এক সময় টিউশনি ছাত্রদের টাকা আয়ের উৎস ছিলো। শেয়ার বাজারের বদৌলতে তা অনেকের জন্যেই বদলে গেছে। বিশেষ করে ঢাকার বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের জন্যে। অল্প টাকা দিয়ে শুরু করলেও ক্রমান্বয়ে অনেকেই নিজেদের পড়ালেখা চালিয়ে নেয়ার মতো আয় করতে পারছেন শেয়ার বাজার থেকেই। শুধু ছাত্র নয়, অন্যান্য অনেক পেশার অনেকেই ঝুঁকেছেন এই ‘টাকার বাজারে’। শুধু যে নিজেদের শিল্প বন্ধ করে বড় পুঁজি নিয়ে ব্যবসায়িরা এসেছেন এই বাজারে, তা নয়, কেউ কেউ এই বাজার থেকে টাকা তুলে নিয়ে নিজেদের শিল্প গড়ে ভালো আছেন। এ ছাড়া টেলিফোনে লেনদেন, টিভি-ইন্টারনেটে দাম উঠা নামার তথ্য সহজলভ্য হওয়ায়, গৃহিনী বা সরকারি- বেসরকারি চাকরীজীবী সবার জন্যেই, বাড়তি আয়ের উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে এই বাজারকে। ফলে, প্রতিদিনই এই বাজারে নবাগতের সংখ্যা বাড়ছে। মাত্র কিছু দিন আগেও যেখানে বিও একাউন্টের সংখ্যা ছিলো ২৬ লাখ, এখন তা ৩০ লাখে উন্নীত হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। বিভিন্ন উদ্যোগে ঢাকা-চট্টগ্রাম শহরের বাইরেও গড়ে উঠছে ব্রোকারেজ হাউজ। আর তাতে অল্প পুঁজি নিয়ে হলেও, জড়িয়ে যাচ্ছেন অনেক মানুষ। এখানে গ্রাহক শ্রেণীর মনোযোগের কারণ আয় করার বাসনা। মুনাফার টাকা হাতে আসা আনন্দের তাদের জন্যে, কিন্তু বাজার পতনে টাকা হারানোর শোক বুকে পুষে আছেন, এমন বিনিয়োগকারীও কম নেই। প্রয়োজনের তুলনায় ভালো শেয়ারের সরবারাহ কম বাজারে, এ কথা নতুন নয়। বুঝে শুনে বিনিয়োগের আহ্বানও নতুন কিছু নয়। এ কথাও সবাই জানেন, বিদ্যমান শেয়ার গুলোই হাত বদল হচ্ছে এবং দাম বাড়ছে। ফলে, অতি মূল্যায়িত বাজার নিয়ে চিন্তিত নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন বা এসইসি। বাজারের লাগাম ধরে রাখতে নানা সিদ্ধান্ত তারা নিচ্ছেন, সেগুলো যতটুকু আলোচনার জন্ম দিচ্ছে ততটুকু কাজ দিচ্ছে না বলেই মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। বিনিয়োগকারীদের পর বাজারের দিকে মনোযোগ রয়েছে এমন আরেক মহল ধরা যাক এসইসিকে। সর্বশেষ ‘এনএভি’ বিবেচনায় মার্জিন লোন’ নিয়মের বাস্তবায়নে কঠোর মনোভাব দেখিয়ে বেশ বড় মাপের আলোচনায় এসেছে সংস্থাটি। এ বিষয়ে মাচের্ন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসের প্রতিবাদের মুখে, নিজেদের সিদ্ধান্তে অটল থাকলে, আদালতে আশ্রয় নেয় বিনিয়োগকারীরা। আর এর মাধ্যমে, উচ্চ আদালতের মনোযোগও আকৃষ্ট করা হলো পুঁজিবাজারের দিকে। ধরা যাক, বাজার নিয়ে ভাবতে হচ্ছে এই মুহূর্তে, এমন আরেকটি প্রতিষ্ঠান আদালত।
কোম্পানির প্রকৃত সম্পদমূল্য বা এনএভির ভিত্তিতে শেয়ারের বিপরীতে ঋণ বিতরণ বিষয়ে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের দুটি আদেশের কার্যকারিতা তিন মাসের জন্য স্থগিত করে হাইকোর্ট।
একই সঙ্গে বিচারপতি মামনুন রহমান ও বিচারপতি সৈয়দা আফসার জাহান সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ একটি রুলও জারি করেন। এসইসির আদেশ কেন অবৈধ হবে না এবং ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে বাজার স্থিতিশীল রাখতে দীর্ঘমেয়াদে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ কেন দেয়া হবে না, তা জানাতে রুল ইস্যু করা হয়। জবাব দিতে এসইসি, অর্থ মন্ত্রণালয়, ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জকে এক মাস সময় বেঁধে দেয়া হয়।
যে সিদ্ধান্ত নিয়ে এতো কিছু হচ্ছে, সেটি করা হয়েছিলো ২০০৬ সালে। শেয়ারবাজারে অতিরিক্ত তারল্যপ্রবাহ কমাতে এসইসি সম্প্রতি সেই বিধানটি কার্যকরের সিদ্ধান্ত নেয়।
আগেই বলা হয়েছে, মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসগুলো শুরু থেকেই এই নিয়মের বিরোধিতা করে, এর সঙ্গে যোগ হলো বিনিয়োগকারীদের আইনের আশ্রয় নেয়া। এসইসি অবশ্য আপীল করে প্রমাণ করে দিয়েছে বিনা যুদ্ধে তারা সূঁচাগ্র মাটির কণাও ছাড়বে না।
শেয়ার বাজারের দিকে মনোযোগী অপর প্রতিষ্ঠান হলো ব্যাংক ও অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান। নিজেদের প্রচলিত ব্যবসার পাশাপাশি পুঁজি বাজারও তাদের জন্য ব্যবসার ভালো জায়গা, এটা বুঝতে কষ্ট হয়নি চৌকস ব্যাংকারদের। এ খাত থেকে তারা মুনাফাও তুলেছেন বেশ। সবকিছু চলছিলো ঠিকঠাক। কিন্তু, তাদের কিছু প্রতিষ্ঠানের বেপরোয়া কার্যক্রম বাজারের দিকে মনোযোগি করে তুলে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে। আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা বাজায় রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর হয় তাদের প্রতি। জারি করে নিয়ন্ত্রণমূলক নানা সার্কুলার। এই মুহূর্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নজর রাখতে হচ্ছে বাজারের দিকে। কারণ বাজারের উঠানামার সঙ্গে বেশ কিছু ব্যাংকের আমানতের বিষয় জড়িত।
এখানেই শেষ নয়, পুঁজি বাজারের দিকে সতর্ক নজর আছে অর্থ মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটিরও। এসইসির সাম্প্রতিক উদ্যোগ এবং এগুলো কাজে এলো কী এলো না সে বিষয়ে আলোচনা হয় অর্থ মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির বৈঠকেও। কমিটির মতে, এসইসির ভূমিকা বাজারকে অস্থির করে তুলতে পারে। তাই বাজার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ বা ডিএসই, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ বা সিএসই, মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন, পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সমন্বয়ে গঠিত পরামর্শক কমিটির সঙ্গে আলোচনা করার সুপারিশ করা হয়েছে বৈঠক থেকে। বৈঠকের সুপারিশের বিষয়ে নানাজনের নানামত থাকতে পারে। তবে একটি বিষয় পরিস্কার। শেয়ার বাজার এই মুহুর্তে যত মহলের মনোযোগ পাচ্ছে, অন্য সময়ে তা হয়নি। এ থেকে বাজারের দিকে সরকারের সতর্ক দৃষ্টি আছে বলে অনুমান করলে তা ভুল হবে না। কিন্তু, মুদ্রার একদিকে এতোকিছু হচ্ছে, মুদ্রার অপরদিকে সপ্তাহ জুড়েই নতুন রেকর্ড উপহার দিয়ে বিপুল ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে পুঁজিবাজার।
সূচকের নতুন রেকর্ড, বাজারের সূবর্ণ সময়
বাজার পরিস্থিতি নিয়ে যখন নিয়ন্ত্রকদের এতো ভাবনা চিন্তা, এনএভি ভিত্তিক ঋণ নিয়ে টানাপোড়েন চলছে, তখন ঢাকা ষ্টক এক্সচেঞ্জ আলোচিত নতুন মাইল ফলকের জন্য। গত সপ্তাহে এর সাধারণ সূচক অতিক্রম করলো সাত হাজার পয়েন্টের সীমানা। সোমবার এই রেকর্ড হলো। এর আগে চলতি মাসের ২১ তারিখে ডিএসসির সাধারণ সূচক পৌঁছায় ৬ হাজার ৯৪৭ পয়েন্টে। তখনি অনেক বিনিয়োগকারী ধারণা করছিলেন, এই সূচক সাত হাজারের মাইলফলক অতিক্রম করবে। ঘরোয়া আড্ডায় বিনিয়োগকারীদের অনেকেই কথার ছলে একে অপরের কাছে জানতে চান, সূচক কবে ১০ হাজার পয়েন্টের মাইল ফলক অতিক্রম করবে। এটা তারা কল্পনা করতেই পারেন। কারণ, তাদের কাজ বিনিয়োগ করা এবং মুনাফা পকেটে নেয়া। সূচক যত বাড়ে, বাজার তত ভালো, এই কথাটি সব বিনিয়োগকারীরই জানা আছে। ফলে, নতুন মাইল ফলক তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়াবে এতে কোন সন্দেহ নেই। তারা চাইতেই পারেন বাজার আরো ভালো হোক। কিন্তু এবিষয়ে তাদের মনোভাবের সঙ্গে নিয়ন্ত্রক এসইসির মনোভাব নাও মিলতে পারে। কারণ বাজারে অঘটন কিছু হলে, তার দায়িত্ব তাদেরই নিতে হবে।
ফলে, নতুন মাইলফলক অতিক্রমের ঘটনাটি নানা মহল নানাভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। কেউ কেউ সহজ সরল ভাবে বলে দিয়েছেন, সুবর্ণ সময় যাচ্ছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের। বেশী বিনিয়োগকারী বেশী টাকা নিয়ে এসেছেন। তাই বাজার চাঙ্গা আছে। বাজার মূলধনের অংকও তাদের কথাকে সমর্থন করে। সোমবার বাজার মূলধন ছিলো ৩ লাখ ৯ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকার বেশী। তার আগের দিন রবিবার ছিলো ৩ লাখ ৭ হাজার ৬১৬ কোটি টাকার বেশী। এই পরিস্থিতিকে সূবর্ণ সময় না বলার কোন কারণ নেই। কিন্তু বাজার বিশ্লেষকদের অনেকেই এই পরিস্থিতিকে ইতিবাচক হিসেবে নিতে পারছেন না। তারা মনে করছেন পর্যাপ্ত শেয়ারের সরবরাহ না থাকায় এই পরিস্থিতি ঠিক সূবর্ণ সময় নয়, নগদ টাকার প্রবাহ এবং যে কোন ভাবে শেয়ার কেনার প্রবণতারই প্রকাশ। উদ্দেশ্য মুনাফা অর্জন। এই প্রতিযোগিতায় বড় বিনিয়োগকারীদের তেমন কোন সমস্যা না থাকলেও কারো কারো মতে, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সতর্ক হয়েই পথচলা উচিত।
আরো বিনিয়োগ চায় ডিএসই
শেয়ার বাজারের এই জোয়ারেও আরো বিনিয়োগ আশা করে ঢাকা ষ্টক এক্সচেঞ্জ। যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়ে ডিএসই সভাপতি শাকিল রিজভী প্রবাসীদের বিনিয়োগ করার আহ্বান জানিয়েছেন। এক্ষেত্রে আলোচনায় আসে অন-লাইন ট্রেডিং শুরু করার বিষয়টি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রবাসীরা এগিয়ে এলে বাজারের সূচক আরো বাড়বে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। শাকিল রিজভী, প্রবাসীদের কাছে পুঁজিবাজারের চমৎকার ইমেজ তুলে ধরেছেন বলে জানা গেছে। প্রবাসীদের জানানো হয়েছে, এখন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে ১ লাখ প্রবাসী বিনিয়োগকারী রয়েছে।
মিউচ্যুয়াল ফান্ড
বাজারে বেশকিছু মিউচ্যুয়াল ফান্ড আসছে। কিন্তু তা বিনিয়োগকারীদের মাঝে তেমন সাড়া ফেলছে না বলে জানাচ্ছেন বিশ্লেষকরা। মিউচ্যুয়াল ফান্ড প্রথম দিনেই ২০ বা ২৫ টাকায় বছরখানেক আগেও বিক্রি হতো বলে জানাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। তবে এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। প্রথম দিন ১৫ টাকা দাম উঠলেই তা লুফে নেন শেয়ারের মালিকরা। দাম কম উঠায়, মিউচ্যুয়াল ফান্ডের জন্য আইপিও’র আবেদনের হারও কমে যাচ্ছে দিন দিন। কিন্তু প্রতি মাসেই নতুন নতুন মিউচ্যুয়াল ফান্ড বাজারে আসছে।
বর্তমান অতিমূল্যায়িত বাজার নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্ত শেয়ার সরবরাহের তাগিদ দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। কিন্তু মিউচ্যুয়াল ফান্ডের সরবরাহ থাকলেও তা এক্ষেত্রে তেমন কোন প্রভাব ফেলছে না বলে জানাচ্ছেন তারা।
বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেলো, তারা মিউচ্যুয়াল ফান্ডকে বাজারের অতিথি হিসেবে দেখেন। একটি মেয়াদের পর চলে যাবে সেই ফান্ড। কেউ সোজা সাপ্টা জবাব দেন, লাভ কম, তাই আগ্রহ কম।
অবশ্য, মিউচ্যুয়াল ফান্ড অন্য কোম্পানির শেয়ারের মত বোনাস বা রাইট শেয়ার দেয় না। এইমস মিউচ্যুয়াল ফান্ড একবার উদ্যোগ নিয়েছিলো। ফান্ডের ডিভিডেন্ড ঘোষনায় ৭০ শতাংশ বোনাস ও ১৩০ শতাংশ রাইট এর ব্যবস্থা করা হলে, তা প্রত্যাখ্যান করেছিলো এসইসি। সেই ঘটনা একটি মামলার সূত্রপাত করে, সেটি এখনো বিচারাধীন।
মিউচ্যুয়াল ফান্ডের এই পরিস্থিতিতে এবার বাজারে আসছে অমেয়াদী মিউচ্যুয়াল ফান্ড। সেটি বাজারের অতিথি নয়, থেকে যাবে সব সময়। এই ফান্ড নিয়ে আসবে প্রাইম ফাইন্যান্স এসেট কোম্পানি। এর নাম হবে প্রাইম ফাইন্যান্সিয়াল ফার্স্ট ইউনিট ফান্ড। জানা গেছে, ইউনিট ফান্ডটি শেয়ার বাজারের অন্য মেয়াদি ফান্ডের মতো তালিকাভূক্ত হবে না। ফলে, এর লেনদেন প্রক্রিয়াটি একটু আলাদা হবে।
আইপিও সমাচার
মিউচ্যুয়াল ফান্ড নয়, কোন কোম্পানির শেয়ারের আইপিও আবেদন করতে যারা আগ্রহী, তাদের জন্য এটি ভালো খবর। অক্টোবরে নেয়া হবে দেশবন্ধু পলিমারের আইপিওর আবেদন। আবেদন জমা নেয়া হবে ২৪ অক্টোবর থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত। এনআরবি বা প্রবাসিদের জন্য এ সুযোগ থাকবে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত। বাজার থেকে কোম্পানিটি ১৬ কোটি টাকা সংগ্রহ করবে বলে জানা গেছে। এই টাকা সংগ্রহ করতে শেয়ার ছাড়া হবে ১ কোটি ৬০ লাখ। এক ইউনিট শেয়ারের দাম ১০ টাকা। মার্কেট লট হবে ৫০০টিতে। ফলে, এক লট দেশবন্ধু পলিমারের শেয়ার পেতে বিনিয়োগকারীকে গুনতে হবে ৫০০০ টাকা মাত্র।
এদিকে, আগামী কাল রবিবার (৩ সেপ্টেম্বর) থেকে আইপিও আবেদন নেয়া শুরু করবে পিএইচপি মিউচ্যুয়াল ফান্ড। পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির স্পন্সরে পুঁজিবাজারে এটি প্রথম মিউচ্যুয়াল ফান্ড। এর নাম পিএইচপি ফার্স্ট মিউচ্যুয়াল ফান্ড। এর আবেদন নেয়া হবে ৩ অক্টোবর থেকে ৭ অক্টোবর পর্যন্ত। প্রবাসীরা আবেদন পৌঁছাতে পারবেন ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত। এটি একটি ১০ বছর মেয়াদী মিউচ্যুয়াল ফান্ড। ১০ টাকা ফেসভ্যালুর এই ফান্ডের ৫০০টি ইউনিটে একটি লট হবে। এক লটের জন্য বিনিয়োগকারীদের গুণতে হবে ৫০০০ টাকা।
উৎস: আনোয়ার শাদী, দৈনিক ইত্তেফাক, অক্টোবর ৩, ২০১০, শনিবার।
কোম্পানির প্রকৃত সম্পদমূল্য বা এনএভির ভিত্তিতে শেয়ারের বিপরীতে ঋণ বিতরণ বিষয়ে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের দুটি আদেশের কার্যকারিতা তিন মাসের জন্য স্থগিত করে হাইকোর্ট।
একই সঙ্গে বিচারপতি মামনুন রহমান ও বিচারপতি সৈয়দা আফসার জাহান সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ একটি রুলও জারি করেন। এসইসির আদেশ কেন অবৈধ হবে না এবং ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে বাজার স্থিতিশীল রাখতে দীর্ঘমেয়াদে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ কেন দেয়া হবে না, তা জানাতে রুল ইস্যু করা হয়। জবাব দিতে এসইসি, অর্থ মন্ত্রণালয়, ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জকে এক মাস সময় বেঁধে দেয়া হয়।
যে সিদ্ধান্ত নিয়ে এতো কিছু হচ্ছে, সেটি করা হয়েছিলো ২০০৬ সালে। শেয়ারবাজারে অতিরিক্ত তারল্যপ্রবাহ কমাতে এসইসি সম্প্রতি সেই বিধানটি কার্যকরের সিদ্ধান্ত নেয়।
আগেই বলা হয়েছে, মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসগুলো শুরু থেকেই এই নিয়মের বিরোধিতা করে, এর সঙ্গে যোগ হলো বিনিয়োগকারীদের আইনের আশ্রয় নেয়া। এসইসি অবশ্য আপীল করে প্রমাণ করে দিয়েছে বিনা যুদ্ধে তারা সূঁচাগ্র মাটির কণাও ছাড়বে না।
শেয়ার বাজারের দিকে মনোযোগী অপর প্রতিষ্ঠান হলো ব্যাংক ও অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান। নিজেদের প্রচলিত ব্যবসার পাশাপাশি পুঁজি বাজারও তাদের জন্য ব্যবসার ভালো জায়গা, এটা বুঝতে কষ্ট হয়নি চৌকস ব্যাংকারদের। এ খাত থেকে তারা মুনাফাও তুলেছেন বেশ। সবকিছু চলছিলো ঠিকঠাক। কিন্তু, তাদের কিছু প্রতিষ্ঠানের বেপরোয়া কার্যক্রম বাজারের দিকে মনোযোগি করে তুলে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে। আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা বাজায় রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর হয় তাদের প্রতি। জারি করে নিয়ন্ত্রণমূলক নানা সার্কুলার। এই মুহূর্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নজর রাখতে হচ্ছে বাজারের দিকে। কারণ বাজারের উঠানামার সঙ্গে বেশ কিছু ব্যাংকের আমানতের বিষয় জড়িত।
এখানেই শেষ নয়, পুঁজি বাজারের দিকে সতর্ক নজর আছে অর্থ মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটিরও। এসইসির সাম্প্রতিক উদ্যোগ এবং এগুলো কাজে এলো কী এলো না সে বিষয়ে আলোচনা হয় অর্থ মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির বৈঠকেও। কমিটির মতে, এসইসির ভূমিকা বাজারকে অস্থির করে তুলতে পারে। তাই বাজার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ বা ডিএসই, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ বা সিএসই, মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন, পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সমন্বয়ে গঠিত পরামর্শক কমিটির সঙ্গে আলোচনা করার সুপারিশ করা হয়েছে বৈঠক থেকে। বৈঠকের সুপারিশের বিষয়ে নানাজনের নানামত থাকতে পারে। তবে একটি বিষয় পরিস্কার। শেয়ার বাজার এই মুহুর্তে যত মহলের মনোযোগ পাচ্ছে, অন্য সময়ে তা হয়নি। এ থেকে বাজারের দিকে সরকারের সতর্ক দৃষ্টি আছে বলে অনুমান করলে তা ভুল হবে না। কিন্তু, মুদ্রার একদিকে এতোকিছু হচ্ছে, মুদ্রার অপরদিকে সপ্তাহ জুড়েই নতুন রেকর্ড উপহার দিয়ে বিপুল ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে পুঁজিবাজার।
সূচকের নতুন রেকর্ড, বাজারের সূবর্ণ সময়
বাজার পরিস্থিতি নিয়ে যখন নিয়ন্ত্রকদের এতো ভাবনা চিন্তা, এনএভি ভিত্তিক ঋণ নিয়ে টানাপোড়েন চলছে, তখন ঢাকা ষ্টক এক্সচেঞ্জ আলোচিত নতুন মাইল ফলকের জন্য। গত সপ্তাহে এর সাধারণ সূচক অতিক্রম করলো সাত হাজার পয়েন্টের সীমানা। সোমবার এই রেকর্ড হলো। এর আগে চলতি মাসের ২১ তারিখে ডিএসসির সাধারণ সূচক পৌঁছায় ৬ হাজার ৯৪৭ পয়েন্টে। তখনি অনেক বিনিয়োগকারী ধারণা করছিলেন, এই সূচক সাত হাজারের মাইলফলক অতিক্রম করবে। ঘরোয়া আড্ডায় বিনিয়োগকারীদের অনেকেই কথার ছলে একে অপরের কাছে জানতে চান, সূচক কবে ১০ হাজার পয়েন্টের মাইল ফলক অতিক্রম করবে। এটা তারা কল্পনা করতেই পারেন। কারণ, তাদের কাজ বিনিয়োগ করা এবং মুনাফা পকেটে নেয়া। সূচক যত বাড়ে, বাজার তত ভালো, এই কথাটি সব বিনিয়োগকারীরই জানা আছে। ফলে, নতুন মাইল ফলক তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়াবে এতে কোন সন্দেহ নেই। তারা চাইতেই পারেন বাজার আরো ভালো হোক। কিন্তু এবিষয়ে তাদের মনোভাবের সঙ্গে নিয়ন্ত্রক এসইসির মনোভাব নাও মিলতে পারে। কারণ বাজারে অঘটন কিছু হলে, তার দায়িত্ব তাদেরই নিতে হবে।
ফলে, নতুন মাইলফলক অতিক্রমের ঘটনাটি নানা মহল নানাভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। কেউ কেউ সহজ সরল ভাবে বলে দিয়েছেন, সুবর্ণ সময় যাচ্ছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের। বেশী বিনিয়োগকারী বেশী টাকা নিয়ে এসেছেন। তাই বাজার চাঙ্গা আছে। বাজার মূলধনের অংকও তাদের কথাকে সমর্থন করে। সোমবার বাজার মূলধন ছিলো ৩ লাখ ৯ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকার বেশী। তার আগের দিন রবিবার ছিলো ৩ লাখ ৭ হাজার ৬১৬ কোটি টাকার বেশী। এই পরিস্থিতিকে সূবর্ণ সময় না বলার কোন কারণ নেই। কিন্তু বাজার বিশ্লেষকদের অনেকেই এই পরিস্থিতিকে ইতিবাচক হিসেবে নিতে পারছেন না। তারা মনে করছেন পর্যাপ্ত শেয়ারের সরবরাহ না থাকায় এই পরিস্থিতি ঠিক সূবর্ণ সময় নয়, নগদ টাকার প্রবাহ এবং যে কোন ভাবে শেয়ার কেনার প্রবণতারই প্রকাশ। উদ্দেশ্য মুনাফা অর্জন। এই প্রতিযোগিতায় বড় বিনিয়োগকারীদের তেমন কোন সমস্যা না থাকলেও কারো কারো মতে, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সতর্ক হয়েই পথচলা উচিত।
আরো বিনিয়োগ চায় ডিএসই
শেয়ার বাজারের এই জোয়ারেও আরো বিনিয়োগ আশা করে ঢাকা ষ্টক এক্সচেঞ্জ। যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়ে ডিএসই সভাপতি শাকিল রিজভী প্রবাসীদের বিনিয়োগ করার আহ্বান জানিয়েছেন। এক্ষেত্রে আলোচনায় আসে অন-লাইন ট্রেডিং শুরু করার বিষয়টি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রবাসীরা এগিয়ে এলে বাজারের সূচক আরো বাড়বে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। শাকিল রিজভী, প্রবাসীদের কাছে পুঁজিবাজারের চমৎকার ইমেজ তুলে ধরেছেন বলে জানা গেছে। প্রবাসীদের জানানো হয়েছে, এখন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে ১ লাখ প্রবাসী বিনিয়োগকারী রয়েছে।
মিউচ্যুয়াল ফান্ড
বাজারে বেশকিছু মিউচ্যুয়াল ফান্ড আসছে। কিন্তু তা বিনিয়োগকারীদের মাঝে তেমন সাড়া ফেলছে না বলে জানাচ্ছেন বিশ্লেষকরা। মিউচ্যুয়াল ফান্ড প্রথম দিনেই ২০ বা ২৫ টাকায় বছরখানেক আগেও বিক্রি হতো বলে জানাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। তবে এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। প্রথম দিন ১৫ টাকা দাম উঠলেই তা লুফে নেন শেয়ারের মালিকরা। দাম কম উঠায়, মিউচ্যুয়াল ফান্ডের জন্য আইপিও’র আবেদনের হারও কমে যাচ্ছে দিন দিন। কিন্তু প্রতি মাসেই নতুন নতুন মিউচ্যুয়াল ফান্ড বাজারে আসছে।
বর্তমান অতিমূল্যায়িত বাজার নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্ত শেয়ার সরবরাহের তাগিদ দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। কিন্তু মিউচ্যুয়াল ফান্ডের সরবরাহ থাকলেও তা এক্ষেত্রে তেমন কোন প্রভাব ফেলছে না বলে জানাচ্ছেন তারা।
বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেলো, তারা মিউচ্যুয়াল ফান্ডকে বাজারের অতিথি হিসেবে দেখেন। একটি মেয়াদের পর চলে যাবে সেই ফান্ড। কেউ সোজা সাপ্টা জবাব দেন, লাভ কম, তাই আগ্রহ কম।
অবশ্য, মিউচ্যুয়াল ফান্ড অন্য কোম্পানির শেয়ারের মত বোনাস বা রাইট শেয়ার দেয় না। এইমস মিউচ্যুয়াল ফান্ড একবার উদ্যোগ নিয়েছিলো। ফান্ডের ডিভিডেন্ড ঘোষনায় ৭০ শতাংশ বোনাস ও ১৩০ শতাংশ রাইট এর ব্যবস্থা করা হলে, তা প্রত্যাখ্যান করেছিলো এসইসি। সেই ঘটনা একটি মামলার সূত্রপাত করে, সেটি এখনো বিচারাধীন।
মিউচ্যুয়াল ফান্ডের এই পরিস্থিতিতে এবার বাজারে আসছে অমেয়াদী মিউচ্যুয়াল ফান্ড। সেটি বাজারের অতিথি নয়, থেকে যাবে সব সময়। এই ফান্ড নিয়ে আসবে প্রাইম ফাইন্যান্স এসেট কোম্পানি। এর নাম হবে প্রাইম ফাইন্যান্সিয়াল ফার্স্ট ইউনিট ফান্ড। জানা গেছে, ইউনিট ফান্ডটি শেয়ার বাজারের অন্য মেয়াদি ফান্ডের মতো তালিকাভূক্ত হবে না। ফলে, এর লেনদেন প্রক্রিয়াটি একটু আলাদা হবে।
আইপিও সমাচার
মিউচ্যুয়াল ফান্ড নয়, কোন কোম্পানির শেয়ারের আইপিও আবেদন করতে যারা আগ্রহী, তাদের জন্য এটি ভালো খবর। অক্টোবরে নেয়া হবে দেশবন্ধু পলিমারের আইপিওর আবেদন। আবেদন জমা নেয়া হবে ২৪ অক্টোবর থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত। এনআরবি বা প্রবাসিদের জন্য এ সুযোগ থাকবে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত। বাজার থেকে কোম্পানিটি ১৬ কোটি টাকা সংগ্রহ করবে বলে জানা গেছে। এই টাকা সংগ্রহ করতে শেয়ার ছাড়া হবে ১ কোটি ৬০ লাখ। এক ইউনিট শেয়ারের দাম ১০ টাকা। মার্কেট লট হবে ৫০০টিতে। ফলে, এক লট দেশবন্ধু পলিমারের শেয়ার পেতে বিনিয়োগকারীকে গুনতে হবে ৫০০০ টাকা মাত্র।
এদিকে, আগামী কাল রবিবার (৩ সেপ্টেম্বর) থেকে আইপিও আবেদন নেয়া শুরু করবে পিএইচপি মিউচ্যুয়াল ফান্ড। পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির স্পন্সরে পুঁজিবাজারে এটি প্রথম মিউচ্যুয়াল ফান্ড। এর নাম পিএইচপি ফার্স্ট মিউচ্যুয়াল ফান্ড। এর আবেদন নেয়া হবে ৩ অক্টোবর থেকে ৭ অক্টোবর পর্যন্ত। প্রবাসীরা আবেদন পৌঁছাতে পারবেন ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত। এটি একটি ১০ বছর মেয়াদী মিউচ্যুয়াল ফান্ড। ১০ টাকা ফেসভ্যালুর এই ফান্ডের ৫০০টি ইউনিটে একটি লট হবে। এক লটের জন্য বিনিয়োগকারীদের গুণতে হবে ৫০০০ টাকা।
উৎস: আনোয়ার শাদী, দৈনিক ইত্তেফাক, অক্টোবর ৩, ২০১০, শনিবার।
No comments:
Post a Comment