Sunday, December 19, 2010

আবারও বড় ধরণের দরপতন ডিএসইতে


দেশের পুঁজিবাজারে আবারও বড় ধরণের দরপতনের ঘটনা ঘটেছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সর্বোচ্চ সাধারণ মূল্যসূচকের পতন হয়েছে। পতন হয়েছে ৫৫১ পয়েন্ট, যা ডিএসইর ইতিহাসে এর আগে কোন দিন হয়নি। অবশ্য এটাকে দরপতন না বলে ধস বলে অভিহিত করেছেন বাজার বিশ্লেষকরা। লেনদেন হওয়া ২৪৩টি কোম্পানির মধ্যে দর বেড়েছে মাত্র ৫টি কোম্পানির। অপরদিকে দরহ্রাস পেয়েছে ২৩৬টি কোম্পানির। রোববার দরপতন দিয়ে লেনদেন শুরু ও শেষ হয়। এর আগে গত ৮ ডিসেম্বর সূচকের বড় ধরনের পতনের কারণে বিনিয়োগকারীরা বিক্ষোভ মিছিল করেছিল।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সাধারণ মূল্যসূচক আগের দিনের চেয়ে ৫৫১.৭৭ পয়েন্ট কমে ৭৬৫৪.৪১ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে ডিএসই- ২০ মূল্য সূচক আগের দিনের চেয়ে ৩০৯.৫৬ পয়েন্ট কমে ৪৫৭৫.৫৭ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। ডিএসই’তে ১৪৮৬ কোটি ৮১ লাখ ৪৭ হাজার ৭৭২ টাকামোট লেনদেনের হয়েছে, যা আগের দিনের চেয়ে ২১৬ কোটি ৮৭ লাখ টাকা বেশি।

এসবের পেছনে বাজার বিশ্লেষকরা অবশ্য বাংলাদেশ বাংকের নির্দেশনাকেই দায়ী করছেন। একইসঙ্গে গত কয়েক মাস শেয়ারবাজার ঊর্ধ্বমুখী থাকায় বাজারে মূল্য সংশোধন হওয়াটাও জরুরি ছিল বলে অভিমত প্রকাশ করেন। তবে গত দু’ সপ্তাহের কোনও কোনও দিন একদিনে ২ শ‘র বেশি সূচক কমে যাওয়াকে অস্বাভাবিক বলেও মন্তব্য করেন তারা।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ১৫ ডিসেম্বর থেকে তফসিলি ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে দৈনিক জমার হার (সিআরআর ও এসএলআর) আগের তুলনায় দশমিক ৫ শতাংশ বাড়িয়েছে। এতে করে ব্যাংকগুলোকে আগের তুলনায় ২ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত জমা দিতে হচ্ছে। এছাড়াও ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ব্যাংকগুলো পুঁজিবাজারে বিনিয়োগক করা অতিরিক্ত অর্থ তুলে আনার নির্দেশ রয়েছে। এ কারণে বাজারে আর্থিক লেনদেন কমে গেছে। তবে সিএসআরআর ও এসএলআর এর বাড়ানো-কমানো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতিরই অংশ, যা মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর। সুতরাং এর শেয়ার বাজার সংশ্লিষ্টতা প্রশ্ন বিদ্ধ। কারণ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বিধিমোতাবেক পুঁজিবাজারে যায়নি বলেই এই প্রশ্ন উঠেছে। এ মতও অনেকে পোষণ করছেন।
 
এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ওসমান ইমাম বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা কারণে ব্যাংকগুলো পুঁজিবাজার থেকে অতিরিক্ত অর্থ তুলে নিচ্ছে। আর এ কারণে বাজারে লেনদেন কমে গেছে। সেইসঙ্গে বাজারে নগদ অর্থের পরিমাণ কমে যাওয়ায় বেশির ভাগ শেয়ারের দাম কমছে বলেও জানান তিনি। এ দরপতন ডিসম্ভর মাস পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, তবে বাজার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই।

এ অবস্থায় সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) বাজার পর্যালোচনা কমিটির বৈঠকে বাজারে তারল্য বৃদ্ধির জন্য মার্জিন ঋণের পরিমাণ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। পূর্বের ১:১ হারের পরিবর্তে ১:১.৫ হারে ঋণ প্রদান করতে পারবে ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। একই সাথে ঋণ প্রদানে শেয়ারের সম্পদ মূল্য বিবেচনার পদ্ধতিও স্থগিত করা হয়েছে। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে স্পট মার্কেটে থাকা ম্যারিকো ও গ্রামীণ ফোন কোম্পানির শেয়ার লেনদেন মূল মার্কেটে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। এসইসির মূখপাত্র ও নির্বাহি পরিচালক আনোয়ারুল কবীর ভূইয়া সাংবাদিকদের এ কথা জানান।
তিনি জানান, আজ সোমবার থেকেই এসইসির নেয়া এসব সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে। তিনি জানান, বাজারে দরপতন ওঠকাতে সকালে এসইসির বাজার পর্যালোচনা কমিটির সভায় মেম্বারস মার্জিন বর্ধিত হার বিষয়ে এসইসির পূর্বের নেয়া সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু এ সিদ্ধান্ত নেয়ার পরও দরপতন ঠেকানো যায়নি। তাই লেনদেন শেষে ঋণ মার্জিন বাড়ানো ও ঋণ প্রদানে সম্পদ মূল্য বিবেচনার বিষয়টি স্থগিত করা হয়।
আনোয়ারুল কবীর ভূইয়া বলেন, ডিসেম্বর মাসে সাধারণত পুঁজিবাজারে দরপতনের ঘটনা ঘটে থাকে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএলআর ও সিআরআর’র কারণেও বাজারে তারল্য সঙ্কট হয়েছে। সার্বিক বিষয় বিবেচনায় এনে এসইসি এসব সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এদিকে রোববার পুঁজিবাজারের অব্যাহত দরপতনে করনীয় ঠিক করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে বৈঠক করে সিকিউরিটি এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। বৈঠকে ব্যাংকগুলো তাদের গ্রাহকদের এক কোটি টাকার অধিক ঋণের তথ্য জানানোর সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে। একইসাথে যেসব গ্রাহক ব্যাংক থেকে শিল্প ঋণ নিয়ে অন্যখাতে ব্যবহার করেছেন সেসব ঋণ সমন্বয়ের জন্য ১৫ ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়েছে।

অন্যদিকে ডিএসই সূত্রে জানা যায়, লেনদেন শুরুর প্রথম এক ঘন্টায় ডিএসইর সাধারণ সূচক ৩০০ পয়েন্ট পড়ে গেলে বিনিয়োগকারীরা বেলা সোয়া ১২টায় রাস্তায় নেমে এসে বিক্ষোভ করে। বিক্ষোভকারীরা ডিএসই সংলগ্ন রাস্তা অবরোধ করার ফলে শাপলা চত্বর থেকে ইত্তেফাক মোড় পর্যন্ত রাস্তায় সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বেলা ১টা থেকে বিনিয়োগকারীদের সাথে পুলিশের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া হয়। বিক্ষোভকারীরা পুলিশের দিকে ইট পাটকেল মেরেছে। বিক্ষোভকারীদের ইটের আঘাতে দৈনিক কালের কন্ঠের ফটো সাংবাদিক খোরশেদ আলম রিংকু আহত হন।
রোবববার লেনদেন শেষে পুঁজিবাজারের ইতিহাসে সর্বোচ্চ দরপতনের ঘটনা ঘটায় ডিএসইর সূচক ৫৫১ পয়েন্ট কমে ৭৬৫৪ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। ডিএসইতে লেনদেন হয়েছে ১৪৮৬ কোটি টাকা। উল্লেখ্য এর আগে ৮ ডিসেম্বর চেক ও নেটিং বিষয়ে এসইসি দুটি নির্দেশনা জারি করায় পুঁজিবাজারে বড় দরপতনের ঘটনা ঘটে। সেদিন লেনদেন শুরু প্রথম এক ঘন্টায় প্রায় সাড়ে ৪শ পয়েন্ট সূচকের পতন হয়। যদিও দরপতনের মুখে সেদিন এসইসি উক্ত দুটি নির্দেশনার কার্যকারিতা স্থগিত করে।

প্রধানমন্ত্রীর হস্তপে কামনা: পুঁজিবাজারের পরিস্থিতি ঠিক রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রীর হস্তপে কামনা করেছেন বিনিয়োগকারীরা। গতকাল বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ এসইসির কর্মকর্তাদের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত এক বৈঠক এ দাবী করেন। বৈঠকে পুঁজিবাজারের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে বিনিয়োগকারী আপেল মাহমুদ, এনামুল করিম বাবলু এবং মইনুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে বিনিযোগকারী আপেল মাহমুদ সাংবাদিকদের জানান, বৈঠকে পুঁজিবাজার পরিস্থিতি নিয়ে এসইসির নির্বাহি পরিচালক আনোয়ারুল কবির ভূঁইয়ার সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। আনোয়ারুল কবির জানান, রোববার সকালে এনএভি পদ্ধতি তুলে দেয়ার জন্য বলা হয়েছিল। কিন্তু এসইসির দুই সদস্যের বাধার কারণে পারিনি। তিনি আরও বলেছেন, ওই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারাই এসইসিকে জিম্মি করে রেখেছে। তাদের অপসারণ না করলে পুঁজিবাজারের পরিস্থিতি ঠিক হবে না। বিনিয়োগকারীরা মনসুর আলম ও ইয়াসিন আলীর পদত্যাগ দাবি করেন। তবে গতকাল বিকালে এসইসির মিটিং শেষে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে আনোয়ারুল কবির ভূঁইয়া বিনিয়োগকারীদের বক্তব্য নাকচ করে দিয়ে বলেন, তাদের সংঙ্গে আমার এধরণের কোন কথাই হয়নি। 

No comments:

Post a Comment