Monday, December 27, 2010

নজিরবিহীন দরপতনের ধাক্কা সামলে সপ্তাহ পার করল পুঁজিবাজার

পতনের নতুন দৃষ্টান্ত

নজিরবিহীন দরপতনের ধাক্কা সামলে সপ্তাহ পার করেছে পুঁজিবাজার। পতনের এই দৃষ্টান্ত ডিএসইর নতুন ইতিহাস হয়ে থাকল। পতনের দৃষ্টান্ত হিসেবে আর প্রথমেই আলোচনায় আসবে না ১৯৯৬ সাল। আসবে ২০১০ সাল। ১৯ ডিসেম্বর রোববার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে সাধারণ সূচক ৫৫১ দশমিক ৭৭ পয়েন্ট কমেছে। দেশের পুঁজিবাজারের ইতিহাসে এতো দরপতন আর ঘটেনি। ১৯৯৬ সালের ৬ নভেম্বর সূচকের পতন ঘটেছিল ২৩৩ পয়েন্ট। সর্বোচ্চ দরপতনের পরদিন সোমবার আবার মূল্যসূচক ৩০৪ পয়েন্ট বেড়েছে। শেয়ারবাজারের ইতিহাসে এক দিনেই মূল্যসূচকের এটিই সর্বোচ্চ উত্থান। ফলে মূল্যবৃদ্ধিতেও রেকর্ড গড়েছে পুঁজিবাজার। তবে গত সপ্তাহে সাধারণ সূচক ও আর্থিক লেনদেন কমেছে। সপ্তাহে লেনদেন হওয়া পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে তিন দিন চাঙাভাব থাকে শেয়ারবাজারে এবং দুই দিন দরপতন হয়। সব মিলিয়ে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায় বাজার। অন্যদিকে গত সপ্তাহে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা ফেরাতে আগের কয়েকটি সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নিয়েছে সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)।

এদিকে শেয়ারের এ উত্থান-পতনকে ভালো চোখে দেখছেন না বাজার বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এ ধরনের উত্থান-পতন অস্বাভাবিক। তারা আরও বলছেন, শেয়ারবাজারের শক্তি-সামর্থ্য বৃদ্ধি, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং প্রয়োজনীয় আইন ও বিধি-বিধান কার্যকর করায় ১৯৯৬ সালের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টির বড় কোনো আশঙ্কা নেই। তবে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শেয়ারের সরবরাহ না বাড়ায় বাজারে মাঝে মাঝেই অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে।

এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক সালাউদ্দিন আহমেদ খান বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কয়েকটি সিদ্ধান্ত ও বাজারের তারল্য কমে যাওয়ায় মূলত: পুঁজিবাজারে উত্থান-পতন হয়েছে। তবে তিনি বলেন, একদিনে সূচক ৩০০ পয়েন্ট কম-বেশি হলে বাজারে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়। এটা অস্বাভাবিক। বাজার ধীরে সংশোধন হওয়াই মঙ্গলজনক।

অবশ্য পুঁজিবাজারের সংঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করেন, প্রতি বছরই ডিসেম্বর মাসে এসে পুঁজিবাজারে মূল্য সংশোধনের প্রবণতা তৈরি হয়। এর মূল কারণ ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর বার্ষিক হিসাব সমাপণী। বার্ষিক হিসাব চূড়ান্ত করার জন্য এসব প্রতিষ্ঠান তাদের নিজস্ব পোর্টফোলিওর শেয়ার বিক্রি করে মুনাফা তুলে নেয়। জানুয়ারিতে তারা আবার বিনিয়োগ শুরু করলে বাজার ঊর্ধমুখী হয়ে ওঠে। ২০১০ সালেও এর ব্যতিক্রম হয়নি।

জানা যায়, ১৯৯৬ সালের বড় ধসের পর শেয়ারবাজার সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ব্যাপক নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছিল। ওই সময়ে পুঁজি হারানো হাজার হাজার মানুষের মধ্যে শেয়ারবাজার ছিল বড় আতঙ্কের নাম। ১৯৯৬-এ পুঁজি হারানো বিনিয়োগকারীরা তো বটেই সাধারণ মানুষের মধ্যেও নতুন করে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের চিন্তা আসেনি। ফলে হাতেগোনা কিছু মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে শেয়ারবাজারের লেনদেন। ২০০৪ সালের পর থেকে বাজারে বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়তে থাকে। মূলত শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের মাধ্যমে কালো টাকা সাদা করার অবাধ সুযোগ দেয়ার কারণেই সে সময় বিনিয়োগের পরিমাণ বেড়েছিল বলে ধারণা করা হয়। তবে শেয়ারবাজারের বিনিয়োগে স্বাভাবিক গতি ফিরে আসার সূচনা হয়েছে গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে।

বাজার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত সপ্তাহে দুই বাজারেই লেনদেন আগের সপ্তাহ অপো বৃদ্ধি পায়। আগের সপ্তাহের ছয় হাজার ২৮৯ কোটি টাকা থেকে সাত হাজার ৫৯৬ কোটি টাকায় পৌঁছে মোট লেনদেন, যা আগের সপ্তাহের তুলনায় ২০ দশমিক ৭২ শতাংশ বেশি। গত সপ্তাহে ৫ দিনে ডিএসইতে ৭ হাজার ৫৯৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকার ৪৭ কোটি ৭২ লাখ শেয়ার লেনদেন হয়েছে। প্রতিদিন গড়ে এক হাজার ৫১৯ কোটি ২৭ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। আগের সপ্তাহে ৪ দিনে ডিএসইতে ৬ হাজার ২৮৯ কোটি ৮২ লাখ টাকার ৪৭ কোটি ২১ লাখ শেয়ার লেনদেন হয়েছিল। প্রতিদিন গড়ে এক হাজার ৫৭২ কোটি ৪৫ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছিল। এ হিসাবে গত সপ্তাহে ডিএসইতে লেনদেন বেড়েছে এক হাজার ৩০৬ কোটি ৫৪ লাখ। প্রতিদিন গড়ে লেনদেন বেড়েছে ৫৩ কোটি ১৮ লাখ টাকা। তবে আগের সপ্তাহে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের ছুটির কারণে ডিএসইতে লেনদেন একদিন কম হওয়ায় গড় লেনদেনে তেমন তারতম্য ঘটেনি।

সপ্তাহের শুরুতে অর্থাৎ রোববার ডিএসইর বাজার মূলধন ছিল ৩ লাখ ৪৪ হাজার ৯৫৮ কোটি টাকা। সপ্তাহের শেষ দিন বৃহস্পতিবার তা বেড়ে ৩ লাখ ৪৬ হাজার ৭৯০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। এ হিসাবে গত সপ্তাহে ডিএসইর বাজার মূলধন আগের সপ্তাহের চেয়ে এক হাজার ৮৩২ কোটি টাকা বেড়েছে।

এ সপ্তাহে ডিএসইতে দু’টি সূচকের অবস্থাই ছিল নেতিবাচক। মাঝখানে দুই দিন সূচকের বড় ধরনের উন্নতি সত্ত্বেও সপ্তাহের শেষ দিন সূচকের আবার পতন ঘটে। সপ্তাহের শুরুতে ডিএসইর সাধারণ মূল্যসূচক ছিল ৮ হাজার ২০৬ দশমিক ১৭ পয়েন্ট। সপ্তাহ শেষে তা কমে ৮ হাজার ১০৮ দশমিক ১১ পয়েন্টে নেমে এসেছে। এ হিসাবে মূল্যসূচক ৯৮ দশমিক ০৭ পয়েন্ট কমেছে, শতাংশের হিসাবে যা ১ দশমিক ২০ শতাংশ।

গত সপ্তাহে ২৪৮টি প্রতিষ্ঠান লেনদেনে অংশ নেয়। এর মধ্যে দর বেড়েছে ৫৩টির, কমেছে ১৯৩টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ২টি কোম্পানির শেয়ারের দর।

সপ্তাহের লেনদেন ও মূল্যবৃদ্ধি এ দুই দিক থেকেই ডিএসই’র শীর্ষে ছিল টেলিকমিউনিকেশন খাতের একমাত্র প্রতিষ্ঠান গ্রামীণফোন। দশ মাস স্পট মার্কেটে কাটিয়ে ২০ ডিসেম্বর থেকে কোম্পানিটি স্বাভাবিক বাজারে লেনদেন শুরু করলে লেনদেন ও মূল্য দুইই বেড়ে যায়। ৪৬৫ কোটি টাকায় কোম্পানিটির এক কোটি ৭৫ লাখ শেয়ার বেচাকেনা হয় গত সপ্তাহে, যা ডিএসই’র মোট লেনদেনের ছয় শতাংশেরও বেশি।
গত সপ্তাহে ডিএসইতে যেসব কোম্পানির শেয়ার সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে সেগুলো হলÑ গ্রামীণফোন ৪৬৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকা, তিতাস গ্যাস ৪২০ কোটি ২৫ লাখ টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংক ৩৯১ কোটি ৯৬ লাখ টাকা, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক ২৫৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা, বেক্সিমকো লিমিটেড ২২৩ কোটি ১৯ লাখ টাকা, প্রাইম ব্যাংক ২১৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা, সাউথ ইস্ট ব্যাংক ১৮৪ কোটি ২৬ লাখ টাকা, এবি ব্যাংক ১৮৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকা, বে লিজিং ১৭৮ কোটি ৮৪ লাখ টাকা এবং ম্যাকসন্স স্পিনিংয়ের ১৪৬ কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। গত সপ্তাহে ডিএসইতে যেসব কোম্পানির শেয়ারের দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছে সেগুলো হলÑ গ্রামীণফোন, লিব্রা ইনফিউশন, ন্যাশনাল ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, তিতাস গ্যাস, বিডি ওয়েল্ডিং, জেমিনি সি-ফুড, ওশান কনটেইনার এবং প্রথম আইসিবি মিউচুয়াল ফান্ড। অপরদিকে গত সপ্তাহে ডিএসইতে যেসব কোম্পানির শেয়ারের দাম সবচেয়ে বেশি কমেছে সেগুলো হলÑ পদ্মা অয়েল, সোনালী আঁশ, ফার্মা এইড, সায়হাম টেক্সটাইল, দুলামিয়া কটন, ইস্টার্ন হাউজিং, হাক্কানী পাল্প অ্যান্ড পেপার, সাভার রিফ্রাক্টরিজ, গোল্ডেন সন ও ইমাম বাটন।

গত সপ্তাহে পদ্মা অয়েল কোম্পানি বিগত বছরের জন্য ১০০ ভাগ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে।
এছাড়াও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা ফেরাতে গত সপ্তাহে আগের ৪টি সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করেছে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। এসব সিদ্ধান্তের মধ্যে ঋণ বাড়ানো, এনএভি পদ্ধতি প্রত্যাহার এবং গ্রামীণফোন ও ম্যারিকোকে স্পট মার্কেট থেকে মূল মার্কেটে নিয়ে আসা হয়। অপরদিকে সিআরআর এবং এসএলআর বাড়ানো সংক্রান্ত সময়সীমা বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এছাড়াও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের শেয়ার কেনার নির্দেশ দিয়েছে এসইসি। ফলে সোমবার দিনের শুরু থেকেই মূল্যসূচক বাড়তে থাকে।

No comments:

Post a Comment