্ক সব কোম্পানির লেনদেনকেই প্রভাবিত করছে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। ফলে এত দ্রুত সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে বিভিন্ন আলোচনা-সমালোচনারও ঝড় উঠেছে বাজারে।
কাগজে শেয়ার: ২০১০ সাল দেশের পুঁজিবাজারের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা ছিল মূল বাজারে কাগজের শেয়ারের যুগাবসান। গত ১ অক্টোবর দেশের স্টক এক্সচেঞ্জের মূল বাজারে কাগজের শেয়ারের যুগ শেষ হয়ে যায়। ওই দিন থেকে শুধু ইলেকট্রনিক শেয়ার লেনদেন হচ্ছে।
যা যা হয়নি: এদিকে এক বছরে শেয়ারবাজারে চাহিদার বিপরীতে শেয়ারের সরবরাহ ছিল একেবারেই সীমিত। সরকার শেয়ার বৃদ্ধির কথা বছরের শুরু থেকে বলে এলেও তা আর আলোর মুখ দেখেনি। ফলে এ বছর বেশির ভাগ কোম্পানির শেয়ার মূল্য অতিমূল্যায়িত হয়ে গেছে। তবে বৃদ্ধি পেয়েছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সংখ্যা। মাত্র একবছরে এ বাজারে নতুন বিও একাউন্ট খোলা হয়েছে ১৮ লাখ ৬৯ হাজার ৬১৭টি। বর্তমানে মোট একাউন্ট ৩২ লাখ ৭০ হাজার ৭৮২টি (৩রা জানুয়ারি-৩০ ডিসেম্বর সিডিবিএল তথ্য)।
২০১০ সালের বাজেটে ডিএসইর লেনদেনের ওপর আরোপিত উৎসে করের হার ১০০ টাকায় আড়াই পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৫ পয়সা নির্ধারণ করায় শেয়ার লেনদেনের ওপর আরোপিত উৎসে কর নির্ধারণ করায় শেয়ার লেনদেন থেকে সরকারের রাজস্ব আয়ের পরিমাণ ২৭৪ কোটি ৪৫ লাখ ৪১ হাজার ১২ টাকা দাঁড়িয়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত ৪ বছরে শেয়ার লেনদেন থেকে আদায়কৃত উৎসে করের পরিমাণ ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০৬ সালে এ খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আয় অর্জিত হয়েছে ১ কোটি ৯৫ লাখ ১৯ হাজার ৩৮৬ টাকা। ২০০৭ সালে রাজস্ব আয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ৯ কোটি ৬৮ লাখ ৪৫ হাজার ১০০ টাকা। ২০০৮ সালে ডিএসইর আদায়কৃত উৎস করের পরিমাণ ২০ কোটি ৩ লাখ ৮৮ হাজার ২৬৭ টাকায় দাঁড়ায়। গত দুই বৎসরে দেশের শেয়ারবাজারের ব্যাপক সম্প্রসারণের কারণেই এ খাত থেকে সরকারের আয় জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়াও এই অর্থ বছরের বাজেটে প্রথম ৫ মাসে উদ্যোক্তা ও প্লেসমেন্ট শেয়ার বিক্রি থেকে ৭৩ কোটি ২২ লাখ ৯৩ হাজার ১৫১ টাকা সরকারি রাজস্ব খাতে জমা দেয়া হয়েছে।
ডিসেম্বর’১০ পুঁজিবাজারের ইতিহাস: শেয়ারবাজারে বছরের শুরুর দিকটা ভালোভাবে কাটলেও শেষ একমাসে এ বাজারে বয়ে গেছে স্মরণকালের ভয়াবহ দিন। ১৮ কার্যদিবসে দরপতনের মুখেই ছিল ৭ দিন। আর ধস নামে চার বার। এছাড়া সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বিােভ, ভাঙচুর এবং অবরোধও এ মাসে সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। এ বছর ২৫ সেপ্টেম্বর ২২৩ পয়েন্ট পতন হলে প্রথমবারের মতো ধস নামে। ৮ ডিসেম্বর মাত্র ২০ মিনিটে ৫৪৭ পয়েন্ট পড়লে কম সময়ে পতনের রেকর্ডে এশিয়ার এক নম্বর তালিকায় বাংলাদেশের নাম উঠে। এর ফলে বিনিয়োগকারীরা রাস্তায় নেমে আসে। দীর্ঘ দুই ঘণ্টা রাস্তা অবরোধ ছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশের সঙ্গে র্যাবকেও নামতে হয়েছে। এ সময় ৭ বিনিয়োগকারী আহত হয়েছে। ১৩ ডিসেম্বর ২৪৭ পয়েন্ট পড়লে পুঁজিবাজারে দরপতনের নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়। তবে ১৯ ডিসেম্বর ইতিহাসের স্মরণকালের ভয়াবহ ধস নামে। এদিন ৫৫১ পয়েন্ট পড়লে সরকার মহলেও এ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এর আগে ১৯৯৬ সালের ৫ নভেম্বর মূল্যসূচক একদিনে ২৩৩ পয়েন্ট কমেছিল, শতকরা হিসাবে যা ছিল ৬ শতাংশ।
এদিকে শেয়ারবাজারে ভয়াবহ দরপতনের ঘটনায় চিন্তিত হয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। বাজার পর্যালোচনা কমিটি বাজার পরিস্থিতি নিয়ে দু’বার বৈঠক করে। সভায় ২৫ নভেম্বর জারি করা সদস্য মার্জিন আইন বাতিল করা হয়। দ্বিতীয় দফা বাজার পর্যালোচনা কমিটির বৈঠকে এনএভি ফর্মুলা প্রয়োগে ঋণ সুবিধা পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত স্থগিত করা হয়। এর পাশাপাশি মার্জিন ঋণের হার ১:১ থেকে ১:১.৫ করার নতুন সিদ্ধান্ত হয়, যা কার্যকর করার ঘোষণা দেয়া হয়। বাজারের লাগাম টেনে ধরতে মার্জিন ঋণ নিয়ন্ত্রণের এসইসি’র উদ্যোগ এক আন্দোলনে ভেস্তে গেল। এনএভি ফর্মুলা বাস্তবায়নের আগে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর সঙ্গে টানাপড়েন ছিল এসইসি’র। এবার বাজারের পতন ঠেকাতে এসইসি সেই ফর্মুলা বাতিল করল। এমনকি তারল্য প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে মার্জিন ঋণের পরিমাণ বাড়িয়ে দিলো। এবার উল্টো আচরণ এসইসি’র, তারল্য প্রবাহ বাড়াতে মরিয়া হলেন তারা।
প্রতি বছরই ডিসেম্বর মাসে এসে পুঁজিবাজারে মূল্য সংশোধনের প্রবণতা তৈরি হয়। এর মূল কারণ ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর বার্ষিক হিসাব সমাপনী। বার্ষিক হিসাব চূড়ান্ত করার জন্য এসব প্রতিষ্ঠান তাদের নিজস্ব পোর্টফলিওর শেয়ার বিক্রি করে মুনাফা তুলে নেয়। জানুয়ারিতে তারা আবার বিনিয়োগ শুরু করলে বাজার ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ওঠে। ২০১০ সালেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। অধিকাংশ শেয়ারের দর ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় ডিসেম্বরের শুরু থেকেই প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা মুনাফা তুলে নিতে শুরু করেন। তবে শেয়ারের দর ব্যাপক বৃদ্ধির পাশাপাশি বিনিয়োগের পরিমাণ আইনি সীমার মধ্যে নামিয়ে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর অবস্থানের কারণে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার বিক্রির প্রবণতা ছিল অন্য বছরের তুলনায় বেশি। অন্যদিকে ব্যাংকের ঝুঁকি কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক সিআরআর ০.৫ শতাংশ হার বাড়িয়েছে। এর ফলে ব্যাংকগুলোকে অতিরিক্ত ২ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিতে হয়েছে। এর ফলে মুদ্রাবাজারে সৃষ্ট অস্থিরতা পুঁজিবাজারকে প্রভাবিত করে। সব মিলিয়ে দরপতনের ক্ষেত্রে তৈরি হয় নতুন রেকর্ড।
বছরজুড়েই এসইসির বেশ কিছু পদক্ষেপ চরম বিতর্কের জন্ম দেয়। বিশেষ করে শেয়ারের অভিহিত মূল্য ১০ টাকায় রূপান্তর, মার্জিন ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে এনএভিভিত্তিক হিসাব পদ্ধতি, মার্জিন ঋণের হার দফায় দফায় হ্রাস বৃদ্ধি, মিউচ্যুয়াল ফান্ড নিয়ে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বাজারে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। বছরের শেষ পর্যায়ে এসে প্রাতিষ্ঠানিক ও বড় বিনিয়োগকারীরা মুনাফা তুলে নেয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ায় বাজারে মন্দা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বার্ষিক হিসাব সমাপনী (ইয়ার কোজিং), আইনসীমার অতিরিক্ত বিনিয়োগ প্রত্যাহারে বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর অবস্থান, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করা শিল্প ঋণের টাকা ফেরতের সময় বেঁধে দেয়া, ব্যাংকের নগদ জমা সংরক্ষণের (সিআরআর) হার বৃদ্ধি, মার্জিন ঋণ সংকোচন এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সতর্কবাণীর প্রভাবে দরপতনের মাত্রা বেশি হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। অবশ্য প্রায় সাড়ে ৩ মাস ধারাবাহিক বৃদ্ধির পর বাজারের এই প্রবণতাকে স্বাভাবিক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, বছরের শেষ প্রান্তে এসে বাজারে মূল্য সংশোধন অস্বাভাবিক নয়। এ সময় বিনিয়োগকারীদের ধৈর্যধারণ করে ভালো কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করতে হবে।
বিশ্লেষকরা যা বললেন: ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সিনিয়র সহ-সভাপতি নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, লেনদেন, বাজার মূলধন, বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ইত্যাদি বিবেচনায় ২০১০ সাল ছিল দেশের শেয়ারবাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল একটি বছর। ব্যক্তি এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বাজার সম্পর্কে ছিল ব্যাপক উৎসাহ। এ উৎসাহকে ধরে রেখে পর্যাপ্ত ভালো শেয়ারের সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে আগামীদিনে বাজার আরও অনেক দূর যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বিশ্লেষকরা বলেছেন, বিপুলসংখ্যক বিনিয়োগকারীর আগমনের বিষয়টি ছিল ২০১০ সালের প্রধান সাফল্য। বড় শহরের বাইরেও দেশের প্রত্যন্ত অনেক অঞ্চলের মানুষ এ বছর শেয়ারবাজারে সম্পৃক্ত হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বিচ্ছিন্ন অনেক সঞ্চয় অর্থনীতির মূল স্রোতধারায় যুক্ত হয়েছে। আর পুরো বিষয়টি জাতীয় প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর ক্ষেত্রে একটি অসাধারণ সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।
পুঁজিবাজারে জমে ওঠা বিপুল পরিমাণ মূলধনের একাংশকে উৎপাদনশীল খাতে স্থানান্তর করে অর্থনীতির মূলস্রোতের সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন। শক্তিশালী পুঁজিবাজারকে দেশের উৎপাদনমুখী খাতসহ সামগ্রিক অর্থনীতির বিকাশে কিভাবে কাজে লাগানো যায় সরকারের দিক থেকে সে ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত। এজন্য বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং শিল্প খাতকে শক্তিশালী করতে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সরবরাহের জন্য কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারলে একদিকে যেমন জাতীয় অর্থনীতি গতিশীল হবে তেমনি পুঁজিবাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অর্থের নিরাপত্তা বাড়বে।
এক নজরে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)
বাজার মূলধন : ২০০৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের বাজার মূলধন ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০১০ সালের ৩০ ডিসেম্বর বাজার মূলধন দাঁড়ায় ৩ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকায়, যা ২০০৯ সালের ৩০শে ডিসেম্বর থেকে ২০১০ সালের ৩০শে ডিসেম্বর তারিখের বাজার মূলধনের পরিমাণ ১ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি পায় এবং শতাংশের দিক থেকে বৃদ্ধি পায় ৮৪.২১ শতাংশ।
সিকিউরিটিজ লেনদেন : ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে ২০১০ সালে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজগুলোর লেনদেনের পরিমাণ ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়। ২০১০ সালে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে ১৬৯৭ কোটি ৪৫ লাখ সিকিউরিটিজ লেনদেন হয়, যার মূল্য টাকায় ৪,০০,৯,৯১ কোটি ২৬ লাখ টাকা। অন্যদিকে ২০০৯ সালে সিকিউরিটিজ লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৭৯৬ কোটি ৮০ লাখ এবং টাকায় ছিল ১,৪৭,৫৩০ কোটি ৯০ লাখ টাকা অর্থাৎ ২০০৯ সালের তুলনায় ২০১০ সালে সিকিউরিটিজ লেনদেনের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় ১১২.৯০ শতাংশ এবং টাকার দিক থেকে বৃদ্ধি পায় ১৭১.৮০ শতাংশ।
লেনদেন দিবস : ২০১০ সালের লেনদেন দিবসের সংখ্যা ছিল ২৪৪ দিন। অন্যদিকে ২০০৯ সালেও ২৪৪ দিন ছিল। ২০১০ সালে গড়ে সিকিউরিটিজ লেনদেনের পরিমাণ ৬ কোটি ৯৫ লাখ এবং গড় লেনদেন দাঁড়ায় টাকায় ১ হাজার ৬৪৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা, যা ২০০৯ সালে সিকিউরিটিজ লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৩ কোটি ২৬ লাখ এবং গড় লেনদেন দাঁড়ায় টাকায় ছিল ৬০৪ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।
ডিএসই সাধারণ মূল্য সূচক : ২০০৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর ডিএসইর সাধারণ মূল্যসূচক ৪৫৩৫.৫৩ পয়েন্ট থেকে ৩৭৫৪.৮৮ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ২০১০ সালের ৩০ ডিসেম্বর সূচক ৮২৯০.৪১ পয়েন্টে পৌঁছায়। অর্থাৎ ২০০৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর থেকে ২০১০ সালের ৩০ ডিসেম্বর ডিএসই’র সাধারণ মূল্যসূচক পয়েন্টের দিক থেকে বৃদ্ধি পায় ৩৭৫৪.৮৮ পয়েন্ট এবং শতাংশের দিক থেকে বৃদ্ধি পায় ৮২.৭৮। ২০১০ সালের ৫ ডিসেম্বর ডিএসই’র সাধারণ মূল্য সূচক সর্বোচ্চ ৮৯১৮.৫১ পয়েন্ট উন্নীত হয় এবং ২০১০ সালের ৩ জানুয়ারি ডিএসই’র সাধারণ মূল্যসূচক সর্বনিম্ন ছিল ৪৫৬৮.৪০ পয়েন্ট।
বাজার মূলধন থেকে জিডিপি’র অনুপাত : ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি ডিএসই’র বাজার মূলধন থেকে জিডিপি’র অনুপাত ১৯ দশমিক ৭৪ থেকে গত দুই বছরে বৃদ্ধি পেয়ে ২০১০ সালের ৩০ ডিসেম্বর ৫০ দশমিক ৮০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
আইপিও: ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ২০১০ সালে প্রথম বারের মত ট্রাভেল এন্ড লেজার খাতের ১টি, ১টি করপোরেট বন্ড, ১টি কনর্ভাটেবল বন্ড, ১০টি মিউচুয়ালসহ মোট ১৮টি সিকিউরিটিজ ২ হাজার ৬৫৩ কোটি ৬৫ লাখ ৮৫ হাজার টাকার পেইডআপ ক্যাপিটাল সম্পন্ন পাবলিক অফারিং এ আসে। এর মধ্যে ১ হাজার ৩২৭ কোটি ৯৫ লাখ ২৪ হাজার টাকার সাধারণ জনগণের জন্য বরাদ্দ থাকে। অন্যদিকে ২০০৯ সালে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে টেলিকমিউনিেিকশন খাতের কোম্পানি গ্রামীণফোনসহ ৭টি মিউচ্যুয়াল ফান্ড, ১টি রিপিট পাবলিক অফারিং (আরপিও) ২৩১৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকার পেইডআপ ক্যাপিটাল সম্পন্নœ মোট ১৮টি সিকিউরিটিজ পাবলিক অফারিং (আইপিও) এ আসে। যার মধ্যে ৮৯১ কোটি ৭২ লাখ ৫৮ হাজার টাকা সাধারণ জনগণের জন্য বরাদ্দ থাকে।
তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজ: ২০১০ সালে ডিএসইতে রেকর্ড সংখ্যক সিকিউরিটিজ তালিকাভুক্ত হয়। ২০১০ সালে ডিএসইতে মোট ৩০ হাজার ৯৫৭ মিলিয়ন টাকার পেইডআপ ক্যাপিটাল সম্পন্ন ২৫টি সিকিউরিটিজ ডিএসইতে তালিকাভুক্ত হয়। যার মধ্যে ১২টি মিউচ্যুয়াল ফান্ড, ১টি বন্ড, ১টি করপোরেট বন্ডসহ মোট ১২টি কোম্পানি। অন্যদিকে ২০০৯ সালে ৩টি মিউচ্যুয়াল ফান্ডসহ ১৯ হাজার ৪১০ মিলিয়ন টাকা সম্পূর্ণ ১৫টি সিকিউরিটিজ ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয়।
কাগজের শেয়ার বিলুপ্তকরণ: ২০১০ সালের ১ অক্টোবর থেকে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে কাগজের শেয়ার লেনদেন বিলুপ্ত করা হয়।
সেরা ধস: এ বছর সেরা দুইটি ধসের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৮ ডিসেম্বর সকাল ১১টায় ডিএসইতে লেনদেন শুরু হওয়ার আধা ঘণ্টার মধ্যে সাধারণ মূল্যসূচক ৫৪৫ পয়েন্টের বেশি নেমে যায়। এটি ছিল দেশের শেয়ারবাজারে ইতিহাসে অল্পসময়ের মধ্যে একদিনে সর্বোচ্চ পতন। এদিন ২২৯টি কোম্পানির শেয়ারের দর কমে যায়। এ কারণে বিনিয়োগকারীরা রাস্তায় নেমে আসে এবং রাস্তায় টায়ার দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়।
অন্যদিকে ইতিহাসের সর্বোচ্চ দরপতন ঘটে গত ১৯ ডিসেম্বর। ডিএসইতে এদিন সাধারণ মূল্যসূচকের পতন হয়েছে ৫৫১ পয়েন্ট, যা ডিএসইর ইতিহাসে এর আগে কোন দিন হয়নি। এদিন লেনদেন হওয়া ২৪৩টি কোম্পানির মধ্যে দর বেড়েছে মাত্র ৫টি কোম্পানির। আর দর কমেছে ২৩৬টি কোম্পানির। ১৯৯৬ সালের ৫ নভেম্বর ২৩৩ পয়েন্ট সূচকের পতন ঘটেছিল।
ওটিসি মার্কেট: শেয়ার বাজারের বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রায় দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ৬ই সেপ্টেম্বর, ২০০৯ইং তারিখে তালিকাভুক্ত দুর্বল মৌলভিত্তির জেড শ্রেণীভুক্ত নিষ্ক্রিয় বা তুলনামূলক মন্দ কোম্পানিগুলোর শেয়ার লেনদেনের জন্য ওভার দ্যা কাউন্টার বা ওটিসি মার্কেট নামে বিকল্প মার্কেট চালু করে। এতে শেয়ারবাজারের অগ্রগতি আরও একধাপ এগিয়ে যায়। তালিকাচ্যুত কোম্পানিগুলোর শেয়ার লেনদেনের ত্রে তৈরি হয় এই বাজারে। বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা পূরণে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ওটিসি মার্কেটকে আরও গতিশীল ও কার্যকরী ও ব্যাপক আকারে বিস্তৃতকরণের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। ২০০৯ সালের ৬ সেপ্টেম্বর দেশের প্রধান পুঁজিবাজারে ওটিসি মার্কেট চালু হওয়ার পর সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশন ২০০৯ সালের ৪ অক্টোবর পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বেসরকারি খাতের ইউসিবিএল ব্যাংকসহ লেনদেন স্থগিতকৃত ‘জেড’ শ্রেণীভুক্ত দুর্বল মৌলভিত্তির ৫১টি কোম্পানিকে স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে তালিকাচ্যুত করে ওটিসি মার্কেটে লেনদেনের সুযোগ দেয়া হয়। ২০১০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর মধ্যে ‘জেড’ ক্যাটাগরিভুক্ত ২৫টি কোম্পানি ডিমেট করতে ব্যর্থ হওয়ায়, ২০১০ সালের ১ অক্টোবর থেকে ওই ২৫টি কোম্পানিকে ওটিসিতে পাঠানো হয়। পরবর্তী সময় সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশন এর আদেশে ২০১০ সালের ৫ অক্টোবর পরিপ্রেেিত দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন বন্ধ ও লোকসান থাকার কারণে শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দর অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় শেয়ারবাজারে এক ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়ায় ২০১০ সালের ২০ অক্টোবর থেকে আরও ৪টি কোম্পানিকে ওটিসি মার্কেটে প্রেরণ করা হয়। বর্তমানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে ৭৯টি কোম্পানি তালিকাভুক্ত রয়েছে। ২০১০ সালের ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ওটিসি মার্কেটে ৭৯টি কোম্পানির মোট ৫ লাখ ২ হাজার ৯২১টি শেয়ার লেনদেন হয়। যার মোট মূল্য ১৩ কোটি ৪৫ লাখ ৯১ হাজার ৫৩৭ টাকা।
ডিএসই থেকে সরকারের রাজস্ব আয়: ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে শেয়ার লেনদেনের ওপর উৎসে কর সংগ্রহ করে জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর ২০১০ পর্যন্ত ৩১৫ কোটি ৩৮ লাখ ৮৪ হাজার ৫৭ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিয়েছে। এর আগের বছর ২০০৯ সালে এ খাত থেকে সরকারের আয়ের পরিমাণ ছিল ৬২ কোটি ৪৬ লাখ ৩৯ হাজার ২৪০ টাকা।
No comments:
Post a Comment