Thursday, December 30, 2010

চাঙা ভাব দিয়ে বছর শেষ করল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ

সম্ভাবনার পাশাপাশি ছিল আনন্দ-বেদনার খতিয়ান

বছর শেষ হতে আর মাত্র এক দিন বাকি। গতকালের লেনদেনই ছিল এ বছরের শেষ লেনদেন কার্যদিবস। হিসাবের খাতায় যেমন অর্জন রয়েছে, আছে সফলতা, তেমনি দুর্ঘটনাও ঘটেছে এ বছর। এরই ধারাবাহিকতায় দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) চাঙা ভাবের মধ্যে দিয়ে সম্পন্ন হলো বছরের শেষ লেনদেন। বৃহস্পতিবার ডিএসইতে লেনদেন হওয়া বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ারের দাম বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে বাজার মূলধন, আর্থিক ও শেয়ার লেনদেন এবং সব সূচক। এছাড়া এদিন ডিএসইতে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, মিউচুয়াল ফান্ড, সিরামিকস সিমেন্ট ও বিমা খাতের শেয়ারের দর বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। গতকাল ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ৩১টি মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ৩০টির এবং ২১টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সব কয়টির শেয়ারের দর বেড়েছে। অন্যদিকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো চলতি বছরে উল্লেখযোগ্য হারে মুনাফা করায় এ খাতের শেয়ারের দাম বেড়েছে।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের মতে, বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) কয়েকটি ইতিবাচক সিদ্ধান্তের কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি পাওয়ায় বাজার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। জানা যায়, বুধবার এসইসি মিউচুয়াল ফান্ডের মার্জিন লোন রেশিও অন্যসব শেয়ারের মতো মিউচুয়াল ফান্ডে ১:১.৫ করে দেওয়ায় ঘোষণা দেওয়ার পরের দিনের লেনদেনে ঘুরে দাঁড়িয়েছে এ খাতটি। এদিন মূল্য বৃদ্ধির শীর্ষ ১০ কোম্পানির তালিকায় ৯টিই ছিল মিউচুয়াল ফান্ড খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো।

গত এক বছর বাংলাদেশের পুঁজিবাজার অনেক দূর এগিয়েছে। এ বছর বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্য যেকোন ধারার তুলনায় পুঁজিবাজার ছিল অনেক বেশি এগিয়ে। তীব্র জ্বালানী সঙ্কটের কারণে দেশের শিল্প, কারখানাসহ বিভিন্ন সেক্টরের বিকাশ যখন প্রায় রুদ্ধ অবস্থা, তখন পুঁজিবাজার চলে এসেছে সকলের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে। বাজার মূলধন জিডিপির অর্ধেকের বেশি হয়েছে। পূর্বের যেকোন সময়ের তুলনায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) ভূমিকা ছিল অনেক বেশি শক্তিশালী। 

১০ সালের বাজার পরিস্থিতি:
২০১০ সালে পুঁজিবাজারে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক সাধারন বিনিয়োগকারী শেয়ারবাজারে যুক্ত হয়েছেন। আগের বছরের চেয়ে প্রায় ১৩ লাখ বেশি বিনিয়োগকারী এ বছর বিনিয়োগে অংশগ্রহণ করেছেন। এ বছর ডিএসইতে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজসমূহের লেনদেনের পরিমাণ ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১০ সালে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে ১৬৯৭ কোটি ৪৫ লাখ সিকিউরিটিজ লেনদেন হয়, যার মূল্য টাকায় ৪লাখ ৯৯১ কোটি টাকা। অপরদিকে ২০০৯ সালে ১ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছিল। এ বছর লেনদেন, বাজার মূলধন ও সাধারন সূচকে প্রায়ই রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। ২০০৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর বাজার মূলধন ছিল ১ লাখ ৯০ হাজার ৩২২ কোটি টাকা, যা এক বছরের মধ্যে ৮৪ শতাংশ বেড়ে ৩ লাখ ৫০ হাজার ৮০০ কোটি টাকায় অবস্থান করছে। একই সাথে সূচক বেড়েছে দ্বিগুন হারে। গত বছরের এ সময়ে ডিএসইর সাধারন সূচক ছিল ৪৫৩৫ পয়েন্ট, যা এক বছর পরে ৮২৯০ পয়েন্টে দাড়িয়েছে। যদিও ৫ ডিসেম্বর সূচক ৮৯১৮ পয়েন্ট পর্যন্ত উঠেছিল। মার্কেট পিই রেশিও (মূল্য আয় অনুপাত) বেড়ে ২৮.৪৭ পয়েন্টে পৌছেছে। যা বিনিয়োগকারীদের ঝুকির বিষয়টি অঙ্গুলী নির্দেশ করছে। ২০০৯ সালে তুলনায় ডিএসইর গড় লেনদেন বেড়েছে প্রায় ১৮৬ শতাংশ। গত বছর ডিএসইর গড় লেনদেন ছিল ৬০৪ কোটি টাকা, যা ২০১০ সালে ১৬০০ কোটি টাকার বেশি হয়েছে। এছাড়া ২০১০ সালের অধিকাংশ দিনই পুঁজিবাজারে উর্ধমুখী প্রবনতা বজায় ছিল। এ বছর লেনদেন হওয়া ২৪৪ কার্যদিবসের মধ্যে সূচক বেড়েছে ১৬০ দিন। এ বছরের ৫ ডিসেম্বর ডিএসইতে সর্বোচ্চ লেনদেন হয়েছিল ৩২৪৯ কোটি টাকা, সর্বোচ্চ সূচক বৃদ্ধি ২০ ডিসেম্বর ৩০৪ পয়েন্ট এবং সর্বোচ্চ পরিমানে সূচকের পতন হয়েছিল ১৯ ডিসেম্বর ৫৫১ পয়েন্ট। ২০১০ সালে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ব্রোকারেজ হাউজের শাখা ৩৫০ থেকে বেড়ে ৬০৮টি হয়েছে। নতুন শাখা স্তাপনের মাধ্যমে এ বছরে ১৬১৫ জনকে অথরাইজড রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে চাকুরী দেয়া হয়েছে।

২০১০ সালের ঐতিহাসিক ঘটনা:
এ বছর পুঁজিবাজারের উল্লেখযোগ্য ঘটনা হচ্ছে ডিসেম্বর মাসের তিনটি বাজার ধস। পরিকল্পিত এ বাজার ধসের কারনে ুদ্র বিনিয়োগকারীরা বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির স্বীকার হয়েছেন। এ কারণে ুব্ধ বিনিয়োগকারীরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ, মিছিল ও ভাঙ্গচুর করেছেন। চেক ও নেটিং বিষয়ে এসইসির দুটি নির্দেশনাকে কেন্দ্র করে ৮ ডিসেম্বর পুঁজিবাজারে এক ঘন্টায় ভয়াবহ রকমের দরপতন ঘটে। সেদিন এক ঘন্টার এ দরপতনে ডিএসই ৫৪৭ পয়েন্ট সূচক হারায়। এ দরপতনের কারনে সাধারন বিনিয়োগকারীরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ মিছিল করলে সেদিনই এসইসি বাধ্য হয়ে চেক ও নেটিং বিষয়ে জারি করা নির্দেশনা স্থগিত করে। এরপর পরবর্তি দু ঘন্টার মধ্যে হারানো ৫৪৭ পয়েন্ট সূচক পূনরুদ্ধার হয়। যা সত্যিই বিস্ময়কর। পরবর্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআরআর (নগদ জমা সংরক্ষন) ও এসএলআর (বিধিবদ্ধ জমা সংরক্ষন) বাড়ানোয় তারল্য সংকটের অজুহাত দেখিয়ে ১২ ও ১৯ ডিসেম্বরের ধস নামানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পুঁজিবাজারে ৮ ডিসেম্বরের এক ঘণ্টার ভয়াবহ দরপতনের স্মৃতি ম্লান হওয়ার আগেই আবারও বড় দরপতন হয় ১২ ডিসেম্বর। এদিন ডিএসইর সাধারণ সূচক কমেছে ২৮৪ পয়েন্ট। ২০০১ সালে এই সূচক চালু হওয়ার পর গত ১০ বছরের মধ্যে এটিই একদিনে সর্বোচ্চ সূচক পতন। ১২ ডিসেম্বরের দরপতন হয়েছে মূলত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দরপতনের কারণে। এদিন ডিএসইতে ৩০টি ব্যাংকের সবক'টি এবং ২১টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২০টি শেয়ারের দর হারিয়েছে। বাজারে তারল্য সঙ্কটের কারনে এ দরপতন হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। একই অজুহাতে ১৯ ডিসেম্বরে ভয়াবহ ধস নামানো হয়েছে। এছাড়া দরপতনের পেছনে একাধিক ঘটনার প্রভাব রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সাধারণত ডিসেম্বরে বাজারের গতিশীলতা কমে যায়। তবে এ ধসের পেছনে আরও কিছু উপাদান যুক্ত হয়েছে। শেয়ারবাজারে যেসব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সীমার বেশি বিনিয়োগ করেছে তাদের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে তা সমন্বয়ের নির্দেশ দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। অন্যদিকে যেসব উদ্যোক্তা অন্য খাতের জন্য ঋণ নিয়ে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেছিলেন তাদের ওই অর্থ ১৫ জানুয়ারির মধ্যে প্রত্যাহারের আলটিমেটাম দেওয়া হয়। এই দুই কারণে বাজারে বিক্রির চাপ বেড়ে যায়। আর এ বিক্রি চাপ বাড়াতে প্রধান ভূমিকা পালন করে কয়েকটি মার্চেন্ট ব্যাংক। এসব কারনে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে যা দরপতনে প্রধান ভূমিকা রাখে। তবে উক্ত তিনটি ধসের পেছনে পুঁজিবাজারে সক্রিয় সিন্ডিকেট জড়িত রয়েছে বলে বাজার সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেছেন। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা কতৃক মেম্বারস মার্জিন বাতিল, শেয়ারে মার্জিন ঋণ বৃদ্ধি ও ঋণ প্রদানে সম্পদ মূল্য বিবেচনার বিষয়টি স্থগিত করলে পরবর্তিতে পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসে।

প্রসঙ্গত, ২০১০ সালের শুরু থেকে পুঁজিবাজারে ঊর্ধ্বমুখীভাব লক্ষ্য করা গেছে। এক বছরের মধ্যে প্রায় ১৩ লাখ নতুন বিনিয়োগকারী পুঁজিবাজারে যুক্ত হওয়ায় বাজার ঊর্ধ্বমুখী অব্যাহত ছিল। একইসঙ্গে চাহিদার তুলনায় শেয়ারের সরবরাহ কম থাকায় তালিকাভুক্ত অধিকাংশ সিকিউরিটিজ অতিমূল্যায়িত হয়ে পড়ে। এতে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকির মুখে পড়ে যায়। অন্যদিকে অতি মূল্যায়িত শেয়ারের পাশাপাশি গুজব এবং কারসাজির কারণে ডিসেম্বর মাসে তিনটি বড় ধরনের ধসের ঘটনা ঘটে। তবে বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার হস্তেেপ পরে অব্যাহত দরপতনের আতঙ্ক থেকে কিছুটা রা পেয়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। অবশেষে পুঁজিবাজার আবার স্বাভাবিক ধারায় ফিরে এসে ঊর্ধ্বমুখী ধারায় বছরের শেষ লেনদেন সম্পন্ন করল।

বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, বৃহস্পতিবার চাঙা ভাবের মধ্য দিয়ে লেনদেন শুরু হয়, যা সারা দিনই অব্যাহত থাকে। দিন শেষে সাধারণ মূল্যসূচক ৭৫ দশমিক ৩৫ পয়েন্ট বেড়ে ৮২৯০ দশমিক ৪১ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে ডিএসই-২০ মূল্যসূচক আগের দিনের চেয়ে ২.৩২ পয়েন্ট বেড়ে ৫২০৪.৯৮ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। ডিএসইতে মোট ১ হাজার ৭৮৩ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে, যা গতকালের চেয়ে ৩০৪ কোটি টাকা বেশি। এদিন ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ২৪৬টি কোম্পানির মধ্যে দাম বেড়েছে ১৮৬টির এবং কমেছে ৫৮টির এবং ২টি কোম্পানির শেয়ারের দাম অপরিবর্তিত থাকে।

এদিকে খাত অনুযায়ী বিশ্লেষণে দেখা যায়, মিউচুয়াল ফান্ড খাতের ৩১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩০টির দাম বেড়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য খাতের মধ্যে ব্যাংকের ৩০টির মধ্যে ২৩টির, সিমেন্টের পাঁচটির মধ্যে সবকটির, সিরামিকের পাঁচটির মধ্যে সবকটির, প্রকৌশলের ২১টির মধ্যে ১৭টির, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ২১টির মধ্যে সবকটির, জ্বালানির ১১টির মধ্যে সাতটির, আইটির পাঁচটির মধ্যে চারটির, বিবিধ প্রতিষ্ঠানের নয়টির মধ্যে পাঁচটির, ওষুধের ১৯টির মধ্যে ১১টির ও বস্ত্রের ২২টির মধ্যে ১৫টি প্রতিষ্ঠানের দাম বাড়ে ।

লেনদেনের ভিত্তিতে প্রধান ১০টি কোম্পানি হলো- সাউথইস্ট ব্যাংক লি., প্রাইম ব্যাংক লি., ন্যাশনাল ব্যাংক লি., ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ, এবি ব্যাংক লি., ওয়ান ব্যাংক লি., বেক্সিমকো লি., সিটি ব্যাংক লি., বে- লিজিং ও ইসলামী ব্যাংক লি.। দর বৃদ্ধিতে প্রধান ১০টি কো¤পানি হলোÑ গ্রামীণ টু স্কিম, সিএমসি কামাল, পিএইচপি মিউচুয়াল ফান্ড-১, এইমস ১ম মিউচুয়াল ফান্ড, পপুলার লাইফ ১ম মিউচুয়াল ফান্ড, গ্রি ডেল্টা মিউচুয়াল ফান্ড, ইস্টার্ন ব্যাংক ১ম মিউচুয়াল ফান্ড, আইসিবি এমপ্লয়ী মিউচুয়াল ফান্ড-১ ও আইএফআইএল ইসলামী মিউচুয়াল ফান্ড-১। অন্যদিকে দাম কমার শীর্ষে প্রধান ১০টি কো¤পানি হলো-ইস্টার্ন ইন্সুরেন্স, মার্কেন্টাইল ইন্সুরেন্স, এইচআর টেক্সটাইল, সোনালী আঁশ, প্রাইম ব্যাংক, ফাইন ফুডস, চিটাগাং ভেজিটেবল, আলহাজ টেক্সটাইল, ফার্মা এইড ও মেঘনা কনডেন্সড মিল্ক।

No comments:

Post a Comment