তালিকাভুক্ত কোম্পানির প্রাইভেট প্লেসমেন্টের (প্রি-আইপিও) মাধ্যমে বরাদ্দকৃত শেয়ার বিক্রির উপর নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা (লক ইন) তুলে দেয়া হলে, সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। এর ফলে শেয়ারবাজারে অনৈতিক বাণিজ্যের প্রবণতা ব্যাপকহারে বেড়ে যাবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
এ ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হলে প্লেসমেন্টের মাধ্যমে পাওয়া বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার বিক্রি করে কিছু বড় উদ্যোক্তা লাভবান হলেও শেয়ারবাজারে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে। ফলে ‘লক ইন‘ তুলে না দিয়ে নতুন কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করে শেয়ার সরবরাহ বাড়ানোর পদক্ষেপ নেয়া হলে পুঁজিবাজারের জন্য ইতিবাচক হবে বলে মনে করেন তারা।
জানা গেছে, গত ২৩ আগস্ট জাতীয় সংসদের অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভায় অতিমূল্যায়িত শেয়ারবাজারকে স্থিতিশীল করতে শেয়ার সরবরাহ বাড়ানোর তাগিদ দেয়া হয়। তাৎক্ষণিকভাবে শেয়ার সরবরাহ বাড়াতে শেয়ার লেনদেন নিষ্পত্তির সময় একদিনে নামিয়ে আনা এবং প্লেসমেন্ট শেয়ারের ‘লক ইন’ তুলে দেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে বলা হয়। সভায় বিশেষ আমন্ত্রণে উপস্থিত তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধির প্রস্তাবের প্রেক্ষিতেই সংসদীয় কমিটি এ দুটি বিষয়ে সুপারিশ করেছে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে এসইসি’র সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, প্লেসমেন্ট শেয়ারের ‘লক ইন’ তুলে দিলে শেয়ারবাজারে কারসাজি বেড়ে যেতে পারে। স্বল্প সময়ের মধ্যে বিপুলসংখ্যক শেয়ার বিক্রি করে বড় উদ্যোক্তারা তাদের অর্থ তুলে নেবেন। কিন্তু সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
‘লক ইন‘ তুলে নেয়ার প্রস্তাবের তীব্র বিরোধীতা করেছেন বাজার বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এটি হবে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের প্রতি অবিচারের সামিল। কারণ তারা আইপিওতে একাধিক আবেদন করে কেউ বরাদ্দ পেয়েছেন, কেউ পাননি। প্লেসমেন্টের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীরা লটারি ছাড়াই শেয়ার বরাদ্দ পেয়েছেন। এই আগ্রাধিকারের কারণে তাদের শেয়ার বিক্রিতে কিছু শর্ত থাকে। লক-ইন তুলে নেয়া হলে প্লেসমেন্টের প্রতি প্রভাবশালীদের আগ্রহ আরও বেড়ে যাবে, যা বাজারে নানা কেলেঙ্কারীর জন্ম দেবে। তাছাড়া লক-ইন প্রত্যাহার করা হলেও বাজারে শেয়ারের সরবরাহ আহামরি কিছু বাড়বে না।
বিধি অনুযায়ী, যে কোন কোম্পানির আইপিও অনুমোদনের দিন থেকে পরবর্তী ১ বছর পর্যন্ত প্লেসমেন্ট শেয়ার কেনা-বেচা ও হস্তান্তরে নিষেধাজ্ঞা (লক ইন) থাকে। বর্তমানে তালিকাভুক্ত যেসব কোম্পানির প্লেসমেন্ট শেয়ার বিক্রির উপর ‘লক ইন’ রয়েছে তারমধ্যে সবচেয়ে বেশি শেয়ার রয়েছে গ্রামীনফোনের। আর মাত্র কয়েক দিন পরই এই কোম্পানির শেয়ারের ‘লক ইন’-এর সময় পার হয়ে যাবে। এছাড়া দু’-তিন মাসের মধ্যে আরও কয়েকটি কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ‘লক ইন’ শেষ হবে। ফলে স্বাভাবিক নিয়মেই এসব কোম্পানির প্লেসমেন্ট শেয়ার বিক্রি করা যাবে। এ অবস্থায় ঘোষণা দিয়ে ‘লক ইন’ তুলে দেয়ার প্রয়োজন নেই বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
কোম্পানির মূলধন বাড়ানোর জন্য আইপিওর আগে প্লেসমেন্টের মাধ্যমে শেয়ার বিক্রির নামে দীর্ঘদিন ধরেই বড় ধরনের অনৈতিক বাণিজ্য চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্লেসমেন্টের শেয়ার বরাদ্দের নামে চলছে জমজমাট বাণিজ্য। প্লেসমেন্টের শেয়ারে অধিক মুনাফার কারণে বেশ কয়েক জন বড় ব্যবসায়ী, ব্যাংকার, গুরুত্বপূর্ণ আমলা এবং রাজনৈতিক নেতা এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়ে পড়েছেন।
কোনো কোম্পানি শেয়ারবাজারের আসার প্রক্রিয়া শুরু করলেই প্লেসমেন্টের মাধ্যমে শেয়ার প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে তৎপর হয়ে উঠেন তারা। অনেকেই শেয়ার পাওয়ার জন্য এসইসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং ডিএসই-সিএসই নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন। শেয়ারবাজারকে বড় ধরনের কেলেঙ্কারির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য প্লেসমেন্ট বাণিজ্য বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি বলে মনে করেন বাজার বিশ্লেষকরা।
প্লেসমেন্ট বাণিজ্য বন্ধে ইতোমধ্যেই বেশ কিছু পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে এসইসি। প্লেসমেন্ট নিয়ে নানা ধরনের অনিয়ম সম্পর্কে বেশ কিছুদিন ধরেই এসইসি’র কাছে অভিযোগ এসেছে। এর প্রেক্ষিতে প্লেসমেন্ট নিয়ে অনৈতিক কর্মকা- নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেয় কমিশন। একই ব্যক্তি বা কোম্পানি যাতে বিপুল পরিমাণ শেয়ার বরাদ্দ নিয়ে অনৈতিক বাণিজ্য চালাতে না পারে, সে জন্যই এই প্রক্রিয়ায় শেয়ার বা মিউচ্যুয়াল ফান্ড ইউনিট বরাদ্দের সীমা বেঁধে দেয়া হয়েছে।
এছাড়া প্লেসমেন্টের আগে কোম্পানির বিবরণী (প্রসপেক্টাস) প্রকাশ এবং অভিহিত মূল্যের অতিরিক্ত অর্থ (প্রিমিয়াম) সংগ্রহের যৌক্তিকতা প্রমাণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই অবস্থায় র্নিধারিত সময়ের আগে ‘লক ইন’ তুলে দেয়া হলে প্লেসমেন্ট বাণিজ্য বন্ধে এসইসি’র সব রকম প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এমএম মাসুদ
No comments:
Post a Comment