Wednesday, December 8, 2010

ডিএসইতে ব্যাপক দরপতনে বিনিয়োগকারীদের বিক্ষোভ, ভাঙচুর

Investors protest as share prices dip

দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) বুধবার ব্যাপক দরপতন হয়েছে। লেনদেনের মাত্র সোয়া এক ঘণ্টা শেষে দুপুর ১২টা পাঁচ মিনিটে ডিএসইর সাধারণ সূচক প্রায় ৫৮৮ পয়েন্ট কমে যায়, যা বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা। এ ঘটনায় বিনিয়োগকারীরা ১২টা ১০ মিনিটে ডিএসইর সামনের সড়ক অবরোধসহ বিক্ষোভ শুরু করেন।
বুধবার ডিএসইতে ২৪১টি কোম্পানির লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে দর বেড়েছে ৫৮টির এবং কমেছে ১৭৮টি কোম্পানির শেয়ার ও অপরিবর্তিত ছিল ৫ কোম্পানির শেয়ারের দর ।

সূত্র জানায়, টানা দুদিন মূল্য সংশোধনের পর তৃতীয় দিন সকাল থেকেই সাধারণ সূচক ১০০ পয়েন্ট নিচে অবস্থান করেই ডিএসইর লেনদেন শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় সূচক কমে প্রায় ৫৮৮ পয়েন্ট। ফলে পুঁজিবাজারের ইতিহাসে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বিপুল পরিমাণের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখিন হন। আর উল্লেখযোগ্য পরিমাণের এ দরপতনের জন্য এসইসির দুটি সার্কুলার জারিকে দায়ী করেছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
তবে বিনিয়োগকারীদের বিক্ষোভ মিছিলের পরই সূচকের উর্ধূমুখী প্রবনতা লক্ষ করা গেছে। মাত্র পৌনে দু‘ঘন্টার ব্যবধানে সূচক পতনের হাত থেকে ফিরে এসে ইতিবাচক ধারায় ফিরে আসলেও শেষ পর্যন্ত ১৩৪.২৯ পয়েন্ট সূচক পতনের মধ্য দিয়েই বুধবারের লেনদেন শেষ হয়েছে।

বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, বুধবার সকাল ১১টায় লেনদেন শুরুর সময় অধিকাংশ শেয়ারের দরপতন ঘটলেও মৌলভিত্তির বেশ কিছু কোম্পানির শেয়ারের দর বাড়ায় ডিএসইর সাধারণ সূচক সামান্য বৃদ্ধি পায়। কিন্তু লেনদেন শুরুর ১০ মিনিটের মধ্যেই প্রায় ৯০ শতাংশ শেয়ারের দরহ্রাসের কারণে সূচকের পতন শুরু হয়। এ সময় ডিএসইতে দরবৃদ্ধি পাওয়া কোম্পানির সংখ্যা ছিল মাত্র ২১টি। কিন্তু পরবর্তি ২০ মিনিটের মধ্যে দরবৃদ্ধি পাওয়া কোম্পানির সংখ্যা ৬টিতে নেমে আসে এবং দুপুর সোয়া বারোটায় সূচকের পতন হয় ৫৮৮ পয়েন্ট। এদিকে বুধবার বড় ধরনের পতনের ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত হয়ে শেয়ার বিক্রি করে দেন। এরফলে বিক্রি চাপ বেড়ে যাওয়ায় দ্রুত সূচকের পতন ঘটতে থাকে। এ সময় ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বীমা, প্রকৌশল, জ্বালানীখাতসহ সবগুলো খাতে বড় ধরনের দরপতন ঘটে। পুঁজিবাজারের ইতিহাসে (সূচকের পতন হিসেবে) সবচেয়ে বড় দরপতনের ঘটনায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করলে ধীরে ধীরে বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ারে দরহ্রাসের পরিমাণ কমে আসে। ফলস্বরূপ মাত্র দেড় ঘন্টার ব্যবধানে ডিএসইর সাধারণ সূচক পতনের হাত থেকে ফিরে এসে ৩৪ পয়েন্ট যোগ হয়। সূচক ইতিবাচক ধারায় ফিরে আসায় বিনিয়োগকারীরাও শান্ত হয়ে লেনদেনে মনোযোগ দেন। তবে শেষ পর্যন্ত সুচক পতনের মধ্য দিয়েই বুধবারের লেনদেন শেষ হয়েছে। আগের দিনের চেয়ে সাধারন সূচক ১৩৪ পয়েন্ট কমে ৮৪৫১ পয়েন্ট দাড়িয়েছে। বুধবার ডিএসইতে বেশিরভাগ শেয়ারের দরপতন হলেও লেনদেন হয়েছে ১৯৬৯ কোটি টাকা।

বুধবার পুঁজিবাজারের ধসের ঘটনায় বাজার সংশ্লিষ্টরা এসইসির দুটি সাকৃুলার জারিকে দায়ী করেছেন।
জানা গেছে,  বিও অ্যাকাউন্টে পর্যাপ্ত টাকা না থাকলে শেয়ার কেনা এবং দিনের শেষে অন্য শেয়ার বিক্রি করে তা পূরণ করার সুযোগ বন্ধ করে দেয়া এসইসির সিদ্ধান্ত বুধবার থেকে কার্যকর হয়। এছাড়া বিনিয়োগকারীদের জমা দেওয়া চেক নগদ না হওয়া পর্যন্ত শেয়ার কেনার সুযোগও রহিত করে দিয়েছিল এসইসি। এতে করে বাজারে এ দুটি সিদ্ধান্তের বিরূপ প্রভাব পড়ে। বুধবার বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক বিক্ষোভর মুখে এসইসির টনক নড়ে এবং  দুপুরেই তারা দু’টি সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন।

বুধবার পুঁজিবাজার ধ্বসের বিষয়ে এসইসির চেয়রম্যান জিয়াউল হক খন্দকার সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, এটি নজিরবিহিীন ঘটনা। এ ধরনের পরিস্থিতি আগে কখনো দেখিনি। এসইসি বিষয়টি খতিয়ে দেখবে। তিনি জানান, পুঁজিবাজারে উত্থান-পতন থাকবেই। সম্প্রতি ইন্ডিয়াতেও সূচকের বড় পতন হয়েছে। তিনি বিনিয়োগকারীকে পুঁজিবাজার বিষয়ে যথাযথ ধারণা নিয়ে বিনিয়োগের মাধ্যমে টেকসই বাজার গঠনে সকলের সহযোগিতা চেয়েছেন।

সার্বিক পরিস্থিতিতে ডিএসইর প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) জহুরুল আলম বলেন, বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে কথা বলেছি এবং তাদের বিভিন্ন অভিযোগ শুনেছি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

প্রক্ষ্যদর্শীরা জানান, বিক্ষোভকারীরা দুটি প্রাইভেটকার ভাঙচুর করেন এবং ডিএসইর মূল ফটকে ইটপাটকেল ছোড়েন। রাস্তায় কাগজপত্র পুড়িয়ে তারা বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। এ সময় মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকায় সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে বেলা দুইটার দিকে পুলিশ রাস্তা থেকে বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দিলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

অন্যদিকে ধানমন্ডির ১৫ নম্বর সড়কে সাতমসজিদ রোডে অবস্থিত বেশ ক’টি ব্রোকারেজ হাউজের বিনিয়োগকারীরাও রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।

প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা:
এসইসি’র বিরুদ্ধে বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, এসইসি পরিকল্পিতভাবে বাজারে ধস নামিয়ে জুয়ারিদের (গ্যাম্বলারদের) শেয়ার কেনার সুযোগ করে দিচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা বর্তমান পরিস্থিতিতে ’৯৬-এর ঘটনার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা করে তা প্রতিরোধে প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।

ডিএসইর সাবেক সহ-সভাপতি আহমদ রশিদ লালি বলেন, এ অবস্থায় বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কিত হওয়ার দরকার নেই। তারা আতঙ্কিত হয়ে শেয়ার বিক্রি করতে থাকলে বাজার আরও পড়বে। তিনি বলেন, আগের দু’দিন স্বাভাবিক সংশোধন হয়েছে। আজকের সংশোধনটি অনেক বড়। এসইসির নতুন দু’টি সিদ্ধান্তের কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ব্রোকারেজ হাউজে বিনিয়োগকারীদের জমা দেওয়া চেক ক্যাশ না হওয়া পর্যন্ত এবং একসঙ্গে পাঁচ লাখ টাকার বেশি জমা দেওয়া নিয়ে নতুন নীতি করায় এমনটি হয়েছে।

No comments:

Post a Comment