আস্থাহীনতায় প্রাইমারি মার্কেটও ছাড়ছেন বিনিয়োগকারীরা। শেয়ারবাজারে সেকেন্ডারি মার্কেটে দীর্ঘ দেড় বছর ধরে চলমান মন্দার কারণে আইপিও মার্কেট হিসেবে খ্যাত প্রাইমারি মার্কেটেও বড় ধরনের ধস নেমেছে। আইপিওতে উচ্চ প্রিমিয়াম ও সেকেন্ডারি মার্কেটে বরাদ্দ মূল্যের কম দরে লেনদেনের কারণে প্রাইমারি মার্কেটে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। সম্প্রতি কয়েকটি কোম্পানির আইপিওতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা নির্ধারিত কোটার চেয়ে কম আবেদনের ঘটনা ঘটেছে। আর সর্বশেষ অনুমোদন দেয়ার পরও দুটি কোম্পানির আইপিও স্থগিতে বাধ্য হয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। কোম্পানি দুটি হচ্ছে সামিট পূর্বাঞ্চল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড এবং এনভয় টেক্সটাইলস লিমিটেড। কোম্পানি দুটির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এসইসি আইপিও স্থগিত করেছে। দুটি কোম্পানিই উচ্চ প্রিমিয়ামে বাজারে শেয়ার ছাড়ার অনুমতি দিয়েছিল এসইসি। এর মধ্যে সামিট পূর্বাঞ্চল ৩৫ টাকা প্রিমিয়ামে ৩ কোটি শেয়ার ছেড়ে ১৩৫ কোটি টাকা এবং ২০ টাকা প্রিমিয়ামে সমসংখ্যক শেয়ার ছেড়ে বাজার থেকে ৯০ কোটি টাকা সংগ্রহের অনুমোদন পেয়েছিল।
সংশ্লিষ্টরা জানান, শেয়ারবাজারে বড় ধরনের মন্দা সত্ত্বেও উচ্চ প্রিমিয়ামে একের পর এক কোম্পানির আইপিও অনুমোদন দিচ্ছে এসইসি। মন্দার কারণে বাজারে শেয়ারের চাহিদা নেই। এরই মধ্যে উচ্চ প্রিমিয়ামে আইপিও অনুমোদন দেয়ার কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা আইপিওতে আবেদনে অনাগ্রহী হয়ে পড়েছেন। আবার আইপিও প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর সেকেন্ডারি মার্কেটে বরাদ্দ মূল্যের চেয়েও কম দরে লেনদেনের ঘটনা ঘটছে। এতে আইপিওতে শেয়ার বরাদ্দ পেয়েও লাভের মুখ তো দূরেই থাকুক লোকসান গুনতে হচ্ছে বিনিয়োগকারীদের। ফলে সেকেন্ডারি মার্কেটে ধস নামার পর তার প্রভাব প্রাইমারি মার্কেটেও পড়ছে। এ কারণে আইপিও অনুমোদন পাওয়ার পরও আইপিও স্থগিতে আবেদন করতে বাধ্য হয়েছে সামিট পূর্বাঞ্চল ও এনভয় টেক্সটাইলস। দেশের শেয়ারবাজারের ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনা আগে ঘটেনি বলে বাজার সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। উচ্চ প্রিমিয়ামের কারণে আইপিওতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে সাড়া পাবে না—এমনটিই আশঙ্কা করছে কোম্পানি দুটি।
সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, দেশের শেয়ারবাজারে সেকেন্ডারি মার্কেটে বিভিন্ন সময়ে মন্দা দেখা দিয়েছে। কিন্তু আইপিও অর্থাত্ প্রাইমারি মার্কেটে সে মন্দার ধাক্কা কখনোই আঁচড় কাটতে পারেনি। বরং সেকেন্ডারি মার্কেটের মন্দার সময় বিনিয়োগকারীরা প্রাইমারি মার্কেটে বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকে পড়েন। কিন্তু গত দেড় বছরে নানা উদ্যোগ নেয়ার পরও সেকেন্ডারি মার্কেটে গতি ফিরে না আসার কারণে তার নেতিবাচক প্রভাব প্রাইমারি মার্কেটেও পড়ছে। প্রাইমারি মার্কেটকে শেয়ারবাজারের প্রাণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ প্রাইমারি মার্কেটের মাধ্যমে কোম্পানিগুলো আইপিওর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে থাকে। আর এর মাধ্যমে কোম্পানি তাদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণ করে। দেশের শিল্প বিকাশে প্রাইমারি মার্কেট অবদান রাখে। সরকারি প্রতিষ্ঠান ছাড়া যে কোনো নতুন কোম্পানির শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্তির জন্য প্রাইমারি মার্কেটে শেয়ার ছাড়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এখন প্রাইমারি মার্কেটে ধসের কারণে বাজারে নতুন কোম্পানি আসার পথেও বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে।
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১২ সালে এসইসি ১২টি কোম্পানির আইপিও অনুমোদন দিয়েছে। এর ১০টিরই অনুমোদন দেয়া হয়েছে প্রিমিয়াম মূল্যে। তার মধ্যে ৭টি কোম্পানির আইপিও প্রক্রিয়া শেষে সেকেন্ডারি মার্কেটে লেনদেন শুরু হয়েছে। প্রিমিয়াম মূল্যে অনুমোদন পাওয়া কয়েকটি কোম্পানির বাজার দর এখন বরাদ্দ মূল্যের নিচে নেমে এসেছে। এর মধ্যে ১৪ টাকা প্রিমিয়ামসহ ২৪ টাকা মূল্যের আমরা টেকনোলজিসের দর নেমে এসেছে ১৯ টাকা ৬০ পয়সায়, ৩০ টাকা প্রিমিয়ামসহ ৪০ টাকা বরাদ্দ মূল্যের জিবিবি পাওয়ারের শেষ লেনদেন মূল্য নেমে এসেছে ২৭ টাকা ৯০ পয়সায়। ১০ টাকা প্রিমিয়ামসহ ২০ টাকা মূল্যের সায়হাম কটন মিলসের দর নেমে এসেছে সাড়ে ১৬ টাকায়, ৬৫ টাকা প্রিমিয়ামহ ৭৫ টাকা বরাদ্দ মূল্যের ইউনিক হোটেলের দর বরাদ্দ মূল্যের চেয়ে মাত্র ২০ পয়সা বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে এ কোম্পানির শেয়ারের দর ৭০ টাকায়ও নেমে এসেছিল। এভাবে বরাদ্দ মূল্যের চেয়ে কম দরে শেয়ার লেনদেন হওয়ায় আইপিওতে শেয়ার বরাদ্দ প্রাপ্তরা লোকসানের মুখে পড়েছেন। আর আইপিওতে লোকসানের কারণেও শেয়ারবাজার থেকে বড় অংকের বিনিয়োগকারী বাজার ছেড়ে চলে গেছেন। শেয়ারবাজারে ২০১১ সালের এপ্রিলে ৩৪ লাখ বিনিয়োগকারী থাকলেও এখন তা নেমে এসেছে ২৪ লাখে। শেয়ারবাজারে অব্যাহত দরপতনে লোকসান দিয়ে অনেক বিনিয়োগকারী বাজার থেকে বেরিয়ে গেছেন। কিন্তু গত এক বছরে আইপিওতে লাভের মুখ দেখতে না পারার কারণেও অনেকেই বাজার ছেড়ে চলে গেছেন। সংশ্লিষ্টরা জানান, শেয়ারবাজারে বিও অ্যাকাউন্টধারীদের একটি বড় অংশই সেকেন্ডারি মার্কেটে লেনদেন করেন না। তারা শুধু আইপিওতে আবেদন করে থাকেন। কিন্তু গত দেড় বছরে অব্যাহত মন্দার কারণে প্রথম দিকে মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করে লোকসানের মুখে পড়েন বিনিয়োগকারীরা। কিন্তু মন্দা দীর্ঘায়িত হওয়ায় এখন কোম্পানির শেয়ার বিনিয়োগ করেও লাভের মুখ দেখছেন না। একটি বিও অ্যাকাউন্ট নবায়ন করতে প্রতিবছর ৫০০ টাকা ফি গুনতে হচ্ছে। আবার আইপিওতে আবেদন করতে দীর্ঘ লাইন ধরে অপেক্ষা করতে হয়। নানা ধরনের বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়। আবার আইপিওতে চাঁদা জমা দেয়ার পর দুই মাস পর্যন্ত সে টাকা কোম্পানির কাছে আটকে থাকে। এরপরও যখন আইপিওতে শেয়ার পাওয়ার পর লোকসানই গুনতে হচ্ছে, সে জন্য তারা শেষ পর্যন্ত বাজার ছেড়ে চলে গেছেন।
সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে এসইসির সদস্য আরিফ খানকে প্রিমিয়ামে কোম্পানিগুলোর আইপিও অনুমোদনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোম্পানির শেয়ারের দর কখনও এসইসি নির্ধারণ করে না এবং শেয়ারের দরের বিষয়ে আইনগতভাবে এসইসির কোনো দায়বদ্ধতাও নেই। এরপরও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে আমরা অনেক কোম্পানির প্রিমিয়াম কাটছাঁট করেছি। সেকেন্ডারি মার্কেটে কোম্পানির শেয়ারের দর বরাদ্দ মূল্যে বেশি বা কম দরে লেনদেন হতে পারে। এতে কোনো কিছু করার নেই বলে মন্তব্য করেন এসইসির এ সদস্য।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সালে এসইসির অনুমোদন নিয়ে অনেক কোম্পানি মূলধন বৃদ্ধির নামে প্রাইভেট প্লেসমেন্টের মাধ্যমে অত্যন্ত চড়া দরে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে শেয়ার বিক্রি করেছে। আবার ওই সময় বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে অত্যন্ত চড়া দরে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীও অনেক কোম্পানির শেয়ার ক্রয় করেছিল। কিন্তু ২০১০ সালের ডিসেম্বরে বাজারে ধস নামার পর মূল্য নির্ধারণে কারসাজির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার অভিযোগে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বুক বিল্ডিং পদ্ধতি স্থগিত করে এসইসি। প্লেসমেন্টে ও বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে যেসব কোম্পানি শেয়ার বিক্রি করেছিল এখন তারা এসইসিকে চাপ প্রয়োগ করে প্রিমিয়াম মূল্যে আইপিও অনুমোদন করিয়ে নিচ্ছে। আর এসইসিও কোম্পানির স্বার্থের বিষয়টিকেই প্রাধান্য দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
No comments:
Post a Comment