এইমস মামলা: রায় বিনিয়োগকারীদের পক্ষে
এইমস ফার্স্ট মিউচ্যুয়াল ফান্ড মামলার রায় গত সপ্তাহে বিনিয়োগকারীদের অন্যতম প্রধান আলোচিত বিষয়। ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন বা এসইসির একটি সিদ্ধান্ত কেন্দ্র করে। এইমসের ৭০ শতাংশ বোনাস ও ১৩০ শতাংশ রাইট শেয়ারের ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করেছিল এসইসি। তা মেনে নেয়নি এই ফান্ডে বিনিয়োগকারীরা। বিষয় গড়ায় আদালতে। আইনী লড়াইয়ের পর রায় যায় বিনিয়োগকারীদের পক্ষে। মঙ্গলবার মামলার রায় হয়। সেই ফান্ডের দাম একদিনে বাড়ে ১৯.৯৮ শতাংশ। বুধবার ২০.৩০ টাকা দিয়ে শুরু হয়ে ২২.৩৪ টাকায় শেষ হয়েছে এর লেনদেন। দর বৃদ্ধিতে সেদিনের শীর্ষ ১০টি কোম্পানির শীর্ষে থাকে এইমস প্রথম মিউচ্যুয়াল ফান্ড। অথচ মিউচ্যুয়াল ফান্ডের আরও ২৭টি কোম্পানির মধ্যে দাম বেড়েছে মাত্র ৪টির, কমেছে ২৩টির দাম।
এই মামলা জেতায় এইমস বোনাস ও রাইট শেয়ার দেয়ার আগের ঘোষণায় অনড় আছে। তবে, এক্ষেত্রে এসইসির নির্দেশের অপেক্ষায় এর কর্তৃপক্ষ। রায়ের কপি হাতে পেলে আনুষ্ঠানিকভাবে এসইসির কাছে সিদ্ধান্ত জানতে চাওয়া হবে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন, সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান এইমস ফার্স্ট মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইয়াওয়ার সাঈদ।
আদালতের রায়ের পর, ঘুরে দাঁড়ালো কী মিউচ্যুয়াল ফান্ড খাত, এমন প্রশ্নের জবাবে নেতিবাচক জবাব ইয়াওয়ার সাঈদের। মামলাটির একটি নির্দিষ্ট ফান্ডের বিনিয়োগকারীদের প্রাপ্য বিষয় বলে মন্তব্য তার। তিনি জানান, আইনী লড়াইটি হয়েছে এসইসি ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে।
বাজারে বেশ কিছু মিউচ্যুয়াল ফান্ড আসলেও আইপিওর মালিকরা তেমন সুবিধা করতে পারছেন না। একসময় নতুন ফান্ডের আইপিও বাজারে নেমেই ২০ বা ২৫ টাকায় অনায়াসে বিক্রি হয়ে যেত। অথচ, সম্প্রতি একটি ফান্ড পনের টাকায় ও ওঠতে পারেনি। এদিকে, এই পরিস্থিতিতে নতুন ফান্ডে আইপিও’র জন্য আবেদনকারীদের ভিড় কমছে। মিউচ্যুয়াল ফান্ডের বিষয়ে বাজারে এক ধরনের নেতিবাচক কথারও প্রচলন হয়েছে। অনেক বিনিয়োগকারীই মনে করেন, মিউচ্যুয়াল ফান্ড একটি অংশীদারিত্বের পুঁজি যার মর্যাদা শেয়ারের কিছুটা নিচে। আবার অনেকেই মনে করেন এটি বুড়ো মানুষের বিনিয়োগ। মিউচ্যুয়াল ফান্ড মানে, নিরাপদ বিনিয়োগ বছর শেষে লভ্যাংশ।
আবার অনেকেই মনে করেন শেয়ারের তীব্র চাহিদার বিপরীতে মিউচ্যুয়াল ফান্ড বাজারকে দারুণভাবে সহায়তা করতে পারতো। তবে তার জন্য এসইসিকে কিছু আইনিী সংশোধনী আনতে হবে বলে মনে করেন ইয়াওয়ার সাঈদ। তিনি জানান, ২০০৬ সালে এসইসি আইন সংশোধন করে জুন মাসে সব ফান্ডের জন্য বুক কোজার বা বাৎসরিক হিসাব শেষ করার বিধান করে। ফলে, একই সঙ্গে সব ফান্ড লভ্যাংশ ঘোষণা করে। আর এই ঘটনা কেন্দ্র করে বছরের তিন থেকে চার মাস মনোযোগ পায় ফান্ড। কিন্তু আগের মতো, যে মাসে বাজারে আসবে ফান্ড, পরের বছর সেই মাসে ডিভিডেন্ড ঘোষনা করার বিধান করা হলে, একটির পর একটি মিউচ্যুয়াল ফান্ড, বছর ধরেই ডিভিডেন্ড ঘোষনার সুযোগ পেত। আর এতে বছর ধরেই একটির পর একটি ফান্ড বিনিয়োগকারীদের মনোযোগ পেত।
নিয়ন্ত্রণের নতুন পদক্ষেপ: টার্গেট বড় বিনিয়োগকারী !
একদিকে পুঁজিবাজার নিজেই নিজের রেকর্ড অতিক্রম করছে অন্যদিকে বাজার নিয়ন্ত্রণে মরিয়া নিয়ন্ত্রক সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন বা এসইসি। এই পরিস্থিতিতে শেয়ার বাজারে প্রতিদিনই বাড়ছে বিনিয়োগ, তার সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে বিনিয়োগকারী। অবশ্য বসে নেই নিয়ন্ত্রক এসইসিও। বাজারের লাগাম টেনে ধরতে বাজার পর্যালোচনা কমিটির বৈঠক থেকে নেয়া হচ্ছে নানা নিয়ন্ত্রণমূলক সিদ্ধান্ত। গত সপ্তাহে তাদের নতুন একটি সিদ্ধান্ত, মুখে মুখে ফিরেছে বিনিয়োগকারীদের। আর তা হলো, দিনে এককোটি টাকা বা এর বেশি লেনদেন করলে সেই বিনিয়োগকারীর তথ্য জানানো বাধ্যতামূলক করা। প্রতিদিন লেনদেন শেষে সংশ্লিষ্ট ব্রোকারেজ হাউস এই তথ্য সরবরাহ করবে। যাহোক, ধরা যাক প্রতিদিন এককোটি টাকা লেনদেন করেন যিনি, তিনি বড় বিনিয়োগকারী। কারণ, দুই বিনিয়োগকারী একা বাজারের ওঠা-নামায় কোন প্রভাব ফেলতে পারেনা। কাজেই যে বিনিয়োগকারী বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে না তাকে আমলে আনার কথা নয়, নিয়ন্ত্রক সংস্থার। যেহেতু, এক দিনে কমপক্ষে এক কোটি টাকা বা তার বেশি লেনদেনকারীকে পর্যবেক্ষণের আওতায় এনেছে এসইসি, ধরে নেওয়া যেতে পারে তিনি প্রভাবশালী। সে হিসেবে দেখলে, অনেক বিনিয়োগকারীর মতে, ব্যক্তি পর্যায়ে প্রভাবশালী বিনিয়োগকারীদের নজরদারির আওতায় নিয়ে এলো এসইসি।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, অন্তত দিনে এক কোটি টাকা লেনদেন করেন বা করার ক্ষমতা রাখেন এমন বিনিয়োগকারীর সংখ্যা কতো হবে? এর সঠিক পরিসংখ্যান জানা নেই। তবে, এসইসির হাতে যেহেতু এই হিসাব চলে আসবে, তাদের উচিত হবে সংখ্যাটি প্রকাশ করা। একই সঙ্গে এর চেয়ে কম বিনিয়োগ করে যারা, অর্থাৎ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর সংখ্যাও প্রকাশ করার একটি সুযোগ এসইসির সামনে এসেছে।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সংখ্যা প্রকাশ করা উচিত। কারণ, কোন সিদ্ধান্ত নিলে এসইসি বলে, বাজার নিয়ন্ত্রণের স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হলো ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থেই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। আবার বিশ্লেষকরা বলেন, সাধারণ বা ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। বিশেষ করে, বাজারে কোন বড় ধরণের পতন হলে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলেও প্রচার করা হয়। এ পরিস্থিতিতে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী কত শতাংশ তার একটি পরিসংখ্যান থাকা ভালো বলে মত দিয়েছেন অনেক বিনিয়োগকারী। তাতে পরিষ্কার হবে, বাজার সংশ্লিষ্ট কত শতাংশ বিনিয়োগকারীর স্বার্থে কে কী বলছেন। আর কে, কী উদ্যোগ নিচ্ছেন। তাদের মতে, এখন দেখার বিষয় এসইসি যে সব তথ্য বাধ্যতামূলকভাবে আদায় করছে তা কী কাজে লাগায় বা সে সব তথ্য প্রকাশ করে কী না। তবে, এর সঙ্গে ভিন্ন মত পোষণ করেন, প্রাইলিংক সিকিউরিটিজের চেয়ারম্যান ডা, জহিরুল ইসলাম। তিনি মনে করেন, বড় বিনিয়োগকারীদের নজরদারির আওতায় আনা নয়, লোকবলের অভাবে এসইসি একটি নির্দিষ্ট সীমার লেনদেনকে সামনে রেখে খতিয়ে দেখার চেষ্টা করছে, ব্রোকারেজ হাউসে কোন অনিয়ম হয় কিনা। তার মতে, এসইসির উদ্দেশ্য অনিয়ম খুঁজে বের করা। এখন দিনে এক কোটি টাকা লেনদেনকারীর একাউন্ট দেখা হচ্ছে, কিছু দিন পর হয়তো তা ৫০ লাখ বা ৫০ হাজারে নেমে আসতে পারে।
ডা. জহিরুল ইসলাম জানান, প্রতিদিন গড়ে ৩ লাখ বিনিয়োগকারী লেনদেন করেন। প্রতিদিন তাদের সবার একাউন্ট পরীক্ষা করে, অনিয়ম হয়েছে কীনা তা নির্ধারণ করা এসইসির পক্ষে কঠিন। তাই লেনদেনের সীমা বেঁধে অনুসন্ধান চালানো পদ্ধতিগতভাবে কিছুটা সহজ হয়। আবার অনেক বড় বিনিয়োগকারী আছেন, যারা ৫০ কোটি বা মোটা অংকের টাকার শেয়ার কিনে রেখেছেন দুই বা তিন বছর ধরে কিন্তু লেনদেন করছেন না। তাদের বিষয়ে তথ্য জানতে চাওয়া হচ্ছে না। ফলে, বড় বিনিয়োগকারীরা এসইসির টার্গেট একথা মোটা দাগে না বলাই ভালো বলে মনে করেন তিনি। উল্লেখ্য যে, এসইসির এই আদেশ সোমবার জারি করা হয়েছে এবং তা কার্যকর করা হয়েছে। এছাড়াও কোটি টাকা লেনদেনকারী গ্রাহকের ক্রয়-বিক্রয় আদেশ, বেনিফিশিয়ারি ওনার্স বা বিও হিসাবে কী শেয়ার ছিল- সে তথ্য, গত এক সপ্তাহের আর্থিক খতিয়ান, পোর্টফোলিওতে এক সপ্তাহের লেনদেনের সংপ্তিসার দিতে বলেছে এসইসি।
বিভাগীয় শহরের বাইরে আর নয়
গত সপ্তাহে এসইসি আরো একটি গুরুত্বপূর্ন সিদ্ধান্ত নেয়। এটি হলো ব্রোাকারেজ হাউজের শাখা খোলা বিষয়ক। প্রযুক্তির বদৌলতে এবং ব্রোকারেজ হাউসের কর্মতৎপরতায় মতিঝিল থেকে ভৈরব বা বরিশালের দুরত্ব সমান হয়ে গেছে অনেক আগেই। সিলেট বা অন্য কোন শহরের অনেকেই এখন শেয়ার বাজারমুখী হয়েছেন, এ কথা নতুন নয়। সেসব শহরে বসে, মতিঝিলের বিনিয়োগকারীদের মতোই লেনদেন করতে পারছেন তারা। শেয়ার বাজার ভিত্তিক বিভিন্ন পত্রিকায় সেসব বিনিয়োগকারীদের খবর ও প্রতিক্রিয়া ছাপাও হয় গুরুত্ব দিয়ে। অর্থাৎ শেয়ার বাজারের এক ধরনের বিকেন্দ্রীকরণ শুরু হয়েছে এরই মধ্যে। তারও লাগাম টানা হলো এসইসির সিদ্ধান্তে। বাজার পর্যালোচনা কমিটির বৈঠক থেকে সাফ জানিয়ে দেয়া হলো, বিভাগীয় শহরের বাইরে ্েব্রাকারেজ হাউসের আর কোন শাখা খোলার অনুমোদন দেবে না এসইসি। তবে তা চিরদিনের জন্য নয়। শেয়ারের সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য না আসা পর্যন্ত এ সিদ্ধান্ত বলবৎ থাকবে বলে জানানো হয় এসইসির তরফে।
এ কথা ঠিক, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষকে যত বেশী শেয়ার বাজারের দিকে টেনে আনা হবে শেয়ারের চাহিদা ততই বাড়বে। এতে আরো বাড়তে পারে অতিমূল্যায়ন। সেেেত্র এসইসির সিদ্ধান্ত অনেক বিশ্লেষকই নীতিগত ভাবে মেনে নেবেন। কিন্তু বিনিয়োগ করে মুনাফা অর্জন করার অধিকার ঢাকার বিনিয়োগকারীর যেমনি রয়েছে, বিভাগীয় শহরের বাইরের বিনিয়োগকারীদের আধিকারও রয়েছে সমান সমান। সে েেত্র তাদের কাছে সুযোগ পৌঁছানো হবে না, সেটি মেনে নিতে নারাজ অনেকেই। অবশ্য এই সমস্যার সমাধার এসইসির বক্তব্যেই আছে। তারা ধারণা দিয়েছেন এই সিদ্ধান্ত শেয়ারের সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য না আসা পর্যন্ত বহাল থাকবে। এসইসির এসব কথা থেকে অবশ্য শেয়ারের সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়ে একটি অলিখিত আশ্বাস পেতেই পারেন বিনিয়োগকারীরা। তবে এখন দেখার বিষয়, কত দ্রুত এসইসি শেয়ারের চাহিদা এবং সরবরাহের একটি ভারসাম্যের পরিবেশ তৈরী করতে পারে।
কাগুজে শেয়ারের গল্পটি ফুরালো
’৯৬ সালের আগের মতিঝিলের কার্ব মার্কেট এখন কেবল স্মৃতি। বাজারে বিনিয়োগ এবং বিনিয়োগকারী যেমনি বেড়েছে, তেমনি লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়াও। ২০০৪ সালের ২৪ জানুয়ারি দেশে প্রথমবারের মতো ইলেকট্রনিক শেয়ার লেনদেন শুরু হয়েছিলো। সেদিন স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের কাগজের শেয়ার ইলেকট্রনিক শেয়ারে রূপান্তর করে, ডিম্যাট যুগের সূচনা করে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন বা এসইসি।
এর প্রায় সাত বছরের মাথায় এসে ফুরাতে বসেছে কাগুজে শেয়ারের গল্প। নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইসির নির্দেশ ছিলো শেয়ার ডিম্যাট করার। এই নির্দেশ দেয়া হয় চলতি বছরের ১ জুন, প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে বলা হয়, ১ অক্টোবর থেকে স্টক এক্সচেঞ্জের মূল বোর্ডে কোনো কাগজের শেয়ার লেনদেন হবে না। সে জন্য সব কাগজের শেয়ারকে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ডিম্যাট করার সময় বেঁধে দেয়া হয়। এই সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারেনি এমন ২৫টি কোম্পানিকে তালিকাচ্যুতও করা হয়। মূল বোর্ড থেকে সরে যায় তাদের লেনদেন। এসব কোম্পানির শেয়ার ওভার দ্য কাউন্টার বা ওটিসি নামের বাজারে আগ্রহীদের আলাদাভাবে লেনদেন করার ব্যবস্থা করা হয়।
এবাজারটি অবশ্য বিনিয়োগকারীদের কাছে খুব একটা সমীহের বাজার নয়। প্রচলিত আছে, পুঁজিবাজারে যেসব কোম্পানি নিয়মিত বার্ষিক সাধারণ সভা বা এজিএম করে না, লভ্যাংশ দেয় না এবং নিয়মনীতি মানতে খুব একটা আগ্রহী নয়, সেসব কোম্পানিকে শাস্তিস্বরূপ মূল বোর্ড থেকে সরিয়ে ওটিসি বাজারে পাঠানো হয়।
সব মিলিয়ে ৪৬ টি কোম্পানীর কাগুজে শেয়ার ছিল বাজারে। গত তিন মাসে এর মধ্যে ২১টি কোম্পানির শেয়ার ডিম্যাট করায়, মূল বোর্ডেই সেগুলোর লেনদেন হচ্ছে। যেসব কোম্পানি ডিম্যাট করেনি বা করতে পারেনি, সেগুলোই যাচ্ছে ওটিসিতে।
লভ্যাংশ দেয় না বা এজিএম করেনা এমন কোম্পানির শেয়ার বাজারে জেড শ্রেণীর শেয়ার নামে পরিচিত। পর পর দুই বছর বা তারও বেশি সময় ধরে এই ‘জেড’ শ্রেণীতে পড়ে আছে এমন কোম্পানির শেয়ার মূল বোর্ড থেকে তালিকাচ্যুত করার সিদ্ধান্ত ছিলো এসইসির। সোমবার এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এতে এ ধরনের কোম্পানির সংখ্যা দাঁড়ায় ১২টি। জানা গেছে, এই সিদ্ধান্ত থেকে মঙ্গলবার সরে এসেছে সংস্হাটি। চারটি কোম্পানিকে ওটিসিতে পাঠানোর জন্য দুই স্টক এক্সচেঞ্জকে নির্দেশ দিয় এসইসি। নির্দেশ অনুযায়ী, ২০ অক্টোবরের মধ্যে এসব কোম্পানিকে ওটিসি বাজারে পাঠাতে হবে।
যা হোক, এসইসির এই সিদ্ধান্ত ব্যাপক আলোচিত-সমালোচিত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। যদিও, এসইসি মনে করছে বাজারের স্বার্থে এবং শেয়ার সংকট এড়াতে সংশোধন আনতে হয়েছে তাদের সিদ্ধান্তে। সংশোধনী অনুয়াযী কেবল উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ আছে এমন কোম্পানিকে ওটিসিতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তাতেই কমে আসে কোম্পানির সংখ্যা। নিজের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন বা সংশোধন করার মতা ও অধিকার এসইসির আছে। এনিয়ে কারো কোন কথা নেই। কিন্তু বিনিয়োগকারীরা মনে করে, হুটহাট সিদ্ধান্ত নয়, তাদের বিনিয়োগ রা করার সময়, দেয়া উচিত এসইসির। কারণ এসইসির এধরনের সিদ্ধান্তে বিনিয়োগকারীদের অনেকেরই শেয়ার কেনা বা বেচার বিষয়টি ভাবতে হয়। এসইসির সিদ্ধান্তে বিনিয়োগকারী আচমকা লোকসান গুনলে বাজার সম্পর্কে এক ধরণের ভীতি তৈরি হয় বলে জানিয়েছেন বেশ কয়েকজন বিনিয়োগকারী ।
প্লেসমেন্ট বাণিজ্য:নতুন কার্ব মার্কেট !
ইলেকট্রনিক ট্রেডিং শুরুর পর দেশে কার্ব মার্কেটের বিলুপ্তি ঘটে। সেকেন্ডারি মার্কেটে এখন আর কার্ব মার্কেটের অস্তিত্ব নেই, তবে প্রাইমারি মাকের্টে প্লেসমেন্ট বাণিজ্যের যে সব কথা শুনা যায়, তা কার্ব মার্কেটে রুপান্তরিত হচ্ছে বলে মনে করেন সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান এইমস ফার্স্ট মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইয়াওয়ার সাঈদ। তাঁর মতে এটি আঁচ করতে পেরে নিয়ন্ত্রক এসইসি বেশ কিছু পদপে নিয়েছে। এেেত্র এসইসির পদপেকে স্বাগত জানান তিনি। ইয়াওয়ার সাঈদের সঙ্গে অবশ্য একমত ডা. জহিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, কোন কোন কোম্পানির পুঁজি সংগ্রহের প্রবণতা নিয়ে যেসব কথা শুনা যায়, তা খতিয়ে দেখা যেতে পারে।
গত সপ্তাহের বাজার: রেকর্ডের ছড়াছড়ি
সূচক সাত হাজারের মাইল ফলক পার হওয়ার পর, গত সপ্তাহে বেশ কয়েকবার নিজেকে অতিক্রম করেছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ। হয়েছে নানমুখি রেকর্ড। সপ্তাহের শুরু হয় পাঁচটি রেকর্ড দিয়ে। সাধারণ সূচক, সার্বিক সূচক, লেনদেন, লেনদেনকৃত শেয়ারসংখ্যা ও মূলধনের এ রেকর্ডগুলো হয়। বরিবার সাধারণ মূল্যসূচক আগের দিনের চেয়ে ১২৬ পয়েন্ট বেড়ে ৭২২৩.৪৮ পয়েন্টে স্থির হয়। আগের দিন বৃহস্পতিবার সাধারণ মূল্যসূচক ছিল ৭০৯৭.৩৮ পয়েন্ট। লেনদেন হয় দুই হাজার ৪৮৯ কোটি ২১ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। এর আগে গত ১৬ জুন লেনদেনের সর্বোচ্চ রেকর্ড দুই হাজার ৪৮৬ কোটি চার লাখ ৩৭ হাজার টাকা। শেয়ার দুই লাখ ৯৯ হাজার ২২২ বার লেনদেন হয়। আগের দিন এ সংখ্যা ছিল দুই লাখ ৮৪ হাজার ৬৪৯ বার। ডিএসইর সার্বিক সূচক বৃহষ্পতিবারের চেয়ে ১০০ পয়েন্ট বেড়ে ৬০৩১.৪৭ পয়েন্টের নতুন রেকর্ড হয়। এদিন মূলধনের পরিমাণ ছিল তিন লাখ ১৬ হাজার ৩৫৫ কোটি ৬৪ লাখ ৭২ হাজার ৭৪৭ টাকা। আগের দিন এ রেকর্ড ছিল তিন লাখ ১১ হাজার ৩২৩ কোটি ৩১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। বারবার শেয়ারের দর ওঠানামার পরও সোমবার দিনশেষে আবারও সূচক ও বাজার মূলধনসহ চারটি নতুন রেকর্ড হয়।
এদিন সাধারণ মূল্যসূচক ৩৯.০৩ পয়েন্ট বেড়ে ৭২৬২.৫১ পয়েন্টে পৌঁছায়।
লেনদেনকৃত শেয়ারসংখ্যা তিন লাখ ছয় হাজার ৯৫৭ বার, যা আগের দিন ছিল দুই লাখ ৯৯ হাজার ২২২ বারের। বাজার মূলধনের পরিমাণ ছিল তিন লাখ ১৮ হাজার ৯৬২ কোটি ১১ লাখ ২৪ হাজার ৬৫৬ টাকা। এ ছাড়া ডিএসইর সার্বিক মূল্যসূচকেরও রেকর্ড হয়।
মঙ্গলবারেও বাজারে ঊর্ধ্বগতি ছিল। দিনশেষে ডিএসই’র সাধারণ ও সার্বিক মূল্যসূচক, বাজার মূলধন ও শেয়ার সংখ্যায় রেকর্ড হয়েছে।
দিনশেষে সাধারণ সূচক আগের দিনের চেয়ে প্রায় ৬৫ পয়েন্ট বেড়ে হয় সাত হাজার ৩২৭ পয়েন্ট। সাধারণ সূচকের পাশাপাশি সার্বিক মূল্যসূচক আগের দিনের চেয়ে প্রায় ৩১ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়ায় ছয় হাজার ৯০ পয়েন্টে। ডিএসইর বাজার মূলধন মঙ্গলবার এক দিনে প্রায় ৬৩৮ কোটি টাকা বেড়ে দাঁড়ায় তিন লাখ ১৯ হাজার ৬০০ কোটিতে। এ ছাড়া লেনদেন হওয়া শেয়ারের দিক থেকেও নতুন রেকর্ড হয়। এদিন ডিএসইতে প্রায় ১৪ কোটি ৫২ লাখ ৭৩ হাজার শেয়ার হাতবদল হয়।
বুধবার সূচক ও বাজার মূলধনের তিনটি রেকর্ড হয়। লেনদেন বাড়ে ২৩৯ কোটি টাকারও বেশি।
বুধবার ডিএসইর সাধারণ মূল্যসূচক আগের দিনের চেয়ে ৮৫.২৯ পয়েন্ট বেড়ে পৌঁছায় ৭৪১২.৬১ পয়েন্টে। আগের দিনের চেয়ে ৮০.২৬ পয়েন্ট বেড়ে সার্বিক সূচকের নতুন রেকর্ড ৬১৭০ পয়েন্টে। এদিন মূলধনের পরিমাণ ছিল তিন কোটি ২২ লাখ ৮১৯ কোটি ৩২ লাখ ৯৮ হাজার ১৯৩ টাকা। বৃহস্পতিবার দুই হাজার আটশ এক কোটি টাকার লেনদেন হয়। যা একদিনে সর্বোচ্চ লেনদেনে ডিএসইর নতুন রেকর্ড সূচনা করলো।
আনোয়ার সাদী
উৎস: দৈনিক ইত্তেফাক, ৯ অক্টোবর, শনিবার।
No comments:
Post a Comment